নাক, চোখ, শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে

ধুলায় নগরে শ্বাসকষ্টে শিশুরা

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৫৯ | আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ১০:১৪

নিজস্ব প্রতিবেদক

নগরজুড়ে চলমান নির্মাণকাজে বায়ুদূষণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বয়স্ক ও শিশুদের নাক, চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের অসুখ। শীত ঘনিয়ে আসার এই সময়ে এসব রোগ নিয়ে হাসপাতালে আসা লোকজনের চাপও বেড়েছে।

রাজধানীর মহাখালীতে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা লোকজনের ভিড় দেখা যায়। টিকিট কিনে চিকিৎসকের সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকা রামপুরার গৃহিণী মাসুমা বলেন, ধুলার কারণে সর্দিকাশি বেড়ে গেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্বাসকষ্ট। আমার দুই বছরের ছেলে ধুলা সহ্য করতে পারে না। কিন্তু রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি তো ধুলায় ধূসর। বাড়িতেও অনেক ধুলাবালি। শীত আসার পর শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে। এজন্যই এসেছি ডাক্তার দেখাতে।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের চেয়ে অক্টোবরে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাজনিত রোগের চিকিৎসা নিতে এ হাসপাতালে রোগী বেশি এসেছে। চলতি মাসের প্রথম ১২ দিনের হিসাব বলছে, ৪ হাজার ৭১৬ জন রোগী এ হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার চিকিৎসা নিয়েছেন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে পঞ্চাশোর্ধ্বই বেশি বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসা নিতে নিয়মিত আসা রোগীদের মধ্যে রয়েছে শিশুরাও। সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে বেড়েছে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর সংখ্যা। চিকিৎসকরা বলছেন, বায়ুদূষণের কারণে শিশু ও বয়স্করাই বেশি ঝুঁকিতে। তবে রোগীদের মধ্যে নারীদের তুলনায় পুরুষের সংখ্যা বেশি বলে জানিয়েছে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক এবং রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. সেরাজুল ইসলাম জানালেন, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত সিট নেই। এ সময় ধানকাটা এবং অন্যান্য কৃষিকাজ শুরু হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে রোগী কম আসেন। নাহলে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতো। ৬৬৫ শয্যার এ হাসপাতালে কোনো সিট খালি নেই।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের অ্যাজমা সেন্টারে গিয়েও চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের ভিড় দেখা গেছে। তিন বছরের ছেলে আবদুল্লাহর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তাকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বাসিন্দা শাহ আলম। শ্বাসতন্ত্রের রোগের জন্য এলাকার ধুলাবালির আধিক্যকে দায়ী করে তিনি বলেন, আমি সবসময় মাস্ক পরে ঘুরি। ছেলেকে নিয়ে বাইরে বের হলেও মাস্ক রাখি। কিন্তু এরপরও তার এ অসুখটা এড়ানো গেল না। গত তিন দিন ধরে সর্দি লেগেছে, সঙ্গে শ্বাসকষ্ট।

মিরপুরের পীরেরবাগ পাকা মসজিদ এলাকার বাসিন্দা অমিয়কে নিয়ে এসেছে তার বাবা নাজমুল হাসান। তিনিও বলেন, তার সন্তান শীতের সময় বেশি কাবু হয়ে পড়ে। ধুলাবালি কেমন তা একটা কথা বললেই স্পষ্ট হয়। বাসার জানালা দুই দিন খোলা রাখলে সবকিছুতে ধুলার আস্তর পড়ে যায়।

১৮ নভেম্বর থেকে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হলে হাসপাতালে রোগী কিছুটা কমে আসে। কিন্তু শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগে আক্রান্ত রোগী বেড়েছে বলে জানান অ্যাজমা সেন্টারের সমন্বয়ক ডা. কামরুজ্জামান কামরুল। এ চিকিৎসা কেন্দ্রের সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরের কয়েক দিনের তথ্য তুলনা করে দেখা গেছে নভেম্বরেই বেশি মানুষ চিকিৎসা নিতে এসেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, বায়ুদূষণের কারণে নাক, চোখ, শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বায়ুদূষণের কারণে চোখ জ্বালাপোড়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া, নাকের নানা ধরনের অসুখ হয়। এতে শিশু ও বয়স্কদের এমনকি ক্যানসার হওয়াও আশঙ্কা রয়েছে বলে জানালেন তিনি। বাতাসে থাকা নানা ক্ষতিকর উপাদান গলা ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। ফুসফুসের ক্যানসারের জন্যও দায়ী বাতাসে থাকা কিছু ক্ষতিকর উপাদান। শিশুরা বাইরে বেশি থাকে বলে আক্রান্ত হয়। আর বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আস্তে আস্তে কমে যায়। এ কারণে সহজেই তারা আক্রান্ত হয়ে যায়।

ডা. সেরাজুল ইসলামও বলেন, বাতাসে ক্ষতিকর উপাদানের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। বায়ুদূষণের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বাতাসে শরীরের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর তাৎক্ষণিক কুফল, মানুষের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আর দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসার হওয়ার শঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল