ডেঙ্গু নিয়ে হিমশিম

ক্ষুদ্র মশা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৯, ০৯:১২

জুবায়ের চৌধুরী

ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা অতি ক্ষুদ্র একটি প্রাণী। বর্তমানে এই মশা নিয়েই দেশজুড়ে হইচই চলছে। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্য মন্ত্রী, সচিব, মেয়র এমনকি বাংলাদেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা সবাই এখন ডেঙ্গু নিয়ে কথা বলছেন। ডেঙ্গু এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

সবাই বলছেন, ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নিধন ও নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। মশক নিধনে সপ্তাহব্যাপী ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ঘোষণা করা হয়েছে। মশার কামড়ের ভয়ে সচিবালয়ে অফিস করতে যেতে ভয় পাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলছেন, ডেঙ্গু এখন চিন্তার বিষয়।

এবার ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পায়নি চিকিৎসকও। গত ৩ জুলাই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিগার নাহিদ দিপু নামে এক নারী চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। মাত্র দুদিনের জ্বরে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে চলে যান ডা. নিগার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর ধরন পাল্টেছে। ফলে এক-দুই দিনের জ্বরেও রোগীর মৃত্যু হতে পারে যে কারো। ডা. নিগারের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে এ আশঙ্কা আরো একবার প্রমাণিত হলো। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু আতঙ্ক বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুর ধরন পাল্টে গেছে। আগে কয়েক দিন জ্বরে ভোগার পর গায়ে র‌্যাশ ওঠা, চোখ লাল হওয়া ও রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে যেত। কিন্তু এখন প্রথম দিন থেকেই রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমতে থাকে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে রোগীর হার্ট অ্যাটাক ও কিডনি বিকলের মতো ঘটনাও ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ তারা সম্প্রতি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পপুলার ও স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন নারী চিকিৎসক ডা. নিগার নাহিদের একাধিকবার হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

জানা গেছে, দেশে ২০০০ সালে প্রথমবার ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ডেঙ্গু রোগটি প্রাণঘাতী হচ্ছে বেশি। আগে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, গায়ে র‌্যাশ ও বমি বমি ভাবকেই প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া হতো। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, এবার ডেঙ্গু রোগের ধরন বদলেছে। এখন আর আগের মতো কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এবার ডেঙ্গু হলেই রোগীর হার্ট, কিডনি ও ব্রেইন আক্রান্ত হচ্ছে। যে কারণে এবার রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে কয়েকগুণ। একই সঙ্গে রোগী দ্রুত শকে চলে যাওয়ারও আশঙ্কা বেড়েছে। এবার বেশির ভাগ রোগীরই মৃত্যু হয়েছে ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে’। শিশুদের বেলায় এটি আরো ভয়ংকর। চিকিৎসকরা বলছেন, আগে জ্বর হলে তিন দিন অপেক্ষা করতে বলা হতো। এর পরও না কমলে পরীক্ষা করাতে বলা হতো। কিন্তু এবার সে সুযোগ নেই। জ্বর হলে প্রথম দিনেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। আর তা রাজধানী ছাড়াও ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব থেকে জানা গেছে, গত সাড়ে ৬ মাসেই গত বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এ কদিনে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মোট ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২০৭ জন। সরকারি হিসাব বলছে, ডেঙ্গু রোগে মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের। তবে বেসরকারি হিসাব বলছে, মৃত্যু হয়েছে মোট ১২ জনের। অন্যদিকে কন্ট্রোল রুম জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ১৮ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৫ হাজার ৫৪৬ জন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ বছর যে ২২ জন মারা গেছে। এদের একটি বড় অংশ শিশু। মৃতের তালিকায় একজন চিকিৎসক, একজন নার্স, একজন গর্ভবতী, চিকিৎসকের এক ছেলে এবং শিক্ষকের সন্তান আছে। তবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে নেই। ২০০০ সালে দেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। সরকারি হিসাবে ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হয়েছিল আর মারা গিয়েছিল ৯৩ জন। এরপর প্রতি বছর ডেঙ্গু জ্বরে মৃতের সংখ্যা কমতে থাকে। গত বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। মারা গিয়েছিল ২৬ জন। এবারের ভয়াবহতা বলছে, অন্যবারের চেয়ে এবার মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে।

ডেঙ্গু ধরন বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, আগে শরীর ব্যথা হতো, শরীরে র‌্যাশ হতো, কিন্তু এবারের ডেঙ্গুতে এসবের বালাই নেই। আগে যেসব উপসর্গ দেখা যেত, সেসব এখন হয় না বলে মানুষ বুঝতে পারছেন না। তাই চিকিৎসকের কাছে যেতেও দেরি করছে। কিন্তু এই দেরিতেই সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। ডা. আব্দুল্লাহ আরো বলেন, এবার ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। জ্বর হলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। প্যারাসিটামল ছাড়া আর কোনো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না। সেই সঙ্গে যেকোনো পানীয় জাতীয় খাবার খেতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যুদ্ধ ঘোষণা : গতকাল ডিএনসিসির ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশা সম্পর্কে সচেতনতা র‌্যালির আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘২০০০ সালের প্রথম দিকে ডেঙ্গু রোগ সম্পর্কে জানা যায়। গেল বছর পর্যন্ত এটি নিয়ে চিন্তিত ছিলাম না। কিন্তু এখন চিন্তার বিষয় আছে। আর তাই এই এডিস মশা নিধনে সরকারের যেসব প্রচেষ্টা ছিল তা অব্যাহত থাকবে।’ তিনি বলেছেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ডেঙ্গু রোগ বহনকারী এডিস মশা নিধনে যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হওয়ারও পরামর্শ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু : রাজধানীসহ সারা দেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে। ১৮ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে সাতজনেরও বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত দিন শুধু রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেলেও এখন চট্টগ্রামসহ অন্য জেলাতেও ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে। তবে ঢাকার বাইরে আক্রান্তের সংখ্যা এখনো নামমাত্র হলেও যেকোনো সময় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

অর্থমন্ত্রীসহ একজন এমপিও আক্রান্ত হন ডেঙ্গুতে : ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জোয়াহেরুল ইসলাম। গত ৭ জুলাই সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী আক্রান্ত হওয়ার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল পুরো সংসদ। এমপিরা তার কথা শুনে কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাজেট পেশের আগে মারাত্মক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশের ঠিক দুদিন আগে গত ১১ জুন তাকে রাজধানীর এ্যাপোলো হসপিটালে ভর্তি করা হয়। পরে ১৩ জুন তিনি বাজেট পেশ শুরু করলেও তা শেষ করতে পারেননি। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাল ধরেন।

এদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জোয়াহেরুল ইসলাম। গত ২৪ জুন তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পারিবারিক সূত্র জানায়, ২৩ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে বক্তৃতা শেষে বাসায় ফেরার পরই প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত হন এমপি জোয়াহেরুল। পরদিন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তার ফুসফুস ও কিডনি জটিলতা দেখা দেওয়ায় অবস্থার অবনতি হয়। পরে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। তিনি এখন সুস্থ আছেন।

প্রচারণা বেড়েছে, তবু কমছে না রোগী : এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ ও দমনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সচেতনতামূলক সভা, মাইকিং ও মশার ওষুধ ছিটানো হলেও কমছে না ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। স্কুল শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে ডেঙ্গু সচেতনতায় র‌্যালির আয়োজন করা হয়। এ সময় ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম জানান, ডেঙ্গু রোগ মোকাবিলায় ডিএনসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও (ডিএসসিসি) ওষুধ বিতরণসহ নানা কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কারো জ্বর হলে বাসায় না রেখে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিকিৎসকদের জন্য নতুন করে চিকিৎসা গাইডলাইন তৈরি করেছেন। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে কোনো ওষুধ ব্যবহার করতে হবে, কী ধরনের চিকিৎসা দিতে হবে আর কী কী ওষুধ বর্জন করতে হবে; সে সম্পর্কে গাইডলাইনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে বলেও জানান তিনি।

পিডিএসও/তাজ