মৌসুমের শুরুতেই ডেঙ্গুর হানা

প্রকাশ | ২৭ জুন ২০১৯, ১৩:০৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

হাসি। বয়স পাঁচ ছুঁই ছুঁই। চার-পাঁচ দিন আগে জ্বর হয়েছিল। কখনো কমে, কখনো বাড়ে। এমন থেমে থেমে চলা জ্বর শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গু হিসেবে ধরা পড়ল গেল সপ্তাহে। সেদিন থেকেই হাসি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি। তবে গত সোমবার তাকে চিকিৎসক ছাড়পত্র দিলেও হাসির মা হাসপাতাল ছাড়তে পারেননি। কারণ এবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। রক্ত পরীক্ষায় জানা গেছে তিনিও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।

হাসির মা ছাড়াও হেলথ অ্যান্ড হোপ নামের এই হাসপাতালে গত সাত দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন পাঁচজন। যার মধ্যে চারজন নারী ও একজন শিশু। শুধু হেলথ অ্যান্ড হোপই না রাজধানীর গ্রিন রোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ১৫৫ জন। এ ছাড়া কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে ১১১ জন ও ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী।

জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু হানা দিয়েছে সময়ের অনেক আগেই। সাধারণত বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস ‘ডেঙ্গু মৌসুম’ বলে পরিচিত হলেও এবার মধ্য মে থেকেই ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে। এ কারণে হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছে রোগীরা। প্রতিটি হাসপাতালেই এখন প্রচুর ডেঙ্গু রোগী।

সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালগুলোতে এখন প্রচুর ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে। শুধু গত ২৩ জুন এক দিনেই সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ২২ জন। এ ছাড়া সরকারি- বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর সংখ্যা ১০৩ জন।

এ ছাড়া গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ঢাকার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন মোট ৮৩৯ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৭৩৪ জন। আর মারা গেছেন দুজন। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, গত ৩ থেকে ১২ মার্চে ঢাকার ৯৩টি ওয়ার্ডের ১০০টি জায়গায় অধিদফতর ডেঙ্গু নিয়ে জরিপ চালিয়েছে।

অন্যবারের চেয়ে এবারের জরিপ বেশি ‘মডিফায়েড এবং স্ট্যান্ডার্ড’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, এবারে সব বাসাকে নেওয়া হয়েছে এসব জায়গায়। অ্যাপার্টমেন্ট হাউস, সেমি স্ট্রাকচারড হাউস বা অর্ধপাকা এবং আরেকটি হচ্ছে নির্মণাধীন ভবন। মার্চ যদিও শুষ্ক মৌসুম হিসেবে পরিচিত, কিন্তু আমরা এবারে মার্চকে পুরোপুরি ড্রাই সিজন বলছি না। এবার ফেব্রুয়ারি থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়। গত বছরের সঙ্গে এই জরিপ তুলনা করা মুশকিল। গত বছর এই জরিপ হয় জানুয়ারিতে যখন আসলেই তা শুষ্ক মৌসুম ছিল। এবারের জরিপে ‘অ্যাডাল্ট মশা’ও দেখা গেছে, যেটা অন্যবার শুধু লার্ভা ছিল। তবে লার্ভা থাকা মানেই এডিস মশার জন্ম হবে, সেটাও উল্লেখযোগ্য হারে ছিল। তাই এখনই সচেতন না হলে সমস্যা যে আরো বাড়বে, তা পরিষ্কার।

তবে উত্তর সিটি করপোরেশনের চেয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি বলে মন্তব্য করেন ডা. সানিয়া তহমিনা। তিনি বলেন, এর কারণ হতে পারে উত্তর সিটি করপোরেশন কিছুটা হলেও পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পুরোটাই প্রায় অপরিকল্পিত। এসব এলাকায় মানুষের বসতিও খুব ঘন।

তিনি বলেন, উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ডেঙ্গু নিয়ে আমাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে কীভাবে সামনে এগোবেন; সে বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছেন। আমরা তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছি। এ ছাড়া দুই সিটি করপোরেশনের ১০টি জোনের কর্মীদের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি মিটিং করা হয়েছে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বরাবরের মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ আবার শুরু হয়েছে। অন্য বছরের চেয়ে এবার রোগটি সময়ের বেশ আগেই দেখা দিয়েছে। গত বছরই দেখা গেছে ডেঙ্গুর ধরন বদলে যাচ্ছে। তবে এবার সেই বদলে যাওয়া লক্ষণে আরো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এবার হেমোরেজিক ডেঙ্গু একদমই কম।

ডা. লেলিন চৌধুরী জানান, আগে যেমন তীব্র জ্বর এবং প্রচন্ড শরীর ব্যথা থাকত, এবারের ডেঙ্গুতে জ্বর তীব্র না, শরীর ব্যথাও উল্লেখযোগ্য না। এ ছাড়া র‌্যাশও কম পাওয়া যাচ্ছে, যা কি না ডেঙ্গুর অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে এত দিন বিবেচিত হয়েছে। এ বছর সব বয়সের রোগীদের পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ এবং ঢাকার সন্নিহিত এলাকাগুলোতে একই সঙ্গে মশা মারা, মশার প্রজনন স্থানগুলো পরিষ্কার করা ছাড়াও মানুষকে সচেতন করতে হবে। এটি না করলে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগ না নিলে ডেঙ্গু কমবে না।

পিডিএসও/তাজ