ঢাকার আড়াইশ হাসপাতাল অগ্নিঝুঁকিতে!

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:০০

জুবায়ের চৌধুরী

ঢাকায় ছোট-বড় কিংবা সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে শতাধিক হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালই ১৫টি। আর বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। তাছাড়া রয়েছে বহু ধরনের ক্লিনিক। এসব হাসপাতাল-ক্লিনিকে প্রতিদিন কয়েক লাখ লোক সেবা নিচ্ছে। শুধু রাজধানীবাসীই নয়, এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে প্রতিদিনই ঢাকার বাইরে থেকে আসছে শত শত রোগী। ঢাকায় বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যা বেশি হওয়ায় রোগীরা ঢাকামুখী হচ্ছে বেশি। হোক সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই রোগীর সংখ্যা কম নেই। তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে, ঢাকা নগরীর ২৪৮টি হাসপাতাল এখন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গত বৃহস্পতিবার শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের পর এই উদ্বেগ আরো বেড়েছে। হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও ইলেকটিক্যাল ওয়্যারিংয়ের মানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সরকার।

একটা সময় দেশে বেসরকারি খাতে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের অনুমোদনই ছিল না। তবে এখন সে বিধিনিষেধ নেই। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বড় বড় বেশ কয়েকটি হাসপাতাল হয়েছে দেশে। এসব হাসপাতালের মধ্যে অ্যাপোলো হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল, ল্যাবএইড হাসপাতাল, পপুলার হাসপাতাল, ইবনে সিনা হাসপাতাল, মেডিনোভা হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য। সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু কমিউনিটি ক্লিনিকও পরিচালিত হচ্ছে। এসব জায়গায় প্রধানত মা ও শিশুর প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।

সম্প্রতি ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কারণ এ দুর্ঘটনায় উঠে এসেছে, ঢাকার হাসপাতালগুলো কতটা অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিতে! গত ১৪ ফেব্রুয়ারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটিকে ‘ওয়েকআপ কল’ বা সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যদিও ঢাকার হাসপাতালগুলোর অগ্নিঝুঁকি নিয়ে এমন সতর্কবার্তা অনেক আগেই দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সংস্থাটির প্রণীত ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতালের তালিকায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ মোট ২৪৮টি হাসপাতালের নাম রয়েছে। এছাড়া অতি ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে ১৭৪টি হাসপাতাল। এসব হাসপাতালের মধ্যে সরকারি হাসপাতালও রয়েছে।

ঝুঁকির তালিকায় থাকা হাসপাতালগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে কিছু পরামর্শও দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। কিন্তু এসব পরামর্শের কোনোটিই আমলে নেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ঘটে গেছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে অন্য হাসপাতালগুলোয়ও যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৭ সালে ঢাকাকে চারটি অঞ্চলে বিভক্ত করে সব ধরনের স্থাপনা পরিদর্শনের উদ্যোগ নেয় ফায়ার সার্ভিস। এর অংশ হিসেবে ঢাকার ৪৩৩টি হাসপাতালও পরিদর্শন করা হয়। মাটির নিচের জলাধারের ধারণক্ষমতা, অবস্থানকারীর সংখ্যা, প্রবেশদ্বারের প্রশস্থতা, স্মোক/হিট ডিটেক্টর, মেঝের আয়তন, জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, লিফট ইত্যাদি বিষয় খতিয়ে দেখে ঝুঁকি নিরূপণ করা হয় হাসপাতালগুলোর। পরিদর্শন শেষে সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ফায়ার সার্ভিস। প্রতিবেদনে ২৪৮টি হাসপাতালকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৭৪টিকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শেরেবাংলা নগরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স হাসপাতাল, আগারগাঁও জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল। তালিকায় সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করা হয় জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট হাসপাতালকে।

ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী অগ্নিঝুঁকিতে থাকা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে রয়েছে শমরিতা হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার-২, ক্রিসেন্ট গ্যাস্ট্রোলিভার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল, ধানমন্ডি জেনারেল অ্যান্ড কিডনি হাসপাতাল, ধানমন্ডি কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বিএসওএইচ হাসপাতাল, প্যানোরমা হসপিটাল লিমিটেড, ধানমন্ডি মেডি এইড জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেড ও মেরিস্টোপ বাংলাদেশ। সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোও সতর্ক করা হয়েছিল তখন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালই সংস্থাটির এ সতর্কবার্তা আমলে নেয়নি। বাস্তবায়ন করেনি তাদের সুপারিশও।

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ জানান, জনস্বার্থে আমরা ঢাকাসহ সারা দেশের হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে ঝুঁকি নিরূপণ করি। খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতালগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়। হাসপাতালগুলোকে সতর্ক করার জন্য লিখিতভাবে অন্তত তিন দফা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

বিভিন্ন হাসপাতালে সরেজমিন দেখা গেছে, ভবনের উচ্চতা ও স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা অনুপাতে কতগুলো অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র প্রয়োজন, সে সম্পর্কে তাদের অধিকাংশেরই কোনো ধারণা নেই। যেসব অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আছে, সেগুলোর ব্যবহার সম্পর্কেও জানেন না হাসপাতালের বেশির ভাগ স্টাফ। বিদ্যমান অবকাঠামো কতটা নিরাপদ, সে সম্পর্কেও তারা জানেন সামান্যই। এছাড়া যেসব জায়গায় অতিরিক্ত লোকসমাগম হয় সেখানে স্মোক/হিট ডিটেক্টর লাগানোর যে শর্ত আছে সেগুলোও মানা হয় না। বেশিরভাগ হাসপাতালে ডিস্টিংগুইশার (অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র) থাকলেও সেগুলোর মেয়াদ নেই। আবার অনেক হাসপাতালের এক ফ্লোরে তা থাকলেও অন্য ফ্লোরে নেই। অনেক হাসপাতালে হিট ডিটেক্টর বা ফায়ার অ্যালার্মও দেখা যায়নি।

তবে অগ্নিনিরাপত্তায় বেসরকারি হাসপাতালের চেয়েও করুণ অবস্থা দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের। হাসপাতালটির পুরনো ভবনের নিচতলায় রয়েছে একটি মাত্র ডিস্টিংগুইশার। এছাড়া অন্য কোনো তলায় ডিস্টিংগুইশার নেই। আর ফায়ার অ্যালার্ম বা হিট ডিটেক্টরও চোখে পড়েনি। একই অবস্থা হাসপাতালটির বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটেও। সেখানেও নিচতলায় একটি মাত্র ডিস্টিংগুইশার রয়েছে। এছাড়া ওপরের কোনো তলাতেই ডিস্টিংগুইশার নেই। ফায়ার অ্যালার্ম বা হিট ডিটেক্টরও দেখা যায়নি কোনো তলায়। নবনির্মিত ঢামেক-২ ভবনেও ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় তেমন কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতালগুলোর তালিকা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে কি না তা জানতে যোগাযোগ করা হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। এ সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব (স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ) মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, তালিকা ধরে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না সেটা ফাইল দেখে নিশ্চিত করা যাবে। তবে ব্যবস্থা নেওয়া না হয়ে থাকলেও এখন অবশ্যই নেওয়া হবে।

এদিকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের হাসপাতালগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুনের ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি শিক্ষা। আমাদের বেশকিছু হাসপাতাল আছে পুরনো, এগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। আমরা সব হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে দেখব। এছাড়া হাসপাতালগুলোর বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও তার ঠিক আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।

পিডিএসও/হেলাল