মহানগর জেনারেল হাসপাতাল

নামেই ১৫০ শয্যা!

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৫১ | আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:১৩

হাসান ইমন

পুরান ঢাকার নয়াবাজারে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিচালিত ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতাল। শ্রমজীবী হাসপাতাল নাম দিয়ে ৫০ শয্যা দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও এখন ১৫০ শয্যা। রোগীদের সেবা বাড়াতে শয্যা বাড়ানো হলেও তাদের দেখতে ডাক্তার বাড়ানো হয়নি। সেই ৫০ শয্যার ৩১ ডাক্তারের মধ্যে ১৭ জন দিয়ে চলছে ১৫০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতালটি। ৩১ নার্সের মধ্যে সেবা দিচ্ছেন ১২ জন। ওয়ার্ড বয়ও নেই। অ্যাম্বুলেন্স আছে ড্রাইভার নেই। এ ছাড়া সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের অভাবে এ হাসপাতালটি অস্ত্রোপচার ৪ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এমনকি সার্জারি বিভাগের দুটি ওয়ার্ড সার্বক্ষণিকভাবে তালাবদ্ধ থাকছে।

২০১৬ সালে হাসপাতালটির পরিসর বাড়ানো হলেও সে তুলনায় বাড়ানো হয়নি জনবল। চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে হাসপাতালটিতে বহির্বিভাগ সেবা চালু থাকলেও ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে ভীষণভাবে। বিশেষত জটিল রোগের চিকিৎসায় হাসপাতালটি তেমন ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এসব সংকটের কারণে দিনকে দিন সেবার হাত থেকে মুখ পিরিয়ে নিচ্ছে পুরান ঢাকাবাসী।

হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৯ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালটি চালু হয়। শুরুতে এটি ৫০ শয্যার হাসপাতাল ছিল। ২০১৬ সালের মে মাসে শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫০ করা হয়। কিন্তু সে অনুপাতে চিকিৎসক ও অন্যান্য লোকবল বাড়ানো হয়নি। ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পর সার্জারি বিভাগে একজন চিকিৎসক বাড়ানো হলেও চার বছর ধরে পদটি শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালটির চিকিৎসকের ৩১টি পদের মধ্যে ১১টি বর্তমানে খালি রয়েছে। এর মধ্যে সার্জারি, অ্যানেসথেসিয়া, নাক, কান ও গলা, চর্ম ও যৌন বিভাগ সম্পূর্ণ খালি রয়েছে।

গতকাল রোববার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের নিচতলায় মেডিসিন, গাইনি ও প্রসূতি, প্যাথলজি, চর্ম ও যৌন, দন্ত এবং নাক, কান ও গলা বিভাগের সামনে চিকিৎসা নিতে অপেক্ষা করছেন পাঁচ থেকে ছয়জন করে রোগী। দ্বিতীয় তলায় সার্জারি পুরুষ ওয়ার্ডে ঘুমাচ্ছেন ৬ জন রোগী। ওয়ার্ডের বাকি ৭টি বিছানাই ফাঁকা পড়ে আছে। এর পূর্বপাশে নারী ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৫ জন। ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৫ থেকে ২৬ জন। ভর্তি রোগীদের সঠিক সংখ্যা হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা প্রতিবেদককে জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। হাসপাতালের তৃতীয় তলায় সার্জারি ওয়ার্ডে তালা ঝুলছে। সেখানকার এক কর্মচারী জানান, চার বছর ধরে এ বিভাগে কোনো চিকিৎসক নেই। এ কারণে এ সময়ের মধ্যে কোনো অস্ত্রোপচার হয়নি। তবে প্রসূতিদের জন্য সেবা চালু রয়েছে বলে তিনি জানান। এদিকে নারী ওয়ার্ডটি খোলা থাকলেও ভেতরে গিয়ে ওয়ার্ডের সব শয্যাই ফাঁকা দেখা গেছে। হাসপাতালটির এক নারী কর্মচারী জানান, চিকিৎসক না থাকায় চার বছর ধরে এখানে কোনো রোগী নেই। এখানে ডিজিটাল এক্সরে, ইসিজি ও উন্নতমানের আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন রয়েছে। প্যাথলজি বিভাগেও প্রায় স্বল্প খরচে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এরপরও ভর্তি রোগীর সংখ্যা খুবই সীমিত। তবে পুরো হাসপাতালের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, মাঝেমধ্যে হাসপাতালের সব শয্যায় রোগী ভর্তি থাকে। তখন জরুরি রোগী এলেও তাদের ভর্তি করানো হয় না। তাই আগের তুলনায় এখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা কমে গেছে। হাসপাতালে এখন দিনে গড়ে মাত্র ৩০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নেন চার শতাধিক লোক। রোগীদের অধিকাংশই পুরান ঢাকার বাসিন্দা।

পুরান ঢাকা থেকে আসা গৃহবধূ শাহানা বেগম জানান, দেড় মাস ধরে তিনি এ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। চিকিৎসা ভালো হচ্ছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা কম। হাসপাতালটিতে ভর্তি রয়েছেন এমন একাধিক রোগী জানান, এখানকার পরিবেশ ও চিকিৎসা ভালো। প্রায় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হাসপাতালের ভেতরেই করা যায়। কিন্তু জনবল সংকট প্রবল। পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা না থাকায় গুরুতর অসুস্থ কেউ এ হাসপাতালে ভর্তি হন না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালটিতে বিদ্যমান চিকিৎসক সংকট চরম রূপ ধারণ করার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর অন্যতম হচ্ছে চিকিৎসক নিয়োগে জটিলতা। হাসপাতালটি সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। ফলে সিটি করপোরেশন পরিচালিত এ হাসপাতালের কোনো পদে প্রেষণে যোগদান করতে হলে সিটি করপোরেশন থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়। সেখান থেকে অনুমোদনের পর তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়। এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনের পর ওই পদ পূরণের সুযোগ তৈরি হয়। এসব ভোগান্তির কারণে চিকিৎসকরা সহজে এ হাসপাতালে প্রেষণে আসতে চান না।

হাসপাতালের প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এ হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন চার শতাধিক রোগী আসেন। গতকাল বহির্বিভাগে ৪৩৫ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বহির্বিভাগে রোগী দেখা হয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ৫৩১ জন, আন্তবিভাগে ৮৮ হাজার ১৫৯ জন, অপারেশন করা হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ জনকে। আর জরুরি বিভাগে রোগী দেখেছেন ২৩ হাজার ৩৬৫ জনকে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ডা. প্রকাশ চন্দ্র রায় প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা উন্নত করতে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সার্জারিসহ কয়েকটি বিভাগে চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকায় ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে না। এ ছাড়া হাসপাতালটি ৫০ থেকে ১৫০ শয্যায় রূপান্তর করার পর জনবল তেমন বাড়েনি। পুরনো অর্গ্রানোগ্রামে জনবল যা আছে তার অর্ধেকও নেই। তারপরও কোনো রকম চালিয়ে যাচ্ছি। তবে জনবল বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়েছি। লোকবল এলে পুরোদমে চালু হবে হাসপাতালটি।

পিডিএসও/হেলাল