যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে চা বাগানের নারী শ্রমিকরা

প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:৩০ | আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:৫৪

আবুজার বাবলা, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় এখনও পিছিয়ে রয়েছে মৌলভীবাজার জেলার ৯৩টি চা বাগানে কর্মরত নারী চা-শ্রমিকরা। চা বাগানের শ্রমিক লাইনের বসত-ভিটায় স্যানেটারি ল্যাট্রিন ব্যবস্থা না থাকায় চা বাগানের খোলা জায়গায় মল ত্যাগ করতে হয় তাদের। শ্রমিক লাইনগুলোতে অপুষ্টি, বিশুদ্ধ সুপেয় পানির অভাব ও স্বাস্থ্য সচেতনতা না থাকায় চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন গর্ভবতী ও প্রসূতি চা শ্রমিকরা। 

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও ইউনিয়নের কাঁঠাল টিলা শ্রমিক লাইন ও আমরাইল চা বাগানের গুঁটিবাড়ি শ্রমিক লাইন সরজমিনে গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। 

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের ব্যাপারে চা বাগানগুলোতে প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে নারী চা শ্রমিকরা অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি বড় অধ্যায় হচ্ছে বিয়ে। চা শ্রমিকের বেলায় বাবা-মায়েরা মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেয়াটাই ভালো বলে মনে করেন। বিয়ের পর অপুষ্ট অল্পবয়সী মেয়েটিকে প্রমাণ করতে হয় সে বন্ধ্যা নয়। আর ১৫/১৬ বছরে অপুষ্ট শরীরে সন্তানধারণের কারণে তারা গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন জটিলতায় পড়ে, এমনকি মারাও যায়।

অন্যদিকে নারী শ্রমিকরা পিরিয়ডকালীন সময় স্বাস্থ্যসম্মত স্যানেটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করার সুযোগ পান না। তারা স্যানেটারি ন্যাপকিনের পরিবর্তে একই কাপড় বার বার ব্যবহার করেন। চা বাগানে স্যানেটারি ন্যাপকিন বিনামূল্যে চালুর বিষয়টি চা বাগান মালিক ও চা সংশ্লিষ্টদের বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন স্কুল পড়ুয়া হুগলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কিশোরী শেফালী দাস।’

সাতগাঁও চা বাগানে কাঁঠালটিলা লাইনের রিনা রিকিয়ান(২৬) এর সাথে কথা হয়। ৬ বছর আগে কার্তিক রিকিয়ানের সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তার ঘরে শিউলী রিকিয়াশন নামে কণ্যা শিশু জন্ম নেয়। বর্তমানে শিউলীর বয়স আড়াই বছর। আবারও ১১দিন আগে তার ঘরে পুত্র শিশু জন্ম নেয়। দাই এর মাধ্যমে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে তার নিজ বসতবাড়িতে। পরিবারের মধ্যে স্বামী ও স্ত্রী রোজগার করেন। অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে রিনা ১০২ টাকা মজুরীতে চা পাতি তোলার কাজ করেন। 

রিনা বলেন, গর্ভকালীন সময় শাক-সবজি, করলা বরবটি খাইছি। মাঝে মধ্যে মাছ ও মাংস খাইছি। সব সময় তো খাওয়া সম্ভব হয়নি। যেসব নারী চা শ্রমিক গর্ভবতী হয়েছেন তাদের গর্ভাবস্থায় সেবা গ্রহণ বিষয়ক জ্ঞান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তারা জানান, গর্ভাবস্থায় কমপক্ষে চার বার হাসপাতাল ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চেকআপের কথা জানান।

আরেক গর্ভবতী খোকন দাসের স্ত্রী শুকুর মণি দাস (১৯)। সে আমরাইল চা বাগানের গুটিবাড়ী লাইনের বাসিন্দা। শুকুর মণি তার শাশুড়ী নির্মলা দাস (৬০) হাতের হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে বদলি অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে ৪ বছর ধরে কাজ করছেন। শুকুর মণি ৭ মাসের গর্ভবতী। ২০১৪ সালে তার বিয়ে হয়। তার বাড়ি সিলেটের দলদলি চা বাগানে। সে সিলেট কাজী জালাল উদ্দিন বহুমূখী বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার বাবার সংসারে অভাব অনটন থাকায় তাকে বিয়ে দেয় শ্রীমঙ্গলের আমরাইল ছড়া চা বাগানে। 

শুকুর মণির গত ১০ সেপ্টেম্বর চা বাগানে মা ও শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য বই সুত্রে জানা যায়, তার কর্মস্থলের দূরত্ব ৩ কিলোমিটার। তিনি পায়ে হেঁটে কাজে যান । সময় লাগে সোয়া এক ঘণ্টা। তার রোজগারে পরিবারের চার সদস্যের ভরণ পোষণ চলছে। তিনি দুইবার হাসপাতালে ও দুই বার কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিয়েছেন।

স্যানেটিশনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চা বাগানে ভেতরে খোলা মাঠে মলমূত্র ত্যাগ করেন। সেখানে পানির কোনও সুব্যবস্থা নেই। বাড়িতেও তার কোনও স্যানেটারি ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা নেই। খাবারের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবজি খাই, তবে সময়ে মাছ মাংস খেতে পারি না। 

ওই লাইনের বাসিন্দা আরেক গর্ভবর্তী ইসুরী দাস (১৮), তার স্বামী আপন দাস, তিনি একজন রাবার বাগানের শ্রমিক। ইসুরী দাস ৮ মাসের গর্ভবতী। তারও একই অবস্থা। তবে তার বাগানে কোনও কাজ না থাকায় তিনি বাড়িতে থাকেন। রীতা দাস (১৮), তার স্বামী তপন দাস। সে তিন মাসের গর্ভবতী। একই অবস্থা গর্ভবর্তী  স্বপ্না দাস (২৫)’র। তবে তাদের মধ্যে কেউ গর্ভকালীন ভাতা পাচ্ছেন না। 

বাগানগুলোর শ্রমিক লাইন অনেকটা গুচ্ছগ্রামের মতো। এসব লাইনের শতাধিক শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পর্যাপ্ত টিউবওয়েল না থাকায় কূয়ার পানিতে বাসন ধোয়া থেকে শুরু করে পানও করে থাকেন। এসব শ্রমিক লাইনের জীর্ণ বসতবাড়ির জন্য স্বাস্থ্যকর কোনও স্যানেটারি ল্যাট্রিন নেই। চট ও পুরোনো প্লাষ্টিকের বস্তা দিয়ে কাঁচা টয়লেট দেখা গেছে কয়েকটি পরিবারে।

শ্রমিকরা জানান, টয়লেট না থাকায় তারা দিনে রাতে নম্বরে (চা চারা বাগান) গিয়ে মূলমুত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়। এতে করে চা বাগানগুলোতে নারী শ্রমিক বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েরা চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, ‘চা শ্রমিকরা সঠিক হিসাব রাখতে পারে না। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীরা। সঠিক সময় ছুটিতে যেতে পারে না। তবে এটা বড় ধরণের সমস্যা। অনেকে মাতৃকালীন ছুটি নেয় তিন মাসের। কিন্তু তিন মাস অতিক্রম করার পর দেখা গেছে তার প্রসব হয়নি।’

চা শ্রমিকদের আইন নিয়ে তিনি বলেন, একটা রাষ্ট্র আইন করবে তার নাগরিকের কল্যাণের জন্য। কাউকে বঞ্চিত করার জন্য কোনও আইন হতে পারে না। চা শ্রমিকদের বড় ধরণের আইন হয়নি। আমরা উপেক্ষিত ন্যাশনাল পলেসির কারণে। এ জন্য নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি শ্রম আইন আরো যুগপোযোগী ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জয়নাল আবেদিন টিটো বলেন, ‘চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত  ৬ হাজার ১৬২ জন নারীর সুস্থ ও নিরাপদভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৪২১ জন নারী ছিলেন চা শ্রমিক। এই সময়ে গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১১ জন, আর কেবল চা বাগান এলাকায় মারা গেছেন ৭ জন নারী।’

তিনি আরও বলেন, ৯টি চা বাগানে ৩১টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। তাদের কার্যক্রম আরো বাড়বে। যারা গর্ভবতী নারী কমিউনিটি ক্লিনিকে আসবে, তারা স্বাস্থ্য পরামর্শ গ্রহণ করবে। আর যারা আসবে না তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা পরামর্শ দিবেন। শ্রীমঙ্গল হসপিটালে সপ্তাহে ৬দিন জরায়ু ক্যান্সার পরীক্ষা করা হবে বলেও জানান তিনি।

পিডিএসও/রিহাব