জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল

মানোন্নয়ন কাজের জন্য ৩ মাস ধরে ওটি বন্ধ

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৪:০০

পাঠান সোহাগ

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে (এনআইসিভিডি) হৃদরোগের অস্ত্রোপচারের কলেবর বাড়ানোর এবং মানোন্নয়নের কাজ চলছে। এজন্য সব ধরনের অস্ত্রোপচার তিন মাস ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে বিপাকে পড়ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসুস্থ হৃদরোগীরা। কাজ শুরু আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছিল ১৫ দিনের মধ্যে সব কাজ শেষ করে চালু হবে অপারেশন থিয়েটার। কিন্তু তিন মাস অতিবাহিত হলেও কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৪১৪ শয্যার বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রটির ওটি মেরামত ও ‘ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন’ (ঊর্ধ্বমুখী ভবন সম্প্রসারণ কার্যক্রম) এর জন্য গত ৯ সেপ্টেম্বর থেকে সব (৪টি) ওটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। কার্যক্রম বন্ধের তিন দিন পরে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ১৫ দিনের মধ্যে অস্ত্রোপচার চালু করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, হাসপাতালটিতে হৃদরোগের চিকিৎসাসেবা এখন আন্তর্জাতিক মানের। দেশের একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালের সেবার গুণগত মান বাড়ছে। সম্পূর্ণ কাজ শেষ হলে সাধারণ শয্যা, কেবিন, আইসিইউ, সিসিইউ, ক্যাথল্যাব এবং ওটি কমপ্লেক্স সুবিধা দুই থেকে তিনগুণ বাড়বে। পাশাপাশি চিকিৎসকের সংখ্যা ও লোকবল বাড়ানো হচ্ছে। সর্বনি¤œ ব্যয়ে সাধারণ হৃদরোগীরা আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাবেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৯৫০ থেকে ১ হাজার রোগী ভর্তি থাকে। এছাড়া বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী সেবা নেয়। নির্মাণ কাজ শেষ হলে হাসপাতালে সেবা গ্রহীতাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এছাড়া জরুরি বিভাগের আধুনিকায়নে জন্য নতুন দুটি ইকো মেশিন, দুটি ইসিজি মেশিন, ১০টি অবজারভেশন বেড স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই শিফটে ছয়জন চিকিৎসক এবং ৩৩ জন নার্সের ডিউটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া জটিল হৃদরোগীদের চিকিৎসায় অত্যাধুনিক ইলেক্ট্রো ফিজিওলজি মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। জানা গেছে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ভবনের সম্পূর্ণ কাজ শেষ হলে কনসালটেন্ট রুম, ক্যাথল্যাব, সিসিইউ, পিসিসিইউ, কেবিন ওটি, আইসিইউ, কার্ডিয়াক সার্জারি পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড এবং কার্ডিওলজি পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড চালু করা হবে।

হাসপাতাল প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মাহমুদুজ্জামান জানান, আগের সিস্টেম সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে করা হয়েছে। নতুন ওটি চালু হলে অনেক সুযোগ-সুবিধা বাড়বে। আইসিইউ বেডের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৮ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। সাতটি অপারেশন থিয়েটারে সার্বক্ষণিক অপারেশন করা হবে।

এদিকে, হৃদরোগ চিকিৎসার একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা স্বল্প আয়ের মানুষ অপারেশন থিয়েটার (ওটি) দ্রুত চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এতে কোনো কাজ হচ্ছে না। গত এক মাসে হাসপাতালে কয়েক বার গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিন বেশকিছু রোগী ভর্তি হচ্ছে। গত সোমবার হাসপাতালে ২ নম্বর মহিলা ওয়ার্ডে চারজন অসুস্থ রোগীকে ভর্তি থাকতে দেখা গেছে। পাশেই এক নম্বর পুরুষ কার্ডিয়াক ও ভাস্কুলার সার্জারি ওয়ার্ডে রোগীর শূন্য শয্যা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডের কর্মকর্তারা এখন গল্প করে অলস সময় পার করছেন। নার্সিং ইনচার্জের ও সিনিয়র নার্সরা জানায়, মূলত অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকায় এসব শয্যা শূন্য পড়ে আছে।

হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের একাধিক চিকিৎসক জানান, বেশ কয়েক মাস আগে ভবনের ওপরে নতুন অবকাঠামোর কাজ চলায় অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে কয়েকজন রোগী জীবাণু সংক্রামিত হয়ে পড়ে। পরে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সাতজনের মৃত্যু হয়। তারপর থেকে অস্ত্রোপচার বন্ধ রাখা হয়েছে। আর অনির্দিষ্টকালের জন্য জটিল অপারেশন বন্ধ থাকায় অনেকটা মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন রোগীরা। চিকিৎসকরা আরো জানিয়েছেন, যেসব রোগীদের জটিল ভাস্কুলার সার্জারি, বাইপাস সার্জারি, সিএপিজি, ভাল্ব প্রতিস্থাপন বা চিকিৎসা প্রয়োজন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তারা ফিরে যাচ্ছেন। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব রোগীর দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা না দিলে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে।

অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকায় দরিদ্র হৃদরোগীরা অসহায় হয়ে পড়ছেন। অনেকে আবার বেসরকারি হাসপাতালের দালালদের খপ্পরে পড়ছেন। আবদুর রহমান নামের এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন বলেন, অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকায় মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে যেতে হচ্ছে। মাসুদ নামে আরেকজন বলেন, রোগী ভর্তি করেছি, কর্তৃপক্ষ অপারেশন করছে না, আবার ছুটিও দিচ্ছে না। পরে রাতের বেলা কাউকে না বলেই রোগীকে মিরপুরে নেওয়া হয়। সেখানে রিং পরানো হয়।

হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগের দাবি, ভাস্কুলার সার্জারি বিভাগের ক্যাজুয়ালিটি (ক্যাথল্যাব) ওটি চালু রয়েছে। যেখানে পায়ের অস্বাভাবিক শিরার অপারেশন হচ্ছে। এখন পরিসর বৃদ্ধির জন্য সাময়িক বন্ধ হলেও নতুন ওটিগুলোতে দ্বিগুণ অস্ত্রোপচার হবে। গণপূর্ত অধিদফতরের (পিডব্লিউডি) সাব-অ্যাসিসটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আরেফিন মুরাদ জানান, এরই মধ্যে আইসিইউর কাজ শেষ হয়েছে। এখন ওটির কাজ চলছে। বাকি কাজ এ মাসের শেষের দিকে শেষ হবে। হাসপাতাল প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাফর উল্লাহ সোহেল জানান, হাসপাতালের ভার্টিক্যাল এক্সটেনশনের কাজ চলছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওটি চালু হবে। তবে তিনি বলেন, ভালো কিছুর জন্য সাময়িক কষ্ট মেনে নিতেই হবে। হাসপাতাল পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার হাসপাতালে গিয়েও দেখা করা সম্ভব হয়নি।

পিডিএসও/হেলাল