রাজধানীর হাসপাতালে আইসিইউ বাণিজ্য

সন্তান হারাচ্ছে বাবা-মা, নিঃস্ব হচ্ছে রোগীর স্বজন

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৮, ০৯:৩৪

নিজস্ব প্রতিবেদক

মুমূর্ষু রোগীদের সর্বোচ্চ সুচিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)। তবে এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে সুচিকিৎসার এই শেষ ভরসাস্থলটি! আইসিইউ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পর্শকাতর বিশেষায়িত এ চিকিৎসাসেবা চালু করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান এবং ল্যাবরেটরি সুযোগ-সুবিধা থাকা অত্যাবশ্যক। তবে রাজধানীতে স্থাপিত অনেক হাসপাতালে নেই ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। এক শ্রেণির দালাল রোগীর স্বজনদের আবেগকে পুঁজি করে এসব আইসিইউতে নিয়ে যায়। এতে ক্ষতির মুখে পড়ে রোগীর স্বজন, হচ্ছে নিঃস্ব, প্রাণ হারাচ্ছে অনেকে।

গত বছরের ৭ আগস্ট মেহের আফরোজ শবনম (১৩) নামে প্রিপেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে অবস্থিত জেনারেল মেডিকেল হাসপাতাল (প্রা.) লি.-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। তার সামান্য ভাইরাস জ্বর হয়েছিল। তাতেই হাসপাতালে ভর্তি। জোর করে দেওয়া হয় লাইফ সাপোর্ট। এতকিছুর পরও বাবা এ এফ এম মোরশেদ আলম মেনে নিয়েছিলেন। এর একটিই কারণ কলিজার টুকরা সুস্থ হবে। কিন্তু সব চেষ্টা বৃথা করে শবনম চলে যায় না ফেরার দেশে।

মোরশেদের ভাষ্য মতে, এ মৃত্যু স্রেফ রোগজনিত কারণে নয়। এর চেয়ে বেশি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, দালাল আর ভুল চিকিৎসায়। যেটি পরে চিকিৎসার কাগজপত্রেও প্রমাণ মিলেছে। তাই এখন আর কারো সান্ত¡নায় মন মানে না বাবা মোরশেদ আলমের। উল্টো যাদের কারণে মেয়েকে হারিয়েছে, তাদের বিচার না পাওয়ার যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

সন্তানহারা পিতা মোরশেদ আলম বলেন, তাকে আমি বাঁচাতে পারিনি। যাদের কারণে আমার মেয়েটার প্রাণ অকালে ঝরে গেল তাদের শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারছি না। ন্যায় বিচারটাও নিশ্চিত করতে পারছি না।

মেয়ে হারানোর শোকে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন শবনমের বাবা পাকিজা গ্রুপের ডিরেক্টর ও লিগ্যাল অ্যাডভাইজার এফ এম মোরশেদ আলম। শোক কাটিয়ে ওঠে এখন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি ও সন্তানের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে। অভিযোগ করতে থানায়ও গিয়েছিলেন। কিন্তু পোস্টমর্টেম না হওয়া এবং মৃত্যুর দীর্ঘদিন পর অভিযোগ নিয়ে যাওয়ায় জিডি নেয়া হয়নি। এখন তিনি আদালতের মাধ্যমে মামলা করার পরিকল্পনা করছেন। এই ঘটনা বিষয়ে জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি। তাদের সরবরাহকৃত বিভিন্ন রসিদে ব্যবহার করা মুঠোফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায়।

মোরশেদ আলম বলেন, আমার মেয়ের জ্বর থাকত তার শরীরে বেশিরভাগ সময়ই। আমি প্রথমে ইবনে সিনা হাসপাতালে দেখাই। তারা আমাকে বলে তেমন কিছুই হয়নি। এমআরআই থেকে শুরু করে অনেক ধরনের টেস্টই করা হয়। চিকিৎসকরা বলেন, কোনো সমস্যা নেই তার। সামান্য ভাইরাস জ্বর। ক’দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ২০১৭-এর ৬ আগস্ট তার জ্বর আবার বেড়ে যায়। ওইদিন অফিস থেকে এসে ওকে ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে যাই আমার গাড়িতে করে। সে আমার সঙ্গে কথাও বলে। সেখানে নেয়ার পর ইবনে সিনা থেকে আমাকে বলা হয় আমাদের এখানে কোনো কেবিন খালি নেই। আপনি কষ্ট করে অন্য জায়গায় ট্রাই করেন। তাছাড়া আপনার বাচ্চার অবস্থা তো তেমন খারাপও না।

মোরশেদ আলম বলেন, ওইদিন আমাদের অফিসেরই একজন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সুমন মেয়েকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে যেতে বলে। সুমন জানায়, সে ওখানে আসছে। আমি মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার পর সুমন, আমার অফিসের আরেকজন কর্মকর্তা বিপ্লব এবং ঢাকা মেডিক্যালের দালাল শিপন আমাকে বলে বাচ্চার অবস্থা ভালো না। আমরা তাকে আইসিইউতে ভর্তি করার ব্যবস্থা করছি। ঢামেকে ভর্তির সময় হঠাৎই তারা বলে এখানে সমস্যা হয়েছে। আইসিইউ খালি নেই। অন্য একটা হাসপাতাল (এলিফ্যান্ট রোডের জেনারেল হাসপাতাল) নিয়ে যান। এই বলেই তারা আমার মেয়েকে জোর করে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, ওই হাসপাতালে না ছিল কোনো পরিবেশ, না ছিল ডাক্তার। হাসপাতালে ভর্তি করে বাসায় আসি রাত আড়াইটায়। পর দিন সকালে আমাকে সুমন ফোন করে জানায়, আমার মেয়ে আর নেই। হাসপাতালে গিয়ে দেখি তার মাড়ির দাঁতভাঙা। লাইফ সাপোর্ট লাগানো।

জানা গেছে, মুমূর্ষু রোগীর জীবন-মরণের সঙ্গে সম্পর্কিত চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র আইসিইউ খোলার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয় না। এছাড়া কোনো ধরনের রোগীকে আইসিইউতে ভর্তি করতে হবে—এ সংক্রান্ত কোনো আইন, নীতিমালা কিংবা গাইডলাইনও নেই। আর এ সুযোগে এক শ্রেণির মুনাফালোভী ব্যবসায়ী স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নিয়ে আইসিইউ খুলে বসছে।

পিডিএসও/হেলাল