কারণ জানে না কেউ

বিদেশে নারীকর্মীদের আত্মহত্যা বাড়ছে

প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৯, ১২:১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে ২০১৮ সালে কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যান শাহনাজ। পরিবারের সুদিন ফেরাতে পারেননি তিনি, তার আগেই বেছে নেন আত্মহননের পথ। গত জানুয়ারিতে দেশে আনা হয় লাশ। তার পরিবার জানেন না শাহনাজ কী কারণে আত্মহত্যা করেছেন। প্রবাসে এ রকম অনেক নারীকর্মীর আত্মহত্যার সঠিক কারণ জানা যায় না। এমনকি জানার চেষ্টাও করা হয় না। ২০১৬ থেকে পরিসংখ্যান দেখলে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সৌদি আরবে নারীকর্মীদের আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি, যা দিন দিন বাড়ছে।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের হিসাব অনুযায়ী, বিদেশে কাজ করতে গিয়ে গত তিন বছরে আত্মহত্যা করেছেন ৪৪ জন নারীকর্মী। ডেস্কের কর্মকর্তাদের মতে, প্রবাসে মৃত কর্মীর লাশ সরকার নিজ খরচে দেশে আনে। এ ছাড়া সরকার দাফনের খরচসহ ক্ষতিপূরণেরও ব্যবস্থা করে থাকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনেক পরিবারের সদস্যরা লাশ ফেরত নিতে চান না, বিদেশ থেকে লাশ আনার জন্য আবেদনও করেন না। ফলে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে ঠিক কত জন মারা যান বা আত্মহত্যা করেন, তার সঠিক হিসাব জানা যায় না।

নারীকর্মীদের আত্মহত্যা বেড়েছে : এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশ থেকে নারীকর্মীর লাশ এসেছে ২৩টি। এর মধ্যে আত্মহত্যার কারণে মৃত্যু সাতজনের। এ ছাড়া গত তিন বছরে ২৯৪ জন নারীকর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ৫৭ জন, ২০১৭ সালে ১০২ এবং ২০১৮ সালে ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত নারীকর্মীদের মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ৪৪ জন। এ ছাড়া স্ট্রোকের কারণে মৃত্যু হয়েছে ১১০ জন নারীকর্মীর। ফেরত আসা লাশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে সৌদি আরব থেকে যার সংখ্যা ১১২। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২৬ জন, ওমান থেকে ৩৪, লেবানন থেকে ৪২ এবং জর্ডান থেকে ৬২ জন নারীকর্মীর লাশ এসেছে দেশে। ২০১৬ থেকে পরিসংখ্যান দেখলে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সৌদি আরবে নারীকর্মীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।

নির্যাতনের কথা জানান ফিরে আসা নারীকর্মীরা : নাসিমা আক্তার (ছদ্মনাম) অনেক স্বপ্ন নিয়ে দালালের মাধ্যমে কাজের আশায় পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। এজন্য দালালকে দিতে হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। চুক্তি হয়েছিল ৮০ হাজার টাকার। বাকি টাকা কাজে যোগ দিয়ে মাসিক বেতন এক হাজার রিয়াল থেকে দেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বুঝে নিয়ে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গত ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব যান। জেদ্দা এয়ারপোর্টে নামার পর রিক্রুটিং এজেন্সির লোক তাকে একটি বাড়িতে রাখে। চারদিক বন্ধ এই বাড়িকে বলা হয় ক্যাম্প। সেখানে তার সঙ্গে আরো কয়েকজন বাংলাদেশি নারীশ্রমিকের দেখা হয়। তাদের কাছে জানতে পারেন পাশবিক নির্যাতনের কথা। পাঁচ দিন পর নাসিমাকে পৌঁছে দেওয়া হয় তার নিয়োগকর্তার বাড়িতে। ছোট পরিবারের কথা বলে তাকে পাঠানো হলেও সেখানে গিয়ে দেখেন ভিন্ন চিত্র। ১১ সদস্যের পরিবারের রান্না, ঘরদোর মোছা, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে সবই করতে হবে।

কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলেও বিশ্রামের সুযোগ নেই। কারণ বিশ্রাম করতে গেলেই কফিল (মালিক) লাঠি দিয়ে মারে। দেশে ফিরে এভাবেই সৌদির দিনগুলোর বর্ণনা দেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের আহ্বান : অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বোমসা) নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম মনে করেন, কেউ মরার জন্য সৌদি আরব যান না। তাদের কোনো না কোনোভাবে মেরে ফেলা হয়। তিনি বলেন, ‘সেখানকার কর্মপরিবেশ এবং নিয়োগকর্তারা বাধ্য করেন আত্মহত্যার জন্য। আজকেও আমি ২৫০ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে আসলাম। তাদের দিকে তাকালে বোঝা যায় তারা কেউ আত্মহত্যা করতে যাননি। তারা প্রত্যেকেই স্বপ্ন নিয়ে গেছেন। বেশির ভাগ আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে; আসলে কি মেরে ফেলে নাকি এরা আত্মহত্যাই করেন।’

এ বিষয়ে ব্র্যাক মাইগ্রেশনের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘নারীকর্মীদের আত্মহত্যার পেছনে নির্যাতন একটি কারণ হতে পারে। হয়তো এমন কোনো পরিস্থিতিতে তিনি পড়েছিলেন যে, তার ধারণা এরপর আর বেঁচে থেকে লাভ নেই। কারণ সেই পরিস্থিতি তিনি মেনে নিতে পারেননি। ৪৪টি মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। গরিব মানুষ কিন্তু খুব সহজে আত্মহত্যা করতে চান না। চূড়ান্ত পর্যায়ে না গেলে তারা এ পর্যায়ে আসেন না।’

পিডিএসও/তাজ