২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় : তবু সরছে না পানি

*অবৈধভাবে খাল দখল *৪ নদী খননে অগ্রগতি নেই

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৭, ১২:৪৮ | আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৭, ১৪:০৯

হাসান ইমন

রাজধানীতে সামান্য বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আর একটু বেশি হলে জনদুর্ভোগের অন্তই থাকে না। ১০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে তলিয়ে যায় সড়ক, ফুটপাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। অথচ জলজট নিরসনে দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা গত আট বছরে ড্রেন সংস্কার ও উন্নয়নে দুই হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। এ ছাড়া নগরীর পাশে চারটি নদী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ প্রকল্পে কোনো গতি দেখা যাচ্ছে না। জলজটের কারণ হিসেবে ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সিটি করপোরেশনের ড্রেন অপরিষ্কার ও দিন দিন খাল সরু হওয়াকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নগরবাসীর অভিযোগ, সেবা সংস্থাগুলো শুধু কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এতে জনগণের কোনো উপকার হয় না। তাহলে জলাবদ্ধতা দূর করার নামে রাষ্ট্রের যে অর্থ খরচ করা হচ্ছে, তা জলে যাচ্ছে কি না। এ নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন অনেকেই। দিনের পর দিন রাস্তার ওপর ময়লা পড়ে থাকে। বৃষ্টির পানিতে এগুলো মিশে গিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বন্যাকবলিত এলাকার মতো পানিবন্দি হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। সম্প্রতি ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) রাজধানীর ড্রেন পরিষ্কার করে। কিন্তু ড্রেন পরিষ্কার করার পর যে ময়লা তাও দীর্ঘদিন ফেলে রাখা হয় রাস্তার পাশেই। আর সিটি করপোরেশনের ময়লা তো আছেই। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে এসব ময়লা আবার ড্রেনে পড়ার কারণে কার্যত ড্রেন পরিষ্কার করে জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ সফল হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের পথগুলো দখল, ভরাটের কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিচু স্থান ও জলাশয়ে গড়ে উঠছে আবাসন। আর তাই হাজার কোটি টাকা খরচ করেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। আসলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনের সমাধান এসব প্রতিষ্ঠানের কেউ জানে না।

জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে নগরবিদ ও জল পরিবেশ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, সুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সিস্টেম বিনষ্ট করে অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ, পানিপ্রবাহের সব পথ বন্ধ করে দেওয়া, অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে বক্স কালভার্ট নির্মাণ, খাল-জলাশয় জবরদখল ও ভরাটের কারণে পানিতে ডুবছে ঢাকাবাসী। সাত থেকে নয় মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেই পুরো রাজধানীতে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, জলাধার বিলীন, অতিরিক্ত বর্জ্য, বর্জ্য নিষ্কাশন ও ব্যবস্থাপনা সংকট, খাল দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। তিনি জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল অবৈধ দখলে মুক্তকরণ এবং পাশাপাশি খননের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

জানা যায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত ১২৭ দশমিক ৬৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম সরাসরি পরিচালনা করছে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ লাইন রয়েছে দুই হাজার কিলোমিটার। আর ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ লাইন ৩৭০ কিলোমিটার।

এদিকে রাজধানীর জলজট নিরসনে বিগত আট বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে বিভিন্ন সেবা সংস্থা। বর্ষা মৌসুমে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা কিভাবে নিরসন করা যায়, সে ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে নিয়ে দফায় দফায় সভা করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি এবং হচ্ছেও না।

ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে ঢাকা ওয়াসা পানি নিষ্কাশন কাজে ব্যয় করেছে ৬১৮ কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে ৩৭০ কিলোমিটার গভীর ড্রেনলাইন, ৮০ কিলোমিটার খাল ও ১৫ কিলোমিটার বক্স কালভার্টের উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ করেছে সংস্থাটি। আর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার (গভীর-অগভীর) ড্রেনলাইন সংস্কার ও উন্নয়নে ১ হাজার ২৭০ কোটি টাকা খরচ করেছে। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিগত আট বছরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশন লাইন মেরামত ও উন্নয়নে ব্যয় করেছে ১০৮ কোটি টাকা।

আবার গত বছরে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ নদী সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। তারা প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এ প্রস্তাব পাঠিয়েছিল; যাতে নৌবাহিনীকে দিয়ে এ চার নদ-নদীকে খনন ও সংস্কার করে এগুলোর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়। এ চার নদ-নদী সংস্কারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই কমিটি এখনো এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমলাতন্ত্রের গ্যাঁড়াকলে পড়ে সভা আর কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই সেই উদ্যোগ থমকে আছে।

অন্যদিকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন ২৬টি খাল রয়েছে। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। দখল-ভরাটে এসব খালের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। এর মধ্যে মান্ডা, হাজারীবাগ, কসাইবাড়ী, সাংবাদিক কলোনি ও বাইশটেকি খাল দখলের মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানায় চলে গেছে। এগুলো দখলমুক্ত করতে পারছে না জেলা প্রশাসন, ঢাকা ওয়াসা এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এই খালগুলো উদ্ধারে কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রতিবছর যেসব উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, সেগুলোয় কোনো ফল দেয় না। একদিকে উচ্ছেদ অভিযান চললেও একই সময়ে খালের আরেক অংশ দখল করে স্থাপনা গজিয়ে উঠতে থাকে। অন্যদিকে এসব খাল অবৈধ দখল উচ্ছেদ না করে নতুন খাল খনন শুরু করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। গত আট জুলাই কুড়িল বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কের দুই পাশে ১০০ ফুট চওড়া খাল খননকাজের উদ্বোধন করেন রাজউক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৮৬ দশমিক ৯১ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে সরকারের এ উদ্যোগ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান ও পুরনো খালগুলো সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া ছিল সবচেয়ে জরুরি।

নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, এ বছর রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। এখনো হচ্ছে। বৃষ্টিতে শহরের মধ্যে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এর দায়িত্ব কিন্তু আমাদের না, এটা ঢাকা ওয়াসার। কিন্তু মানুষ মনে করে এ দায়িত্বও তার নির্বাচিত প্রতিনিধি মেয়রের। আর জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রত্যাশা অনুযায়ী সিটি করপোরেশন সহযোগিতা করবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাহুল ইসলাম বলেন, নালাগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। বিগত দুই বছরে আমরা ড্রেনেজ লাইন তৈরি ও সংস্কার করে জলাবদ্ধতা নিরসনে বেশ কিছু সাফল্য পেয়েছি। এ ধারা অব্যাহত রেখে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করলে আগামী বর্ষায় জলাবদ্ধতার পরিমাণ আরো কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে জলাবদ্ধতা একেবারেই নিরসন করা খুবই কঠিন কাজ। এটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে চিন্তাভাবনা করতে হবে। নগরবাসীকেও এ ক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

পিডিএসও/হেলাল