উত্তরে ভয়াবহ বন্যা : কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরে ১০ জনের মৃত্যু

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ২১:১৭

অনলাইন ডেস্ক

অব্যাহত টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্তত ৪টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। গত ২৪ ঘন্টায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলাসহ দেশের প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বেশ কিছু পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে তা প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এখানকার ২৪টি উপজেলার প্রায় ৯ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যায় এই দুই জেলায় ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রামে ৬ জন এবং দিনাজপুরে ৪ জানের প্রাণহানীর খবর পাওয়া গেছে। বন্যায় তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি, স্কুল-কলেজ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল। বন্ধ হয়ে গেছে বিভিন্ন রুটের রেল যোগাযোগ। সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গেছে। বাঁধ রক্ষায় ও বানভাসী মানুষকে উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলার ৯টি উপজেলার ৫৭ ইউনিয়নের প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় এ পর্যন্ত ৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পানি অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় রোববার বিকালে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১২৪ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি ৩৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুড়িগ্রামের কাঠালবাড়ী, রাজারহাটের কালুয়া ও ফুলবাড়ীর গোড়কম-ল এলাকায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিভিন্ন স্থানে সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় জেলার সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে।
বন্যার কারণে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ৬০৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। পানিতে ডুবে যাওয়ায় ৮৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। সদরের কাউয়াহাগা এলাকায় বিদ্যুতের টাওয়ার ভেঙে পড়ায় সকাল থেকে জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ টিম মাঠে নেমেছে। সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খানের সভাপতিত্বে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা ও ত্রাণ তৎপরতা সচল রাখতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেলার সরকারি ও বেসরকারি সকল বিভাগকে বন্যার্তদের পাশে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, দুর্যোগ মোকাবেলায় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আনসার বিভাগকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ টিম বাঁধ সংষ্কারের কর্ম-পরিকল্পনা ও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে মাঠে কাজ শুরু করেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় চারজনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম সদরের খামার হলোখানায় সাপের কামড়ে অলিউর রহমানের স্ত্রী জ্যোস্না বেগম (২৫), পৌরসভার ভেলাকোপা এলাকার দুলু মিয়ার পূত্র বাবু (দেড় বছর) পানিতে ডুবে, ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের প্রাণকৃঞ্চ গ্রামের খাতক মামুদের ছেলে লুৎফর রহমান (৩৫) মাছ মারতে গিয়ে পানিতে ডুবে এবং গোড়কম-ল বস্তি গ্রামের মৃত: কাচু মামুদের ছেলে হযরত আলী (৫৫) আকস্মিক ঘরে পানি ঢোকায় আতংকে মারা যায়। রাজারহাটের ছিনাই ইউনিয়নের প্রক্তন চেয়ারম্যান সাদেকুল হক নুরু জানান, কালুয়ারচর ওয়াপদা বাঁধ রাতে ভেঙে যাওয়ার সময় রিফাত (১০) ও লোকমানের স্ত্রী (৩২) পানির তোড়ে ভেসে গেছেন।
পক্ষান্তরে দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। জেলার সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভেঙে গেছে দিনাজপুর শহর রক্ষা বাঁধসহ বেশ কয়েকটি নদীর বাঁধ। বন্যাজনিত কারনে জেলায় রোববার চার জনের মৃত্যু হয়েছে। বাঁধ রক্ষায় ও বানভাসী মানুষকে উদ্ধারের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে। বাড়িঘর ডুবে গিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে জেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ।
বন্যাজনিত কারণে পানিতে ডুবে, সর্প দংশনে এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন- দিনাজপুর শহরের দক্ষিণ বালুবাড়ী এলাকার আবদুল হাকিমের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৪৫), বালুবাড়ী ঢিবিপাড়া এলাকার এনামুল হকের ছেলে মেহেদী হাসান (১৫), সদর উপজেলার মির্জাপুর এলাকার আবদুল গফফারের ছেলে আবু নাইম (১৩) এবং বিরল উপজেলার মালঝাড় এলাকার বাবলু রায়ের স্ত্রী দিপালী রায় (৩২)।

পিডিএসও/মুস্তাফিজ