সম্ভাবনার নতুন দিগন্তে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:০৮

জুবায়ের চৌধুরী

নদী ও মানুষের সম্পর্ক সেই প্রাচীনকাল থেকেই। যেখানে নদী, সেখানেই মানুষ বসতি গড়ে তোলে। নদীর প্রাণ-প্রকৃতি ঘিরে গড়ে উঠে নতুন সভ্যতা। বিশ্বের অনেক দেশেই পর্যটনের মূল আকর্ষণ তাদের নদীকে ঘিরেই। অথচ বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও নদী কেন্দ্রিক পর্যটনে এখনো গড়ে ওঠেনি তেমন কোনো কাঠামো।

এই খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন মাত্রা। নদী কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের উন্নয়নকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের নদ-নদীকে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি করে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত কয়েক বছর ধরে দেশের নদী কেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে তুলতে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সে লক্ষ্যে কাজও চলছে।

সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে নদীর নাব্য রক্ষা, নদীর উপকূলে গড়ে তোলা যাবে সবুজ বেষ্টনী, স্থানে স্থানে পর্যটন স্পট, নদী পাবে তার হারানো যৌবন এতে শুধু পর্যটন সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলবে না একই সঙ্গে নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনেও আসবে গতি ও প্রাণচাঞ্চল্য। পাশাপাশি কৃষিতেও রাখবে উল্লেখযোগ্য অবদান।

অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশে এখনো নদী, হাওর, বাঁওড়, জলাভূমি কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের। কিন্তু এ বিষয়টি বিগত সময়ে ছিল গুরুত্বহীন, অবহেলিত এবং উপেক্ষিত। এ অবস্থায় দেশের অনেক নদী ও জলাভূমি অবৈধ দখল ও দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব নদ-নদী, হাওর, বাঁওড়, জলাভূমিতে নৌ চলাচল সচল করার পাশাপাশি পর্যটনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর ফলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের নৌ ভ্রমণও হতে পারে পর্যটনশিল্প বিকাশের অন্যতম উপকরণ।

নদীর কলতান আর মাঝির কণ্ঠের ভাওয়াইয়া গান। কিংবা নদীর দুধারের মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন। ছবির মতোই এমন চিত্র দেখা যাবে কেবল বাংলাদেশেই। নগরের কোলাহল ছেড়ে তাই প্রশান্তির নৌ ভ্রমণের দিকে ঝুঁকছে ভ্রমণ পিপাসুরা। তবে বর্তমানে দেশে নদীকেন্দ্রিক যে ইকো ট্যুরিজম পরিচালিত হচ্ছে তা মূলত সুন্দরবনকেন্দ্রিক ফরেস্ট সাফারি ট্রিপ। পাশাপাশি অল্প পরিসরে ঢাকাকেন্দ্রিক নৌ ট্রিপ, চট্টগ্রাম এবং খুলনায় কিছু অনিয়মিত রকেট স্টিমার ট্রিপ রয়েছে। তবে সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি। মূলত নদীগুলোর নাব্য কমে যাওয়া, পর্যটন জাহাজের স্বল্পতা ও নদীপথে নিরাপত্তার অভাবেই এটা সেভাবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। তবে রাজধানীর হাতিরঝিলে চালু করা স্বল্প দূরত্বের নৌ ভ্রমণ বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

গোটা বিশ্বই এখন নদীকেন্দ্রিক ইকো ট্যুরিজমকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। পর্যটনশিল্প বিকাশে এটি অন্যতম নিয়ামক। অথচ নদীমাতৃক দেশ হয়েও বাংলাদেশে বিকাশ হচ্ছে না সম্ভাবনাময় এই খাতটি। বরং অবৈধ দখল ও পরিকল্পনাহীনতায় নৌপথগুলো ছোট হয়ে আসছে। নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা সর্বোপরি দূষণের কারণেও আগ্রহ হারাচ্ছেন পর্যটকরা। জলাভূমিকেন্দ্রিক পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা না গেলে দেশের নদী ও জলাভূমিগুলো অবৈধ দখল ও দূষণ থেকে রক্ষা করা যাবে না। এসব রক্ষা করা গেলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের বাহন নৌকা ভ্রমণও শুরু হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের নদীগুলো সংস্কার করে আনুষঙ্গিক অবকাঠামো তৈরি করা গেলে শুধু নদীকেন্দ্রিক ইকো-ট্যুরিজম দিয়েই মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে এ খাতে সৃষ্টি হবে বহু কর্মসংস্থানের সুযোগ। ১৯৭১ সালে দেশে প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ থাকলেও বর্তমানে তা ৬ হাজার কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। ছোট-বড় মিলে বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা প্রায় ৩০০। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এর অন্যতম। এসব নদীর পাড় ঘেঁষে আছে অসংখ্য গ্রাম, হাট-বাজার, কৃষি জমি ও লোকজ ঐতিহ্য, যা দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে সক্ষম। সারা দেশে ২৩০টি নদীর প্রায় ২৪ হাজার নদী পথ। সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশীয় পর্যটকের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ সম্ভব বলে মনে করেন ট্যুর অপারেটররা।

এরই মধ্যে রাজধানীর চারপাশে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু নদীকে অতীত ঐতিহ্যে ফিরিয়ে নিতে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব নদীকেন্দ্রিক নৌচলাচল সচল করার পাশাপাশি এবং নদীর উপকূলজুড়ে গড়ে তোলা হবে সবুজ বেষ্টনী, পিকনিক স্পট, বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য নদ-নদীর নাব্য রক্ষাসহ নদীর গতিপথ ফিরিয়ে আনতে ২২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নদী ও জলাভূমি কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে কাজ করছে সরকার।

নদী কেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনা বিবেচনায় হোটেল ও বোটের সমন্বয়ে ‘বোটেল’ চালুরও উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি)। তারা জানিয়েছে, নদী কেন্দ্রিক পর্যটক আকর্ষণে নেওয়া হয়েছে মাস্টার প্ল্যান। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নদী কেন্দ্রিক পর্যটনে সম্ভাবনার সব দ্বার খুলে দেবে। দেশের পর্যটন শিল্প নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো কাজ করছে। শিগগিরই সে সংক্রান্ত কাজগুলো দৃশ্যমান হবে। এরই মধ্যে ঢাকার আশপাশের নদীগুলো দখল-দূষণ উচ্ছেদে কাজ চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ভূবন চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হোটেল এবং বোট এই দুইটা মিলে ‘বোটেল’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেখানে থাকার ব্যবস্থাও থাকবে। ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরও হয়েছে। তাদের জাহাজ আমাদের জলসীমায় আসবে আমাদের জাহাজ তাদের জলসীমায় যাবে।

সম্প্রতি নদীপথে ভারত যাওয়া-আসার পথ চালু হয়েছে। এটিও নদী কেন্দ্রিক পর্যটন বিকাশে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তবে এ খাতের সম্প্রসারণ করতে হলে ট্যুর অপারেটরদের প্রণোদনা দেওয়ার পরামর্শ পর্যটন বিশেষজ্ঞদের। ট্রাভেলার্স হাব লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুর রহমান বলেন, পর্যটন করপোরেশন, পর্যটন বোর্ড, মন্ত্রণালয় এবং প্রাইভেট এজেন্সির মধ্যে যদি সমন্বয় করা সম্ভব হলে বিদেশি পর্যটক টানাও সম্ভব।

পিডিএসও/হেলাল