আইয়ুব বাচ্চু স্মরণে

চলে যাওয়ার ১ বছর

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ১০:২৫

তুহিন খান নিহাল
আইয়ুব বাচ্চুর চলে যাওয়া আজও কাঁদায় ভক্তদের

চট্টগ্রামের দুরন্ত কিশোর ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। কৈশোরেই প্রেমে পড়েছিলেন গিটারের, এই সুরযন্ত্রের সঙ্গে বেঁধেছিলেন মনপ্রাণ। তার গিটারের অপূর্ব মূর্র্ছনা ও কণ্ঠের জাদু মাতিয়ে রাখত সংগীতপ্রেমীদের। গিটারের ছয় তারে জয় করেছেন উপমহাদেশ। অপূর্ব কণ্ঠে তিনি গেয়েছিলেন ‘এই রুপালি গিটার ফেলে/এক দিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে/সেদিন অশ্রু তুমি রেখো/গোপন করে।’ গানটিই যেন গিটারের প্রতি আইয়ুব বাচ্চুর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। প্রিয় রুপালি গিটার ফেলে সত্যিই অনেক দূরে চলে গেছেন এ গিটারের জাদুকর।

গত বছরের এদিনে না ফেরার দেশে পাড়ি দেন আইয়ুব বাচ্চু। আজ তার চলে যাওয়ার এক বছর। তার এ চলে যাওয়া আজও কাঁদায় ভক্ত অনুরাগী ও সহকর্মীদের। কিন্তু প্রায়ই এ ঘুমন্ত শহরে এখনো অবিরাম সুরে বেজে ওঠে রুপালি গিটারের মন মনোহর ধ্বনি। প্রতি রাতে কোনো না কোনো শহরে আইয়ুব বাচ্চুর রেখে যাওয়া গিটারের সুর বেজে ওঠে। সঙ্গে তার শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। গেয়ে যাচ্ছে নিরবধি। বিশেষ করে যখন উৎসবের আনন্দে পুরো দেশ উদ্ভাসিত হয়। আইয়ুব বাচ্চু তখন আমাদের কাছে অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাজতে থাকে জনপ্রিয় গানগুলো। সেই গানের মাঝেই খুঁজে পায় গিটারের জাদুকরকে।

১৯৬২ সালে জন্ম নেওয়া চট্টগ্রামের সন্তান আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একাধারে গায়ক, লিড গিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার, প্লেব্যাক শিল্পী। এলআরবি ব্যান্ডদলের লিড গিটারিস্ট এবং ভোকাল বাচ্চু বাংলাদেশের ব্যান্ডজগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি ১০ বছর সোলস ব্যান্ডের সঙ্গে লিড গিটারিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সংগীত জগতে তার যাত্রা হয় ১৯৭৮ সালে। প্রয়াত গুণী এ শিল্পী তার শ্রোতা-ভক্তদের কাছে ‘এবি’ নামেও পরিচিত। তার ডাক নাম রবিন।

মূলত রকঘরানার কণ্ঠের অধিকারী হলেও আধুনিক গান, ক্লাসিক্যাল সংগীত এবং লোকগীতি দিয়েও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। বাচ্চুর সংগীতজগতে যাত্রা হয় ফিলিংস ব্যান্ডের সঙ্গে ১৯৭৮ সালে। তার কণ্ঠ দেওয়া প্রথম গান ‘হারানো বিকেলের গল্প’। গানটির কথা লিখেছিলেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গি। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালে তিনি সোলস ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত রক্তগোলাপ আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম প্রকাশিত একক অ্যালবাম। এই অ্যালবামটি তেমন একটা সাফল্য পায়নি। আইয়ুব বাচ্চুর সফলতার শুরু তার দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ময়নার মাধ্যমে।

১৯৯১ সালে বাচ্চু এলআরবি ব্যান্ড গঠন করেন। এই ব্যান্ডের সঙ্গে তার প্রথম ব্যান্ড অ্যালবাম এলআরবি প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। এটি বাংলাদেশের প্রথম দ্বৈত অ্যালবাম। এই অ্যালবামের ‘শেষ চিঠি কেমন এমন চিঠি’, ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘হকার’ গানগুলো জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরে ১৯৯৩ ও ৯৪ সালে তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যান্ড অ্যালবাম সুখ ও তবু বের হয়। সুখ অ্যালবামের ‘সুখ’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘রুপালি গিটার’, ‘গতকাল রাতে’ উল্লেখযোগ্য গান। ‘চলো বদলে যাই’ বাংলাদেশের সংগীতজগতে অন্যতম জনপ্রিয় একটি গান। গানটির কথা লিখেছেন ও সুর করেছেন বাচ্চু নিজেই। ১৯৯৫ সালে তিনি বের করেন তৃতীয় একক অ্যালবাম কষ্ট। সর্বকালের সেরা একক অ্যালবামের একটি বলে অভিহিত করা হয় এটিকে। এই অ্যালবামের প্রায় সবগুলো গানই জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘অবাক হৃদয়’, ও ‘আমিও মানুষ’। একই বছর তার চতুর্থ ব্যান্ড অ্যালবাম ঘুমন্ত শহরে প্রকাশিত হয়।

তিনি অনেক বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন। ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ বাংলা সিনেমার অন্যতম একটি জনপ্রিয় গান। এটি তার গাওয়া প্রথম চলচ্চিত্রের গান। ২০০৯ সালে তার একক অ্যালবাম বলিনি কখনো প্রকাশিত হয়। ২০১১ সালে এলআরবি ব্যান্ড থেকে বের করেন ব্যান্ড অ্যালবাম যুদ্ধ। এই অ্যালবামে ১০টি গান রয়েছে। ছয় বছর পর তার পরবর্তী একক অ্যালবাম জীবনের গল্প বাজারে আসে। এই অ্যালবামে ১০টি গান রয়েছে। গানের কথা লিখেছেন সাজ্জাদ হোসাইন এবং সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন আইয়ুব বাচ্চু নিজে।

গিটারে তিনি গোটা উপমহাদেশে বিখ্যাত। জিমি হেন্ড্রিক্স এবং জো স্যাট্রিয়ানীর বাজনায় তিনি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত। আইয়ুব বাচ্চুর নিজের একটি স্টুডিও আছে। ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত এই মিউজিক স্টুডিওটির নাম এবি কিচেন। তিনি ২০১০ সালে ঈদের জন্য নির্মিত ট্রাফিক সিগন্যাল ও হলুদ বাতি শিরোনামের নাটকে অভিনয় করেন। ২০১২ সালের ২৭ নভেম্বর বাচ্চু ফুসফুসে পানি জমার কারণে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসা গ্রহণের পর তিনি সুস্থ হন। কিন্তু গত বছরের এদিনে তিনি আর সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারেননি। এর আগেই রুপালি গিটার ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান তিনি।

পিডিএসও/হেলাল