‘সে হারালো কোথায় কোন দূর অজানায়’

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০১৯, ১০:১৭

তুহিন খান নিহাল

তখনো পরাধীনতার নাগপাশে বাঁধা দেশ। কিন্তু বিপরীত সময়ে ১৯৭০ সালে গাইলেন সেই কালজয়ী গান। ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা, তোমাদের এই ঋণ কোনো দিন শোধ হবে না’। স্বাধীনতার পরে দীর্ঘ সময় মায়াবী, সুরেলা কণ্ঠে গান করেছেন নিজস্ব ঢংয়ে। এবার পৃথিবীকে জানিয়ে দিলেন বিদায়। এক আকাশ হাহাকার ছড়িয়ে নিজের গানের মতোই সব শিকল ছিঁড়ে শেষ ডাকে সাড়া দিলেন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ। তার এই মৃত্যুতে নিভে গেল বাংলা গানের আরো একটি নক্ষত্র।

নন্দিত সংগীতশিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি। স্বামী মেজর (অব.) আবুল বাশার রহমতুল্লাহ একজন ব্যবসায়ী, মেয়ে নাহিদ রহমতুল্লাহ থাকেন লন্ডনে আর ছেলে এ কে এম সায়েফ রহমতুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করে এখন কানাডায়। গতকাল রোববার বাদ জোহর বারিধারায় পার্ক মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বেলা ২টা ৪০ মিনিটের দিকে বনানীর সামরিক কবরস্থানে তাকে চিরনিন্দ্রায় শায়িত করা হয়।

শাহনাজ রহমতুল্লাহর কাছ থেকে জীবদ্দশায় জানা যায়, তার জন্ম ১৯৫৩ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকায়। তার বাবা এম ফজলুল হক, মা আসিয়া হক। মায়ের হাতেই ছোটবেলায় শাহনাজের গানের হাতেখড়ি। পরিবারের সবার কাছে তিনি ছিলেন আদরের শাহীন। ছোটবেলাতেই তিনি শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান।

মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। সেই থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত নিয়মিত গান করেছেন। টেলিভিশনে গান গাইতে শুরু করেন ১৯৬৪ সাল থেকে। চলচ্চিত্রের গানও পেয়েছে সমান জনপ্রিয়তা। শাহনাজ রহমতুল্লাহ সত্তরের দশকে অনেক উর্দু গীত ও গজল গেয়েছেন। প্রখ্যাত গজলশিল্পী মেহেদী হাসানের কাছে তিনি গজল শিখেছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি আবুল বাশার রহমতুল্লাহর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

শাহনাজ রহমতুল্লাহ প্রথমে উচ্চাঙ্গসংগীতে তালিম নেন ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদের কাছে। এরপর তিনি ওস্তাদ মনির হোসেন, গজল সম্রাট মেহেদী হাসান, শহীদ আলতাফ মাহমুদের কাছেও গানে তালিম নেন। বিয়ের পরে তিনটি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছিলেন শাহনাজ। খান আতাউর রহমানের সুরে ‘আবার তোরা মানুষ হ’, আলাউদ্দীন আলীর সুরে ‘সাক্ষী’ ও আনোয়ার পারভেজের সুরে ‘ছুটির ফাঁদে’ চলচ্চিত্রে।

এর মধ্যে ‘ছুটির ফাঁদে’ চলচ্চিত্রে গাওয়া ‘সাগরের সৈকতে কে যেন দূর থেকে’ গানটির জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। পরবর্তীতে ‘ঘুড্ডি’ সিনেমাতে গান গাওয়ার জন্য তিনি দ্বিতীয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। শাহনাজ রহমতুল্লাহর ভাই আনোয়ার পারভেজ ছিলেন এ দেশের প্রখ্যাত সুরকার এবং সংগীত পরিচালক। আরেক ভাই জাফর ইকবাল ছিলেন এ দেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক। বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতুল্লাহর গাওয়া চারটি গান স্থান পায়। এর মধ্যে আনোয়ার পারভেজের সুর করা দুটি গান, খান আতাউর রহমান, আবদুল লতিফের সুরে দুটি ভিন্ন গান রয়েছে।

সংগীতে অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, জাপান-বাংলাদেশ কালচারাল ফোরাম অ্যাওয়ার্ড, বাচসাস পুরস্কারসহ বহু সম্মানায় ভূষিত হয়েছেন। তার কণ্ঠে এ দেশের মানুষ শুনেছেন অনেক কালজয়ী গান। এর মাঝে ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘আমার দেশের মাটির গন্ধে’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে আমায় বল’, ‘সাগরের তীর থেকে’, ‘ যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘খোলা জানালা’, ‘পারি না ভুলে যেতে’, ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে’ ইত্যাদি। ৬৭ বছর জীবনে এই সংগীতশিল্পী রেখে গেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। এমন আরো অসংখ্য গান তার রয়েছে। সুরের নেপথ্যে থাকা এ দেশের সংগীতপ্রেমীরা যুগে যুগে খুঁজবেন তাকে।

পিডিএসও/তাজ