প্রেক্ষাগৃহে দর্শকখরা

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ০৯:২৪ | আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ১৪:২০

মিলন মাহমুদ রবি

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বলতে অবিভক্ত বঙ্গ থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে বোঝায়। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও ১৮৯০ সালে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল। চলচ্চিত্রের উৎপত্তি ১৯১০ সালের দিকে হলেও এখানে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে ৫০-এর দশকে। প্রায় ৫০ বছরের মতো সময় লেগেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে চলচ্চিত্রের খাপ খাইয়ে নিতে।

৯০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছরে গড়ে ৮০টির মতো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। আর ২০০৪ সালের হিসাব মতে, রাজধানী ঢাকাতে বছরে গড়ে প্রায় ১০০টির মতো চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। এ হিসেবে দেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে বেশ বড় শিল্পই বলা যেতে পারে। আর বিনোদন কেন্দ্র বলতে একসময়ে সিনেমা হলগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। আজ সেই সিনেমা হলগুলোয় দর্শকখরা চলছে।


রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সিনেমা হলগুলো যেন এখন পরিত্যক্ত জাদুঘর! ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ক্রমেই লোকসান দিতে দিতে অনেকেই একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ করে দিয়েছেন


দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়ায় ছবি চালিয়ে খরচ ওঠানো হলমালিকদের জন্য এখন খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সিনেমা হলগুলো যেন এখন পরিত্যক্ত জাদুঘর! ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ক্রমেই লোকসান দিতে দিতে অনেকেই একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ কূলকিনারা হারিয়ে বন্ধ করার চিন্তা করছেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ঢাকাসহ সারা দেশে মোট ১ হাজার ৪৩৫টি সিনেমা হল চালু আছে। দেশে ২০১১ সালেও চালু সিনেমা হলের সংখ্যা ৬১৮টি। ২০১০ সালেও এ সংখ্যা ছিল ৭২২টি।

২০১২ সালের পর এ পর্যন্ত একের পর এক সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুর, চট্টগ্রাম রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর বিভাগে একের পর সিনেমা হল বন্ধ হয়েছে। সারা দেশে বন্ধ হওয়া সিনেমা হলগুলোর মালিকরা কেউ কেউ গোডাউন হিসেবে ভাড়া দিয়েছে। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে সুপার শপ। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরে বন্ধ হয়েছে ২০টিরও বেশি। এর মধ্যে ঢাকাতে অধিকাংশ হল ভেঙে বিপণিবিতান নির্মাণ হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে এখন চালু আছে এমন সিনেমা হলের সংখ্যা ২৮টি।

বন্ধ হতে যাওয়া তেমনই একটি সিনেমা হল সাতক্ষীরার কলারোয়া থানার ‘জোনাকি সিনেমা’ হল, ১৯৮৩ সালে নির্মাণ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মো. আতিয়ার রহমান। একসঙ্গে ৫০০ আসনের ব্যবস্থা আছে হলটিতে। তার স্বপ্ন ছিল চলচ্চিত্র ব্যবসা করার। তাই তিনি সেই সময়ে নিজ গ্রামে নির্মাণ করেন হলটি। বেশ ভালো ব্যবসাও জমিয়েছিলেন। আতিয়ার রহমান মারা যাওয়ার পর ব্যবসার দায়িত্ব পালন করেন তার চার ছেলে। তবে বর্তমানে পুরোপুরি দেখাশোনা করছেন মেঝো ছেলে শাহজাহান কবির ডাবলু। বাবার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে বেহাল দশা হলটির। ভালো ছবি মুক্তি না পাওয়ায়, সারা দিনে কোনো দর্শকদের আনাগোনা না থাকায়, বসেই দিন পার করছেন হলমালিকসহ স্টাফরা। এমন অবস্থায় মাস শেষে স্টাফদের বেতন দেওয়াই দায় হয়ে পড়ে।

ডাবলু জানান, বর্তমানে আমরা হলমালিকরা চাহিদামতো ছবি পাচ্ছি না। তা ছাড়া মানসম্মত ছবি না থাকায় দর্শকখরা থাকে মাসব্যাপী। তবে জাজ মাল্টিমিডিয়ার আবদুল আজিজ ভাইয়ের সাহসী পদক্ষেপের কারণে মাঝেমধ্যে কিছু ভালো ছবি মুক্তি পাচ্ছে, বিশেষ করে যৌথ প্রযোজনার ছবিগুলো দেখতে দর্শক হলমুখী হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, দর্শক ছাড়া হলগুলোর কোনো মূল্য নেই। এ ছাড়া সিনেমাশিল্পকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে এ শিল্পের ওপর আরোপিত সব ধরনের ভ্যাট, ট্যাক্স প্রত্যাহার করতে হবে। এ অবস্থায় দেশের মানুষের বিনোদনের প্রাচীন ও জনপ্রিয় এ খাতকে রক্ষা করার জন্য সরকারি সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

পিডিএসও/হেলাল