নীলফামারী-৪

জাপা ও আ.লীগের মনোনয়ন লড়াই, পুনরুদ্ধার চায় বিএনপি ও জাসদ

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:২২

ওয়ালী মাহমুদ সুমন, নীলফামারী ও জহরুল ইসলাম খোকন, সৈয়দপুর

বিগত সময়ে একাধিক দল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বহু দলীয় লড়াইয়ের ময়দান হয়ে উঠেছে নীলফামারী-৪ আসন। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও এ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি (জাপা) থেকে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন। গত নির্বাচনে জাপা থেকে এমপি নির্বাচিত হলেও, মনোনয়ন দৌরাত্ম্যে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে মাঠ জরিপে দেখা গেছে।

জেলার সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলার ১৪ ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে নীলফামারী-৪ আসন। এ আসনের সৈয়দপুর উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা এবং কিশোরগঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন রয়েছে। দশম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন (রণচ-ি, বড়ভিটা ও পুটিমারী) নীলফামারী-৩ আসনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রথমবারের মতো এবার ইউনিয়নগুলো নীলফামারী-৪ আসনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে নতুন ভোটার ও সংযুক্ত তিন ইউনিয়নের মিলিয়ে ভোটার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় এক লাখ। এ বছর সংসদ সদস্য নির্বাচনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকবে।

নীলফামারী-৪ আসনে এবার ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭১ হাজার ৭৭৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৮৬ হাজার ২৮৬ জন এবং নারী ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪৮৯ জন।

এ ছাড়া উপজেলার ভিত্তিতে সৈয়দপুরে ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৯৪৫ এবং কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ১ লাখ ৮২ হাজার ৮৩০ জন। দশম সংসদে এখানে মোট ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৭৯ হাজার ১০২ জন।

জাতীয় সংসদে নীলফামারী-৪ আসনের বর্তমান প্রতিনিধিত্ব করছেন জাতীয় পার্টির শওকত চৌধুরী। বিএনপি জোটবিহীন গত সংসদ নির্বাচনে এখান থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তিনি। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায় সপ্তম সংসদে জাতীয় পার্টির ড. আসাদুর রহমান, অষ্টম সংসদে বিএনপির আমজাদ হোসেন সরকার, নবম সংসদে আওয়ামী লীগের কর্নেল (অব.) মারুফ সাকলান নির্বাচিত হন।

একাদশ সংসদে আওয়ামী লীগে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন সৈয়দপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মোখছেদুল মোমিন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক আখতার হোসেন বাদল, কিশোরগঞ্জ উপজেলা সম্পাদক জাকির হোসেন বাবুল, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মোখছেদুল ইসলাম, কৃষক লীগ নেতা প্রকৌশলী সেকেন্দার আলী, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটির সদস্য আমেনা কোহিনূর আলম, আওয়ামী কর আইনজীবী সমিতির প্রকাশনা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আমিরুল ইসলাম আমির, কিশোরগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার হাবিবুর রহমান, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা লীগের সিনিয়র সহসভাপতি আমিনুল ইসলাম।

এদিকে বিএনপিতে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে রয়েছেন সাবেক এমপি ও সৈয়দপুর পৌর মেয়র আমজাদ হোসেন সরকার, সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বিলকিস ইসলাম, কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক কণ্ঠশিল্পী বেবি নাজনিন এবং প্রাক্তন ছাত্রদল নেত্রী কৃষিবিদ পারভীন আক্তার।

এ ছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে বর্তমান এমপি ও জেলার জাপা সভাপতি শওকত চৌধুরী আছেন প্রার্থী তালিকায়। তরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এরশাদের ভাগ্নে আহসান আদেলুর রহমান আদেল। তিনি সাবেক এমপি আসাদুর রহমান ও বর্তমান এমপি মেরিনা রহমানের ছেলে। আরো আছেন কিশোরগঞ্জ উপজেলা জাপা সভাপতি এবং উপজেলা চেয়ারম্যান রশিদুল ইসলাম।

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) অ্যাড. সুজা-উদ-দৌলা এবং ইসলামী আন্দোলনের হয়ে কৃষক ও মজুর আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি শফিকুল ইসলামকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দৌড়ে আছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

মনোনয়নপ্রত্যাশী সৈয়দপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক আখতার হোসেন বাদল বলেন, ‘সারা দেশে উন্নয়নের ধারায় এখানেও পরিবর্তন হয়েছে। নেতাকর্মীরা নৌকা প্রতীকের প্রার্থী চান এ আসনে। আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে আসনটি শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারব।

আরেক প্রত্যাশী ব্যারিস্টার মোকছেদুল ইসলাম জানান, ‘আওয়ামী লীগে যোগদানের পর থেকেই আমি দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ছাড়াও তৃণমূলে মানুষদের সঙ্গে রয়েছি। নবম ও দশম সংসদের আমি মনোনয়ন চেয়েছিলাম কিন্তু পাইনি। সে জন্য বসে থাকিনি।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি এবং ১/১১-এ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজপথে অবস্থান নিয়েছিলাম। নেত্রী নিশ্চয়ই এবার আমাকে মূল্যায়ন করবেন।’

‘এটা জাতীয় পার্টির দুর্গ’ দাবি করে বর্তমান এমপি জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শওকত চৌধুরী জানান, ‘আমার সময় উন্নয়ন হিসেবে সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের উন্নীতকরণ, রেলওয়ে কারখানা এবং রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে। নির্বাচনী এলাকার লক্ষাধিক মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় রয়েছে এবং প্রতিটি বাড়ি আমি চিনি। জাতীয় পার্টি শুধু সৈয়দপুর নয়, অন্য তিনটি আসনে বিজয় লাভ করতে পারবে।’

জাতীয় পার্টির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী রশিদুল ইসলাম জানান, জাতীয় পার্টির অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেওয়া এবং আমার তথা পার্টির সব নেতাকর্মীর একমাত্র লক্ষ্য। লাঙ্গল পেলে নিশ্চিত বিজয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন, এলাকার রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এলাকা গড়ে তুলব।’

এদিকে ‘সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ হলে বিএনপি প্রার্থীকে কেউ হারাতে পারবে না’ দাবি করে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা বিএনপির সম্পাদক ও সৈয়দপুর পৌর মেয়র আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, ‘আমাকে এ এলাকার মানুষ অনেকবার নির্বাচিত করেছেন। তাদের সুখে-দুঃখে রয়েছি। অনেক উন্নয়ন করেছি। সেটি মানুষ জানে। বিএনপি এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশে আছে।’

আরেক প্রত্যাশী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় নেত্রী বিলকিস ইসলাম জানান, ‘অষ্টম সংসদে সংরক্ষিত আসনের এমপি ছিলাম এখানে। কী করেছি মানুষ জানে। মানুষ ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। মনোনয়ন পেলে নিশ্চিতভাবে দলকে আসনটি উপহার দিতে পারব।’ বিএনপির আরেক নারী প্রার্থী কৃষিবিদ পারভীন আখতার বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দলীয় কর্মকা-ে জড়িত ছিলাম সব সময়। মনোনয়ন চাইব দলের কাছে। আমি মনে করি দল মূল্যায়ন করবে আমাকে।’

তবে স্থানীয়রা মনে করেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য বিভিন্ন সময়ে নির্বাচিত হওয়ায় সব দলেরই ভোটব্যাংক রয়েছে এখানে। আসনটিতে আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে তিন দলের প্রার্থীর মধ্যে।

এদিকে সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোখছেদুল মোমিন বলেন, এখানে মহাজোটের একক প্রার্থী না দিয়ে উন্মুক্ত রাখা হোক দুই দলের জন্য। আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টিও অংশগ্রহণ করুক। নিশ্চয় নৌকা জয়লাভ করবে।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আসনটিতে ১৫৭টি ভোটকেন্দ্রের ৮১০টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে। এর আগে দশম সংসদ নির্বাচনে ১২৩টি ভোটকেন্দ্রের ৫৯৩টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ করা হয়ে ছিল।

পিডিএসও/রিহাব