নীলফামারী-১

আ.লীগে একাধিক প্রার্থী, বিএনপিতে দোলাচল

প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ১০:১৭

ওয়ালি মাহমুদ সুমন, নীলফামারী

নীলফামারী-১ আসনে গতবারের তুলনায় ভোটার সংখ্যা বেড়েছে ৪০ হাজার। নির্বাচনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। জেলার ডোমার ও ডিমলা উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নীলফামারী-১। এ বছর এখানে ভোটার ৩ লাখ ৭২ হাজার ৪৩৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৯১ এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪৪৮ জন।

সর্বশেষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটবিহীন দশম সংসদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন সরকার প্রায় ৬৫ হাজার ভোটে পরাজিত করেন নবম সংসদের জাতীয় পার্টির এমপি জাফর ইকবাল সিদ্দিকীকে। এবারের নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগে প্রার্থীর সংখ্যা লক্ষণীয় হলেও, জাতীয় পার্টির থেকে একক প্রার্থীই থাকছেন। এদিকে বিএনপিতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও জামায়াত নিশ্চিত করেছে তাদের প্রার্থী। আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান এমপি ও

ডিমলা উপজেলা আওয়ামী লীগসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন সরকার ছাড়াও মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে রয়েছেন হামিদা বানু শোভা, ডোমার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক খায়রুল আলম বাবুল, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের সম্পাদক (কল্যাণ ও পুনর্বাসন) সরকার ফারহানা আখতার সুমি, সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মনোয়ার হোসেন এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপদেষ্টা ও বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক ব্যারিস্টার ইমরান কবির চৌধুরী জনি। এ ছাড়া জাতীয় পার্টিতে একক প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন শিল্পপতি জাফর ইকবাল সিদ্দিকী।

এদিকে দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বেগম খালেদা জিয়ার ভাগিনা প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন বিদেশে পলাতক থাকায় এ আসনে বিএনপির প্রার্থী নিয়ে রয়েছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। তবে নবম সংসদের প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি তুহিনের বাবা অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের নাম রয়েছে প্রার্থীর তালিকায়। প্রার্থীর তালিকায় নাম এসেছে খালেদা জিয়ার বোন সেলিনা ইসলামেরও। তিনি তুহিনের বাবা ও অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের স্ত্রী।

তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন প্রয়াত সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়ার দৌহিত্র ও ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুস সাত্তার নির্বাচনী এলাকায় সাঁটিয়েছেন নিজের ছবিসংবলিত পোস্টার।

বিভিন্ন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন, জোটগতভাবে নির্বাচন হলে প্রার্থীর ধরন হবে এক রকম এবং আলাদা আলাদা নির্বাচন হলে প্রার্থী সে ক্ষেত্রে মনোনয়নের ধরন হবে আরেক রকম।

নিজের প্রার্থিতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থাশীল বর্তমান এমপি আফতাব উদ্দিন সরকার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘গত নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর মেয়ে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে বিপুল ভোটে আমি বিজয়ী হয়ে নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করতে পেরেছি। এলাকায় আওয়ামী লীগ এখন সুসংগঠিত। আমি মনোনয়ন পেলে নিশ্চয় গতবারের চেয়ে আরো বেশি ভোটে বিজয়ী হতে পারব।’ তিনি জানান, তার কাজে খুশি হয়ে দলীয় সভাপতি তাকে মনোনয়ন দেবেন আর যদি না দেন, তাহলে যাকেই প্রার্থী করা হোক না কেন, তার হয়েই কাজ করবেন।

মনোনয়নপ্রত্যাশী মুক্তিযোদ্ধা সন্তান এবং আওয়ামী যুবমহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সহ-পাঠাগার ও প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক সরকার ফারহানা আখতার সুমি বলেন, নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিলে আসনটি উপহার দিতে পারব, যা রেকর্ড হিসেবে থাকবে। তিনি আরো বলেন, আমি দীর্ঘদিন থেকে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে এলাকার মানুষের সঙ্গে কাজ করে আসছি। নেত্রীর স্বপ্ন এবং সরকারের সফলতা পৌঁছে দিয়েছি মানুষের ঘরে ঘরে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার প্রতি এলাকার মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে। আমি নির্বাচিত হলে নেত্রীর প্রতিটি কাজ অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।’

মনোনয়নপ্রত্যাশী সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যার্টনি জেনারেল, আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক উপকমিটির সদস্য এবং ডোমার পৌর আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এর আগেও মনোনয়ন চেয়েছিলাম আমি। কিন্তু পাইনি। তার পরও বসে থাকিনি। নিরলসভাবে কাজ করে আসছি এখনো। প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে নেত্রীর কথা বলেছি, উন্নয়নের কথা পৌঁছে দিয়েছি।’

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ব্যারিস্টার ইমরান কবির চৌধুরী জনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে যেসব শর্ত দিয়েছেন, আমি মনে করি সেগুলোর দিক থেকে আমি যোগ্য। তরুণ, পারিবারিক ঐতিহ্য, ক্লিন ইমেজ প্রার্থী খুঁজছেন নেত্রী। আমার পরিবার আজও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করে চলেছেন।’

জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক এমপি শিল্পপতি জাফর ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, ‘পার্টির চেয়ারম্যানের গ্রিন সিগন্যালে আমি এলাকায় কাজ করছি। এ আসনটি জাতীয় পার্টির। আমার সময়ে কী হয়েছে আর এখন কী হয়েছে, সেটি বিচার-বিবেচনা করবেন স্থানীয়রা। জোটগত কিংবা এককভাবে নির্বাচন করলেও এখান থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর বিজয় সুনিশ্চিত।’ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য জাফর ইকবাল বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে আমার অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করব। সে সুযোগ দেবেন মহাজোটের শীর্ষ নেতারা।’

ষষ্ঠ সংসদ (১৫ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে এ আসনে খালেদা জিয়ার ভাগিনা শাহরিন ইসলাম তুহিন এমপি হলেও আর কখনোই নির্বাচিত হতে পারেননি তিনি। সপ্তম, অষ্টম সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও হেরে যান তিনি। তবে দলকে সংগঠিত করা ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। ডিমলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক রইসুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের নেতিবাচক কর্মকা-ের জন্য মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে। গণতান্ত্রিক পরিবেশে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে এবং মানুষ ভোট দিতে পারলে ধানের শীষ প্রার্থীর জয় হবে আসনটিতে।’

তবে এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন প্রয়াত মশিউর রহমান যাদু মিয়ার দৌহিত্র এবং প্রয়াত শফিকুল গণি স্বপনের ছেলে জেবেল রহমান গণি। তিনি বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান এবং ২০ দলীয় জোটের শরিক। গানি বলেন, এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি আমি। জোটগতভাবে মনোনয়ন চাইব। এটা আমার প্রাপ্য। ডোমার-ডিমলা স্মৃতিবিজরিত এলাকায় ঐতিহ্য রয়েছে আমার ও পরিবারের। এলাকার মানুষদের নিয়ে রাজনীতি করছি তখন থেকে। মনোনয়ন পেলে এলাকার মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে এ বিশ্বাস রয়েছে আমার।’

তবে ২০ দলীয় জোটের শরিক হলেও এ আসনে নিজের প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। ডিমলা উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির ও বর্তমান জেলা সেক্রেটারি মাওলানা আবদুস সাত্তার নিজেকে প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে পোস্টারিং করেছেন নির্বাচনী এলাকায়।

প্রতিদিনের সংবাদকে মাওলানা সাত্তার বলেন, এ আসনে জামায়াতের অনেক ভোট রয়েছে। গেল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীকে কী পরিমাণ ভোট দিয়েছে মানুষ, দলের জনপ্রিয়তা সেটাই প্রমাণ করে। সরকার জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর অন্যায়ভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে আসছে এখনো। এর ফলে আরো ভোট বেড়েছে আমাদের। তা ছাড়া জামায়াত শক্তিশালী হয়েছে আরো বেশি।’ তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়ার ভাগিনা শাহরিন ইসলাম তুহিন না থাকায় এবার জোটগতভাবে জামায়াত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে—এটা আমরা মনে করি।’

এ আসনে অন্য দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেলা কমিটির সম্পাদক আসাদুজ্জামান লাকু, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসন) ডিমলা উপজেলা সভাপতি দিলিপ কুমার রায়, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির উপদেষ্টা সাইফুল ইসলাম দলীয় প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন নির্বাচনী এলাকায়।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ আসনে ভোটকেন্দ্র ১৩৭টি আর ভোটকক্ষের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫৮টি। জেলা নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, অষ্টম সংসদে আওয়ামী লীগের ড. হামিদা বানু শোভা, সপ্তম সংসদে জাতীয় পার্টির এন কে আলম চৌধুরী এবং ষষ্ঠ সংসদে বিএনপির শাহরিন ইসলাম তুহিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

পিডিএসও/তাজ