নোয়াখালী-৬

আ.লীগের আস্থা রাতুল, বিএনপিতে নিষ্ক্রিয়তা

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ১০:৪৬

জুয়েল রানা লিটন, নোয়াখালী

বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হলেও নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় এখনই নির্বাচনের উত্তেজনা। একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-৬ আসন।

নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য (এমপি) আয়েশা ফেরদৌস ছাড়াও আছেন তিনজন। তারা হচ্ছেন—সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শিল্পপতি মাহামুদ আলী রাতুল, জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম আমির। এর মধ্যে এমপি আয়েশা ফেরদাউস সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী। জনমনে প্রচলিত আছে এমপি মূলত মোহাম্মদ আলীর নির্দেশেই সবকিছু পরিচালনা করেন।

এদিকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে সাবেক এমপি প্রকৌশলী ফজলে আজিমকেই বিবেচনায় আছে সবার। তিনি ছাড়াও বিএনপির আরো সম্ভাব্য দুই মনোনয়নপ্রত্যাশীর নাম আলোচনায় রয়েছে। একজন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলা উদ্দীন, অন্যজন সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন। তারা দুজনেই দীর্ঘদিন ধরে হাতিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। স্থানীয় নির্বাচনী ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির টিকিটে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের এমপি হন মোহাম্মদ আলী। পরের নির্বাচনে তাকে পরাজিত করে ১৯৯১ সালে এমপি আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি অধ্যাপক ওয়ালী উল্যা। ১৯৯৬ সালেও পরাজিত হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী। তবে তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহামুদুর রহমান বেলায়েতের হাত ধরে আওয়ামী লীগের যোগ দেন মোহাম্মদ আলী। ২০০১ সালের নির্বাচনে মোহাম্মদ আলী নৌকার টিকিট না পেয়ে স্বতন্ত্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। ২০০৮ সালে তিনি ফের নৌকার টিকিট পান; কিন্তু ঋণখেলাপির কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। এ সময় তার স্ত্রী আয়েশা আলী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন পরাজিত হন। তবে ২০১৪ সালে প্রতিপক্ষ কেউ অংশ না নেওয়ায় দলের টিকিট নিয়ে এমপি হন মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী আয়েশা ফেরদৌস।

নোয়াখালী-৬ আসনে আওয়ামী লীগ কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক ওয়ালী উল্যা। আর অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী। এমন কি ইউনিয়ন নির্বাচনে তারা পাল্টাপাল্টি প্রার্থী দিয়ে থাকেন। এই দুই গ্রুপের মধ্যে দলীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও বন্দুকযুদ্ধে গত এক বছরে সাত-আটজন নেতাকর্মী নিহত ও পাঁচ শতাধিক আহত হন। কৌশল হিসেবে জলদস্যু ও বনদস্যু পোষা, দলীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মাল দিয়ে জেলে পাঠানোর নজির আছে। ফলে এ আসনে আ.লীগের প্রতিপক্ষ নিজেই।

নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী : বর্তমান সংসদ সদস্য আয়েশা ফেরদাউস ছাড়া আরো তিনজন। তারা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মাদ আলী, জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম আমির, ব্যবসায়ী মাহমুদ আলী রাতুল। রাতুল গত বছরের আগস্টে হাতিয়া আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি আয়েশা ফেরদাউস, সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী। জনমনে প্রচলিত রয়েছে যে তিনি মূলত মোহাম্মদ আলীর নির্দেশেই সবকিছু পরিচালনা করেন।

বর্তমান এমপি আয়েশা ফেরদাউস অভিযোগ করে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আমি নৌকার মনোনয়ন পেলেও দলের একটি অংশ তার প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে। তারপরও নির্বাচিত হয়ে গত পাঁচ বছরে এলাকার রাস্তাঘাট, কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভবন, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ অনেক উন্নয়ন করেছি।’ এবার মনোনয়ন পেলে আগামী নির্বাচনেও জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী বলে মন্তব্য করেন।

জানতে চাইলে সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী জানান, এর আগে দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন করে তিনবার হাতিয়ার এমপি হয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার নেতৃত্বে হাতিয়ার মানুষ ঐক্যবদ্ধ। মনোনয়ন পেলে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’

হাতিয়াতে ব্যক্তি রাজনীতির প্রভাব থাকলেও এবারে সাধারণ মানুষ এমন একজনকে চাইবে যার মাধ্যমে বাস্তবিক অর্থেই হাতিয়ার উন্নতি সাধিত হবে বলে ভোটারদের মন্তব্য। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম আমির। অপেক্ষাকৃত তরুণ ও ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হিসেবে তিনি আলোচনায় আছেন। ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা আমিরুল ইসলাম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘গত সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ২ ঘণ্টার ভোটে আমি প্রায় ৪০ হাজার ভোট পাই। পরে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই। আমি ছাত্র রাজনীতি থেকেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আন্দোলন-সংগ্রামে সব সময় রাজপথে ছিলাম। এখন তিনি যদি আমাকে মনোনয়ন দেন তাহলে বিজয় চিনিয়ে আনব ইনশাআল্লাহ।’ তবে দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই কাজ করবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে হাতিয়ায় প্রচারণায় এগিয়ে আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শিল্পপতি মাহমুদ আলী রাতুল। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মোস্তফা আলী দুলালের ছোট ভাই রাতুল ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিল্পপতি হওয়ার পর দেড় যুগ ধরে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলসহ সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুদান সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। হাতিয়া জনকল্যাণ সমিতির মাধ্যমে সেবামূলক কাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানবিহীন বয়ার ও নলেরচরে জনকল্যাণ শিক্ষা ট্রাস্ট হাইস্কুল ও হাতিয়া জনকল্যাণ আদর্শ শিক্ষা ট্রাস্ট হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান, হাতিয়া কমিউনিটি কলেজের অর্থায়ন, বিনামূল্যে চক্ষুশিবির ও অপারেশন, অটিস্টিক আক্রান্ত বয়স্কদের ভোকেশনাল ট্রেনিং ও চাকরির সংস্থানকারী সংগঠন পিএফডিএ সহায়তা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা দান, নিজের জেএমএস গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানায় দ্বীপের অনেক যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগসহ বিভিন্ন সময় আপদকালীন দান সহায়তার জন্য দ্বীপবাসীর প্রিয়পাত্র মাহমুদ আলী রাতুল। দলীয় সহিংসতা মুক্তিকাঙ্ক্ষী দ্বীপবাসীর কাছে ক্লিন ইমেজ আর বিপদে ভরসাস্থল হিসেবে তার গ্রহণযোগ্য অনেক। ফলে নির্বাচনী প্রচারে দ্বীপের সর্বস্তরের মানুষের সম্পৃক্ততাও চোখে পড়ার মতো।

মাহমুদ আলী রাতুল বলেন, ‘হাতিয়া আমরা জন্মস্থান। দ্বীপের সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নানাভাবে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার। তাদের মুক্তি ও দ্বীপের মানুষের উন্নয়নের জন্যই রাজনীতির মাঠে রয়েছি।’

হাতিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. ওয়ালী উল্যাহ বলেন, ‘মাহমুদ আলী একজন স্বচ্ছ রাজনীতিক। তিনি শহীদ পরিবারের সন্তান। তার নেতৃত্বে উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সাধারণ মানুষ সুসংগঠিত। তিনি মনোনয়ন পেলে এই আসনটি আমরা আওয়ামী লীগকে উপহার দিতে পারব।’

আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির কোনো তৎপরতা নেই এই আসনে। এক-এগারোর সময় দলে সংস্কারপন্থীদের পক্ষ নেওয়ায় ২০০৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি বিএনপির সাবেক এমপি প্রকৌশলী ফজলুল আজিমকে। আগামী নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হবেন বলে শোনা যাচ্ছে। যদিও তিনি বিগত কয়েক বছর ধরেই দলে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। প্রতিদিনের সংবাদকে ফজলুল আজিম জানান, তিনি আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। তবে কোনো দলের থেকে হবেন কিনা এখনো নিশ্চিত নন।

আগামীকাল থাকছে গাইবান্ধা-৪ আসনের খবর

পিডিএসও/হেলাল