টাঙ্গাইল-১

আ.লীগ-বিএনপিতে হাড্ডহাড্ডি, বিদ্রোহী ও বহু প্রার্থীতে ভয়

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০১৮, ১১:১৯

আকবর হোসেন, মধুপুর (টাঙ্গাইল)

নেতৃত্বের সমীকরণে টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনকে জেলার গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবেই মনে করেন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম সংসদ নির্বাচনেই এই আসন হাতছাড়া হয়ে যায় আওয়ামী লীগের। তারপর থেকেই সব নির্বাচনে আসনটির দিকে বিশেষ নজর থাকে সবার। সংসদীয় রাজনীতির প্রথমদিকে আসনটি বিএনপির দখলে থাকলেও দলীয় কোন্দল ও একক কোনো প্রার্থী না থাকায় পরবর্তীতে তা আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে টাঙ্গাইল-১ আসনে দলীয় প্রতীক পেতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অন্যান্য দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। তাই এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করলেও মধুপুরের এ আসন তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। তখন নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাবু মহেন্দ্র লাল বর্মণকে প্রায় ৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন মশাল প্রতীকের জাসদ নেতা আবদুস সাত্তার। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাজী আসাদুজ্জামান এবং তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি না আসায় ডা. নিজামুল ইসলাম নৌকা প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হন।

চতুর্থ সংসদ নির্বাচন বিপুল ভোটে বিজয়ী হন স্বতন্ত্র প্রার্থী খন্দকার আনোয়ারুল হক। পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধনবাড়ীর নওয়াব সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরীর মেয়ে আশিকা আকবরকে মাত্র ২ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাইদ চৌধুরীর ছেলে আওয়ামী লীগের আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার। আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার প্রথম এমপি নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ নির্বাচনে বিএনপির ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদার এমপি নির্বাচিত হলেও একই বছরের ১২ জুনের সপ্তম নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার প্রায় ১১ হাজার ভোটের ব্যবধানে তাকে পরাজিত করেন। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর আন্দোলনের তোপের মুখে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী মধুপুর ছাড়লে ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে দুই দলেই নতুন মুখের আবির্ভাব ঘটে। তবে ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের মৃত্যুর পর হেভিওয়েট প্রার্থী না থাকায় এ আসনে বিএনপির বলিষ্ঠ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান শিল্পপতি ফকির মাহবুব আনাম স্বপন।

এ সময় বিএনপির দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সুবিধা কাজ লাগিয়ে প্রথমবারের মতো এমনি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা কৃষিবিদ ড. আবদুর রাজ্জাক। তবে ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে ড. আবদুর রাজ্জাক প্রায় ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির ফকির মাহবুব আনাম স্বপনকে পরাজিত করেন। সর্বশেষ দশম সংসদ নির্বাচনে ড. আবদুর রাজ্জাক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

অষ্টম সংসদ নির্বাচনের স্মৃতি মনে করে স্থানীয়রা জানান, শিল্পপতি ফকির মাহবুব আনাম স্বপনের বিপরীতে তৎকালীন বিএনপি নেতা অধ্যাপক আবদুল গফুর মন্টু দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। এতে অর্ধ লক্ষাধিক ভোটে নির্বাচিত প্রথমবারের মতো এমপি হন ড. রাজ্জাক। নির্বাচনে নৌকা প্রতীক ৯৮,৪১৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন হলেও ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ আবদুল গফুর মন্টু ৫৩,৫৩৯ ভোট পেয়েছিলেন। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে দলীয় কোন্দল সৃষ্টি ও বিদ্রোহী প্রার্থী না হলে বিএনপির বিজয় অবিসম্ভাব্য ছিল বলে মনে করেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। একাদশ সংসদ নির্বাচন ঠিক তেমনটি ঘটতে পারে বলেন আশঙ্কা করছেন তৃণমূলের রাজনীতিকরা।

‘মধুপুর-ধনবাড়ী থেকে ড. আবদুর রাজ্জাক একক প্রার্থী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন ধনবাড়ীর পৌর মেয়র মঞ্জুরুল ইসলাম তপন, মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাবেক চেয়ারম্যান মো. ইয়াকুব আলী। তবে তার বোন আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপাও দলের মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী শামসুন্নাহার চাঁপা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচন করব।’

শামসুন্নাহার চাঁপা ছাড়াও ধনবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সম্পাদক ও একাধিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াদুদ তালুকদার সবুজ দলের মনোনয়ন চাইতে পারেন। তিনি বলেন, ‘মধুপুর-ধনবাড়ীতে আমার প্রচুর অবদান রয়েছে। আমাকে এ আসনে মনোনয়ন দিলে আমি জয়ী হতে পারব।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফকির মাহবুব আনাম স্বপন এমপি নির্বাচিত না হয়েও নির্বাচনী এলাকায় ব্যক্তিগত অর্থ খরচ করে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। নিজের দল ক্ষমতায় না থাকা ও রাজনৈতিক ‘বিরূপ পরিবেশের’ কারণে মাঠে যথেষ্ট নির্বাচনী কাজ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি বলে দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনের বিভিন্ন তথ্যসূত্র মতে, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায়ও ফকির মাহবুব আনাম স্বপনের নাম রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক এমপি খন্দকার আনোয়ারুল হক (আনোয়ার), মধুপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সম্পাদক সরকার সহিদুল ইসলাম সহিদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী বিএনপির মনোনয়ন চাইতে পারেন।

‘মধুপুরে একমাত্র ফকির মাহবুব আনাম স্বপনই দলের মনোনয়ন পাবেন’ উল্লেখ করে জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও মধুপুর উপজেলা সভাপতি জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘বিএনপির মতো বড় দলে সবাই মনোনয়ন চাইতে পারে। দলে কিছু কোন্দল থাকলেও পরিশেষে দল যাকে মনোনয়ন দেবে দলের স্বার্থে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার নির্বাচন করতে হবে।’ প্রায় একই কথা বলেন ধনবাড়ীর পৌর বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক মেয়র এস এম সোবহান, মধুপুর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক এম রতন হায়দার, পৌর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি খুররুম খান ইউসুফজাই প্রিন্সসহ কয়েকজন নেতা।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা এবং মধুপুর পৌর বিএনপির উপদেষ্টা সাবেক এমপি খন্দকার আনোয়ারুল হক (আনোয়ার) দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। খন্দকার আনোয়ার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘১৯৮৮ সালে এমপি থাকাকালীন সময়ে মধুপুর-ধনবাড়ীবাসীর জন্য বহু উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। স্কুল-কলেজ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারীকরণের দাবিতে ১৯৯০ সালে আমিই সর্বপ্রথম সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করি।’ তাকে মনোনয়ন দিলে বিজয় নিশ্চিত তিনি দাবি করেন।

বিএনপির আরেক প্রার্থী সরকার সহিদুল ইসলাম সহিদ বলেন, ‘বিগত জাতীয় নির্বাচনে যারা এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একমাত্র আবদুস সাত্তারই স্থানীয় এমপি ছিলেন, বাকী সবাই ছিল বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত। স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচন করব এবং বিজয়ী হতে পারব ইনশাআল্লাহ।’ অপর প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘টাঙ্গাইলের বিভিন্ন দলীয় রাজনৈতিক মামলা পরিচালনাসহ মধুপুর এবং ধনবাড়ীতে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল আমাকে মনোনয়ন দিলে বিএপির হারানো আসনকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে পারব।’

এদিকে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেতে জোরালোভাবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন জাতীয় পার্টির মধুপুর উপজেলা সভাপতি এম এ হান্নান (ইস্পাহানি)। প্রতিদিনের সংবাদকে ইস্পাহানি বলেন, ‘জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে মধুপুর তৃণমূল পর্যায়ে জাতীয় পার্টিকে সুসংগঠিত করা হয়েছে। আমাকে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে মনোনয়ন দিলে জাতীয় পার্টিকে ভালো একটি আসন উপহার দিতে পারব ইনশাআল্লাহ।’ তার বক্তব্যের পক্ষে মন্তব্য করেন জাতীয় পার্টির উপজেলা সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম।

এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মধুপুর উপজেলা শাখার সভাপতি মাও. মো. আশরাফ আলী দলের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন। এ আসনে মধুপুর উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৩ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭ হাজার ৬৬১ জন আর মহিলা ভোটার ১ লাখ ৮ হাজার ১৯২ জন। ধনবাড়ী উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৬৫ জন। মধুপুর-ধনবাড়ী এ দুই উপজেলা মিলে এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬০৮ জন।

পিডিএসও/তাজ