আওয়ামী লীগে কোন্দল, বিএনপির আস্থা রিয়াজ

সুযোগ নেবে গণতন্ত্রী পার্টি, সিপিবিতে ছাত্রনেতা

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:০৯

সফিকুল আলম সবুজ, কাপাসিয়া (গাজীপুর)

বহুদলের প্রার্থীর অংশগ্রহণে আভাস পাওয়া যাচ্ছে গাজীপুরের-৪ (কাপাসিয়া) আসনে। স্থানীয় রাজনীতি বরাবরই মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের পরিবারের প্রভাব স্পষ্ট। তারপরও বিভিন্ন সময় বিএনপি, সিপিবি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীও নির্বাচিত হয়েছেন এই আসন থেকে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের ভেতরের অন্তঃকলহকে কাজে লাগাতে চায় গণতন্ত্রী পার্টি। বিএনপি প্রার্থী আসতে পারে পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে। এদিকে সিপিবি বেছে নিয়েছে আলোচিত ‘আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের’ নেতাকে।

নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ, লভিং শুরু করেছেন মনোনয়ন পাওয়ার যুদ্ধে। প্রার্থীরা দলীয় টিকিট পাওয়ার জন্য তৃণমূলে নেতাকর্মীদের নিয়ে গ্রুপিং শোডাউন করছেন।

কাপাসিয়া আওয়ামী রাজনীতিতে ছোট ভাইয়ের ছেড়ে যাওয়া আসনে বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে আছেন তাজউদ্দীনের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি। এবারো শোনা যাচ্ছে তার নাম। পাশাপাশি তাজউদ্দীন আহমদের ভাগিনা ও কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ উপদেষ্টাম-লীর সদস্য আলম আহমদও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। এ ছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন ১৪ দলের গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার। তবে স্থানীয় রাজনীতিতে অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গেছে আওয়ামী লীগ। দলের একটি অংশ চাচ্ছে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ নির্বাচনে অংশ নিলে কোন্দল অনেকটা নিরসন হবে। অন্যদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক মন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ্র ছেলে শাহ্ রিয়াজুল হান্নান। রিয়াজের ওপর আস্থা ও সমর্থক রয়েছে স্থানীয় বিএনপির।

বামপন্থিদের নির্বাচনী ঐক্য বাম গণতান্ত্রিক জোট থেকে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত না হলেও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ২০০৭ সালের আলোচিত ‘আগস্ট ছাত্র আন্দোলেনের’ নেতা মানবেন্দ্র দেবকে মনোনয়ন দেবেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া মাঠে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মো. নুরুল ইসলাম সরকার। আর নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ এস এম ছানাউল্লাহ স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন—এমনটি আলোচনা রয়েছে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত গাজীপুর-৪ আসন। নির্বাচন কমিশন তথ্য মতে এখানে মোট ভোটার ২ লাখ ৬৭ হাজার ১৮৭ জন।

স্বাধীনতা-পরবর্তী দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ডা. ছানাউল্লাহ, পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং দলবিহীন ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ্ নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ ছাড়া তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঐক্যজোটের সিপিবি প্রার্থী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ওবায়েদ উল্লাহ নির্বাচিত হয়েছিলেন। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে এখন পর্যন্ত কোনো হেভিওয়েট প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে না।

বর্তমান এমপি সিমিন হোসেন রিমি নিয়মিত সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন। তিনি সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। যোগাযোগের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা করছেন তার সমর্থকরা। সিমিন হোসেন রিমি বলেন, আমার বিশ্বাস দল আমাকে মনোনয়ন দেবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় সভাপতি আলহাজ মোতাহার হোসেন মোল্লাকে নিয়ে কৃষক লীগের ব্যানারে প্রচার-প্রচারণা করছেন আলম আহমদ। সপ্তাহে দু-এক দিন হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে এসে রাজনৈতিক সভা, গণসংযোগ ও সেবামূলক কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। আলম আহমেদ বলেন, ‘আমি মাদক, জঙ্গিবাদ ও জিন্দাবাদীদের বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের মেসেজ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছি।’ ‘প্রতিপক্ষের বাধা’ দানের অভিযোগ করেন তিনি বলেন, মনোনয়ন পেলে বিজয় অর্জন করতে পারব বলে শতভাগ আশাবাদী।

কাপাসিয়া আওয়ামী লীগে প্রকাশ্যে কোন্দল রয়েছে। এর সুযোগ নিতে চাইছেন গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. শহীদুল্লা সিকদার। এ এলাকায় প্রতি সপ্তাহে একদিন বিনামূল্যে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রী পার্টি ১৪ দলের একটি শরিক দল। জোটের পক্ষ থেকে শরিক দলকে মনোনয়ন দেওয়া হলে আমি নির্বাচন করব।’ গণসংযোগ, পোস্টার, ব্যানার ও বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রার্থিতা এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহ্র মৃত্যুর পর গাজীপুর-৪ আসনে বিএনপি অনেকটা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন হামলা-মামলায় পড়ে পলাতক। ফলে দলীয় কর্মকা-ে তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে গত ১ সেপ্টেম্বর এ আসনের বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী শাহ্ রিয়াজুল হান্নান রিয়াজকে গ্রেফতার করেন গাজীপুর ডিবি পুলিশ। প্রায় দেড় মাস কারাভোগের পর ১০ অক্টোবর জামিনে এসে এখন অনেকটা সময় ঢাকায় কাটাচ্ছেন। তার নেতৃত্বেই কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন বলে জানা গেছে।

শাহ্ রিয়াজুল হান্নান জানান, ‘মরহুম পিতা হান্নান শাহ্র নেতৃত্বে কাপাসিয়া বিএনপি দলবদ্ধ ছিল, এখনো আছে। আমি নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি দলকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে।’ আগামী নির্বাচনে হান্নান শাহ্র উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে শাহ্ রিয়াজকে একক প্রার্থী বলে মনে করছেন স্থানীয় বিএনপি।

অন্যদিকে সোহেল তাজের পদত্যাগের পর উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন সিপিবি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ বাদল। এবার নির্বাচনে পার্টির পক্ষ থেকে আলোচিত সাবেক ছাত্রনেতা ও কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মানবেন্দ্র দেব এই আসনের প্রার্থী হবেন বলে জানান। তার পক্ষ থেকে পার্টির কমরেডরা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় মাঠে রয়েছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ আছে উল্লেখ করে মানবেন্দ্র দেব বলেন, ‘দুর্নীতি, মাদক, পেশি ক্ষতির বিরুদ্ধে লড়াই করছি আমরা। জবাবদিহিতা, মানমর্যাদা আর প্রকৃত গণতন্ত্রের মডেল হবে কাপাসিয়া। এর মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব।’

জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ এস এম ছানাউল্লাহ জানান, ‘জামায়াতে ইসলামী দলের নিবন্ধন বাতিল বিষয়টি আদালতের দ্বারস্ত রয়েছে। এ অবস্থায় সংসদ নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করা যাচ্ছে না। দলীয় সিদ্ধান্ত পেলে স্বতন্ত্র প্রতীকে নির্বাচন করব।’

দলীয় নেতাকর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ব্যানার ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কাপাসিয়া উপজেলা শাখা নেতা মো. নুরুল ইসলাম সরকার। নির্বাচনে ইতোমধ্যে দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানিয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আল্লাহ ও রাসুলের সংবিধান বাস্তবায়নে পীর চরমোনাই মাওলানা মুফতি সৈয়দ মো. রেজাউল করিম দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আর অন্য রাজনীতিবিদরা দুনিয়াবি সংবিধান ও দলীয় নেতাকে অনুসরণ করছেন, যা কাম্য নয়।’

নব্বই-পরবর্তী কাপাসিয়ার নির্বাচনী ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের সহধর্মিণী জোহুরা তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপি প্রার্থী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ্ নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলবিহীন ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে আবার বিএনপি থেকে আ স ম হান্নান শাহ্ নির্বাচিত হন। তবে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের ছোট ভাই অ্যাডভোকেট আফছার উদ্দিন আহমেদ হান্নান শাহ্কে পরাজিত করেন। ২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে সোহেল তাজ হান্নান শাহ্কে পরাজিত করেন। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে জামালউদ্দিন আহম্মেদকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও, পরে অর্থনীতিবিদ এম এ আবদুল মজিদকে চূড়ান্ত ঘোষণা করা হয়। এ নির্বাচনেও সোহেল তাজ বিজয় অর্জন করেন। ‘অজ্ঞাত’ কারণে সোহেল তাজ প্রথমে মন্ত্রী ও পরে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করলে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সিমিন হোসেন রিমি তার আপন চাচা আফছার উদ্দিন আহমদের (স্বতন্ত্র প্রার্থী) সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এমপি হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আনোয়ার হোসেনকে হারিয়ে আবারো নির্বাচিত হন সিমিন হোসেন রিমি।

পিডিএসও/হেলাল