বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে উৎকণ্ঠা

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৭, ১০:১৩

হাসান শান্তনু

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারের নতুন শর্ত ও নীতিমালায় ভর্তি নিয়ে শঙ্কিত এ বছর উচ্চমাধ্যমিকে কৃতকার্য শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশির ভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক চাপ নিয়েই ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে শিক্ষার্থীদের। মেডিক্যাল কলেজে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দিলে পাঁচ নম্বর কাটা যাবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তে এখানেও ভর্তি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এমনকি শেষ ভরসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়েও উদ্বেগের মধ্যে আছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। কারণ, ইতোমধ্যেই বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। মামলা-মোকদ্দমা ও মালিকানার দ্বন্দ্ব, অনিয়ম ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইউজিসি ৪৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ‘বুঝেশুনে’ সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে। ইউজিসি বলেছে, এসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পদ্ধতির মান উন্নত করতে পারেনি। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

এ অবস্থায় এ বছর অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করেও যেমন কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে না; তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোও মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে বঞ্চিত হবে। এমন অবস্থা উচ্চশিক্ষার জন্য অন্তরায় বলেও মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, এতে ভবিষ্যতে শিক্ষা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনাগ্রহে এবারও চালু হচ্ছে না সমন্বিত ভর্তি পদ্ধতি। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আগ্রহ প্রকাশ করলেও উপাচার্যরা একমত হতে পারেননি। ফলে অন্য বছরের মতো এবারও ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের দৌড়ঝাঁপ করতে হবে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। হয়রানির শিকার হতে হবে। এমনকি একই জেলায় পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে একাধিকবার যেতে হবে শিক্ষার্থীদের। পাশাপাশি রয়েছে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের উদ্বেগ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ বছর যে পরিমাণ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছে, সে অনুপাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল, ডেন্টাল ও মেরিন একাডেমি মিলে মোট আসন ৫২ হাজার। অথচ এ বছর কেবল জিপিএ-৫-ই পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৯৬৯ জন। এর সঙ্গে যুক্ত হবেন গতবছর ভর্তি হতে না পারা জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৫৮ হাজার ২৭৬ জন। সেই সঙ্গে রয়েছেন সাধারণ কৃতকার্য শিক্ষার্থীরা। ফলে ভালো ফল করেও ভর্তির নিশ্চয়তা নেই পছন্দের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গত ছয় বছরের ভর্তি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিভিন্ন ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮০-৮৫ শতাংশই ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছেন। এসব শিক্ষার্থী ন্যূনতম পাস নম্বরও (যেমন ১২০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় ৪৮ নম্বর) পাননি। এ পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে রয়েছে হতাশা। শহরের শিক্ষার্থীরা

টাকা খরচ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও গ্রামের শিক্ষার্থীদের অনেকেরই শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটছে উচ্চমাধ্যমিকের পরপরই। অথবা স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে ভর্তি হতে হচ্ছে। নামমাত্র পড়ালেখা করছেন তারা।

এ অবস্থায় শিক্ষা পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা গবেষকরা। তারা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতিগত জটিলতা, সমন্বয়হীনতার অভাব, কোচিং ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য, মফস্বল ও শহরের সুযোগ-সুবিধার তারতম্য আর প্রশ্নপদ্ধতি প্রণয়নে উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাসকে কম গুরুত্ব দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের নানামুখী ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। তার ওপর ভর্তি পরীক্ষায় নতুন নতুন শর্ত আরোপ এ চাপ আরো বিপাকে ফেলছে শিক্ষার্থীদের। আর এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে কোচিং-বাণিজ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। শিক্ষা হতে হবে আনন্দের সঙ্গে। অবশ্যই প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রশ্ন প্রণয়ন করতে হবে। উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী সবারই সাধারণ জ্ঞান থাকা উচিত। যেকোনোভাবেই হোক প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে হবে।

সমন্বিত ভর্তি পদ্ধতির বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, রাষ্ট্রপতির অভিপ্রায়ের অর্থ নির্দেশনা। এরপরও সমন্বিত ভর্তি পদ্ধতি হয়নি। নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এরপর আর এগোয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বন্ধের পর বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এমন সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে। এর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। নতুন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাতটি সরকারি কলেজেও দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস ও বিডিএস ভর্তি পরীক্ষায় আগের বছরের এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তাদের মোট নম্বর থেকে পাঁচ নম্বর এবং সরকারি কলেজে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৭ দশমিক ৫ নম্বর কেটে মেধা তালিকা তৈরি করা হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে বিডিএস’র কোর্স পাঁচ বছর মেয়াদি হবে। গত জুন মাসে সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আসন্ন ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সে ভর্তি-সংক্রান্ত সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

ইউজিসির তথ্যমতে, এ বছর ৪৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ‘বুঝেশুনে’ সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে ইউজিসি কর্তৃপক্ষ। এগুলোর মধ্যে ১৮টিতেই ভর্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে। তারপরও এসব ঝামেলাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কোনো শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে এর দায় ইউজিসি নেবে বলে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশে বর্তমানে ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

ইউজিসির যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে, সেগুলো হলো- ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ইউনিভার্সিটি (ইবাইস), আমেরিকা-বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, পিপলস ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটি, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, কুইন্স ইউনিভার্সিটি ও গণবিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নানা ঝামেলার কথা জানিয়েছে ইউজিসি। ইউজিসির সতর্ক তালিকায় আরো রয়েছে—কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, কেরানীগঞ্জের রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়, নারায়ণগঞ্জের রূপায়ণ এ কে এম শামসুজ্জোহা ইউনিভার্সিটি ও আনোয়ার খান মডার্ন ইউনিভার্সিটি। ইউজিসি বলছে, এসব বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পায়নি।

ইউজিসি বলেছে, আদালতের স্থগিতাদেশ, বিচারাধীন, অননুমোদিত ক্যাম্পাস ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজ নিয়ে দ্বন্দ্ব নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে ১৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়াকেই ‘সবচেয়ে ভালো’ বলেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

পিডিএসও/হেলাল