জাবি মেডিক্যাল সেন্টার নানা সংকটে বেহাল

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৭, ১৩:২৭

তহিদুল ইসলাম, জাবি

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে অধ্যয়ন করছে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থী। আরো আছে প্রায় দেড় সহস্রাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। সেখানে রয়েছে একটি মাত্র মেডিক্যাল সেন্টার। যা এত মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য মোটেই যথেষ্ট নয়। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। সেখানে নেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো, কক্ষের অভাব রয়েছে। সেই সঙ্গে চিকিৎসক-নার্স সংকট, পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়া, এ্যাম্বুলেন্স সংকটসহ নানামুখী সমস্যায় ভুগছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মেডিক্যাল সেন্টারটি। এতে মেডিক্যাল সেন্টারের চিকিৎসা সেবা নিতে আসা শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারে মাত্র নয়জন চিকিৎসক রয়েছেন। এর মধ্যে একজন ছুটিতে আছেন। রাতে ও ছুটির দিনে খণ্ডকালীন চিকিৎসক থাকেন আরো কম। ফলে চিকিৎসক সংকটের কারণে অনেক সময় চিকিৎসা সেবা না নিয়েই রোগীকে ফিরে যেতে হয়। তাছাড়া অনেক চিকিৎসককে সময়মতো পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নার্সের সংখ্যাও পর্যাপ্ত নয়। চারজন স্থায়ী নার্স রয়েছেন। মজুরির ভিত্তিতে একজন অস্থায়ী নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জনবল সংকটে এক শিফটে একজন নার্স দায়িত্ব পালন করেন। মেডিক্যাল থেকে মাত্র কয়েক প্রকারের ওষুধ দেওয়া হয়। অধিকাংশ ওষুধই বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়। প্রায় ৩০ ধরনের ওষুধ সরবারহ করা হয় বলে জানান মেডিক্যাল সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মেডিক্যাল অফিসার ডা. মোজেজা জহুরা। মেডিক্যালের প্যাথলজি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এই মেডিক্যাল সেন্টারে প্যাথলজি পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্র নেই। যেগুলো আছে সেগুলো আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতির অভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময় মেডিক্যাল সার্টিফিকেট বাবদ ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়। এই টাকা দিয়ে অটোমেটিক হেমাটোলজি সেলকাউন্টার ও এনালাইজার ক্রয় করা হয়েছে। তবে রিয়াজেন্টের অভাবে যন্ত্র দুটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। রিয়াজেন্ট ক্রয়ের জন্য সাড়ে ১২ লাখ টাকার দরকার। কিন্তু এই অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় অচল পড়ে রয়েছে যন্ত্র দুটি। তাছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ চালাতে প্রশাসনের কাছে কম্পিউটার ও প্রিন্টার আবেদন করেও তা পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট কে এম নাজমুল হাসান ও নাইমুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থ পেলে অটোমেটিক হেমাটোলজি সেলকাউন্টার ও বায়োক্যামেস্ট্রি এনালাইজার সচল করা সম্ভব হতো। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারের প্যাথলোজি বিভাগে বহু ধরনের রোগ নির্ণয় সম্ভব হতো যেটা বর্তমানে বাইরে থেকে করাতে হয়।

এছাড়া ওষুধ রাখা হচ্ছে স্যাঁতসেতে কক্ষে। মেডিসিন স্টোর রুমটিতে ফাটল ধরেছে। সেখানে এসি নেই। ফলে উপযুক্ত তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায়। এ ছাড়া ইদুরের উপদ্রব রয়েছে। মেডিক্যাল সেন্টারে পর্যাপ্ত ফ্যান ও স্যালাইন স্ট্যান নেই। এ ছাড়া জরুরি ওষুধ সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজের অভাব রয়েছে। তবে কয়েক বছর ধরে প্রশাসনকে তাগাদা দিয়েও এসব পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার (ফার্মাসিউটিক্যাল) মো. ওয়ালিউল্লাহ। তিনি বলেন, মেডিসিন স্টোর রুম সপ্তাহে দুই দিন বন্ধ থাকে। এতে মেডিসিন স্টোর থেকে ওই দুই দিনের ওষুধ আগেই দিয়ে দেওয়া হয়। এসব ওষুধ অন্যত্র রাখতে হয়। ভ্যাকসিন সংরক্ষণের জন্য তারা বরফ দিয়ে যায়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর বরফ গলে যায়। তখন স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে ভ্যাকসিন রাখতে হয়। কিন্তু ভ্যাকসিন ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। এতে ভ্যাকসিনের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য ইমার্জেন্সি বিভাগে জরুরি ভিত্তিতে একটি ফ্রিজ প্রয়োজন।

এদিকে, মেডিক্যাল সেন্টারে বহিরাগত রোগী দেখা নিষেধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। বহিরাগত অনেকই চিকিৎসা নিতে আসেন। এমনকি তাদেরও মেডিক্যাল থেকে ওষুধ দেওয়া হয় বলেও জানান মেডিক্যালের এক কর্মচারী। তবে অনেকটা বাধ্য হয়েই খুব অল্প সংখ্যায় বহিরাগত রোগী দেখা হয় বলে স্বীকার করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান মেডিক্যাল অফিসার ডা. মোজেজা জহুরা। তবে কোনো প্রকার ওষুধ দেওয়া হয় না বলে জানান তিনি।

মেডিক্যাল সেন্টারে তিনটি এ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, তার দু-একটি প্রায় সময়ই বিকল থাকে। অভিযোগ রয়েছে এসব এ্যাম্বুলেন্স শিক্ষকসহ ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যাক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। যে কারণে রোগীরা প্রয়োজনে এ্যাম্বুলেন্স পায় না।

মেডিক্যাল সেন্টারের এই বেহাল দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মুহা. জাহিদ হাসান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা একেবারেই মানসম্মত নয়। মাত্র কয়েক প্রকারের ওষুধ দেওয়া হয়। নাপা ছাড়া যেন কোনো ওষুধই পাওয়া যায় না।’

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান মেডিক্যাল অফিসার ডা. মোজেজা জহুরা বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসক-নার্সের সংকট রয়েছে। এ মুহূর্তে আমাদের আরো চারজন পুরুষ ডাক্তার ও দুইজন মহিলা ডাক্তার প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বার বার চিকিৎসক নিয়োগের তাগিদ দিয়েছি। তবে কোনো লাভ হয়নি। ওষুধের আইটেম কম। তবে এটা বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।’

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা এখান থেকে দেওয়া হয়। বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

পিডিএসও/হেলাল