সাফল্যের গল্পে বেরোবির ৩ মেধাবী

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২০, ১৩:৪৬ | আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২০, ১৭:৩১

ইসমাইল হোসেন রিফাত, বেরোবি

জীবনে সফলতার গল্পের পেছনে থাকে কষ্ট আর পরিশ্রমের ছোট ছোট আরও হাজারো গল্প। কঠিন অধ্যাবসায়ে শিক্ষার্থীরা খুঁজে পায় কাঙ্খিত ফলাফল। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাঙ্গেরি সরকার থেকে পি.এইচ.ডি স্কলারশিপের বৃত্তিপ্রাপ্ত তিন শিক্ষার্থীর সফলতার পিছনের গল্প আর অনুভূতিগুলো তুলে ধরেছেন প্রতিদিনের সংবাদরে কাছে। তিন উজ্জ্বল নক্ষত্রের সফলতার গল্প অনুপ্রেরণা জোগাবে সব বেরোবিয়ানদের।

আরিফা: আরিফা কেমির জন্ম লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলায়। পরিবারে বড় সন্তান তিনি। নিজের পড়াশুনা ছাড়াও টিউশনি আর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে কেটেছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। মার্কেটিং বিভাগে ২য় স্থান অর্জন করে বিবিএ শেষ করেন  এবং এমবিএ তে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তাই স্বাভাবিকভাবে ফলাফল ভালো করাতে ইচ্ছে ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। তবে এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে সহযোগিতার অভাববোধ মনে করেছেন তিনি। কারণ তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম ও ২য় ব্যাচ শিক্ষক হওয়ার সুযোগ ছিলো না।  

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নটুকু ফিকে থেকে যায়। খানিকটা হতাশায় পড়েন তিনি। তবে থেমে যাননি। জব শুরু করেন গ্রামীণফোনের কাস্টমার ম্যানেজার হিসেবে। শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহ থাকায় পরে ঢাকায় একটা স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। স্কুলে জব করার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য পরিক্ষাও দিয়েছেন। ইন্টারভিউ দিয়েছেন বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমন কি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য বাছাই করা হলেও লভিং প্রক্রিয়া কাছে হেরে যেতে হয়েছে। এক্ষেত্রে বেরোবির শিক্ষর্থী বলেই যথাযথ মূল্যায়ন পায়নি বলেও দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। 

সব কিছুই ব্যথিত করে তাকে। তখন নিজের ভিতরে জেদ তৈরি হয় আরিফার। স্বপ্ন দেখেন  দেশের বাহিরে যাওয়ার। সুযোগ পেলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা একটু হলেও উজ্জ্বল করতে পারবেন। জেদ থেকেই স্বপ্ন দেখা। সেই স্বপ্ন থেকেই প্রথমে ২০১৭ সালে চায়না গভমেন্টের স্কলারশিপের সুযোগ পান। চায়না থেকে ২০১৯ সালে এমবিএ শেষ করে দেশে আসেন। কিছু দিনের মধ্যেই চায়নাতেই জবও পেয়েছিলেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে যাওয়া হয়নি আর। এর মধ্যেই ইউরোপের পি এইচ ডির জন্য আবেদন করেন। অবশেষে হাঙ্গেরীতে বিজনেস এন্ড ম্যানেজমেন্টে পিএইচডি করার সুযোগ পান। হাঙ্গেরি সরকার এটি ফাইনালি গ্রহণ করেন। এখানে আবেদন প্রক্রিয়াটি ছিলো একটু দীর্ঘ সময়ের। সাধারণত অন্য দেশ গুলোতে পি.এইচ.ডি এর জন্য প্রপোজাল সুপারভাইজার গ্রহণ করলেই হয়ে যায়। তবে ইউরোপের দেশ গুলোর বিষয়টা একটু ভিন্ন। এখানে অনেকগুলো স্টেপ থাকে। যেমন অনলাইনে এক্সাম, ইন্টারভিউ, বিভিন্ন এনালিটিক্যাল প্রশ্নের দ্বারাই এক্সাম গুলো হয়ে থাকে। সব মিলেই কঠিন প্রক্রিয়াটি যথাযথ সম্পন্ন করেন আরিফা। সম্প্রতি তিনি সুযোগ পেয়েছেন বুদাপেস্ট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এন্ড ইকোনমিক-এ। হতাশার কাছে হেরে যাননি তিনি। অর্জন করেছেন লালিত স্বপ্নটুকু। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুনদের উদ্দেশ্যে জানতে চাইলে আরিফা কেমি বলেন, ‘আসলে এখন দেশের বাহিরে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে আইইএলটিএস করে রাখা উচিত। প্রথমত যে দেশে যাবে সেই দেশে যাওয়ার পুরো ব্যাপারে এনালাইসিস করতে হবে। গবেষণামুখী হতে হবে। এক্ষেত্রে পাবলিকেশনের ব্যাপার থাকে আর জবের অভিজ্ঞতা এগুলো নিজের জন্য বাড়তি ভ্যালু যোগ করে দেয়। তাই যেখানে আবেদন করা হোক না কেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে, সেই দেশের ব্যাপারে  এবং নিজের কাজের ব্যাপারে জানতে হবে। তাহলেই কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হবে’।

শাহজাহান: জয়পুরহাট জেলায় জন্ম শাহজাহান তনয়ের। পড়াশুনার পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে কেটেছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগ থেকে সাফল্যের সাথে স্নাতন এবং স্নাতকোত্তর শেষ করেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ইনিশিয়েটিভস (সিপিআই)। গবেষণার বিকল্প কিছু নেই। তাই গবেষণাবান্ধব পরিবেশ প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবশ্যক মনে করেন তিনি। 

ক্যাম্পাসে ১ম ব্যাচ হওয়ায় সেভাবে গাইডলাইন পাননি কারো। তাই পথ চলা খুব সহজ ছিলো না। সব কিছুই নতুন করে নিজের ভাবতে হয়েছে। ছোট থেকেই গবেষণার প্রতি প্রবল আগ্রহ কাজ করতো তার। স্বপ্নের পথে হাঁটতে চেষ্ঠা করেছেন। বরাবরই হোঁচট খেলেও কিন্তু কখনো থেমে যাননি। দীর্ঘ চিত্ত আর পরিশ্রম সকল সাফল্যের চাবিকাঠি এই প্রত্যয়ে প্রায় ১২ টি পাবলিকেশন প্রকাশ পায় তনয়ের। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা ‘বঙ্গবন্ধু ফ্রেন্ডস অব বেঙ্গল’ নামে বই বের করেছেন তিনি। অবশেষে দীর্ঘ সময়ের লালিত চেষ্ঠায় হাঙ্গেরি সরকারের ‘স্টাইপেন্ডিয়ামে হাঙ্গেরিকাম’ স্কলারশিপের এর অধিনে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন তিনি। আগামী ৪ বছরের জন্যে হাঙ্গেরি সরকারের বৃত্তিতে  পি.এইচ.ডি ফেলোশিপ নিয়ে গবেষনা করবেন তনয়।

আরিফ: কুড়িগ্রাম জেলায় জন্ম মো. মোরশেদুল হাসান আরিফের। ক্যাম্পাসে নানা ধরনের সাংগঠনিক নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে কাজ করেছেন।  ভাল ফলাফল নিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে চায়না সরকারের বৃত্তি নিয়ে আবার ফিন্যান্স বিষয়ে একটি মাস্টার্স ডিগ্রী নানজিং অডিট বিশ্ববিদ্যালয় সম্পন্ন করেন মোরশেদুল হাসান আরিফ।

দেশের মতোই আলো ছড়িয়েছেন বিদেশের মাটিতে। সেখানে মাস্টার্স করে অর্জন করেন সম্মানীয় এওয়ার্ড। তারমধ্যে তরুন গবেষক এবং ভালো ফলাফলের জন্যে পেয়েছেন চীন সরকার কর্তৃক ‘আউস্ট্যানডিং স্টুডেন্ট এওয়ার্ড -২০১৯’। তরুন গবেষক হিসেবে মাস্টার্স পর্যায়েই তার বেশ কিছু গবেষনাপত্র প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের নামকরা কিছু হাই ইমপ্যাক্ট জার্নালে। 

সম্প্রতি তিনি পি.এইচ.ডি ফেলো হিসেবে হাঙ্গেরি সরকারের বৃত্তি পেয়েছেন। আগামী ৪ বছরের জন্যে নামকরা ইউনিভার্সিটি অব ডিব্রেসেন এ পি.এইচ.ডি ফেলোশিপ নিয়ে গবেষনা করবেন তিনি। তার গবেষনার প্রস্তাবিত বিষয়বস্তু ইন্ড্রাস্ট্রিজ ৪.০০। এই সফলতার আদর্শিক বিষয়বস্তু জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি যদি ভালো কিছু করতে চান, আপনাকে অবশ্যই ধৈর্য্য এবং আত্মোৎসর্গের সাথে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মহান আল্লাহ্র ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে যে তিনি’ই সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী। মাতা-পিতা'র দোয়া আপনাকে আপনার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যাবে। এই চলার পথে উত্থান-পতন থাকবেই কিন্তু থেমে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। কারন থেমে যাওয়ার জন্যে তো আপনি স্বপ্ন দেখেননি।

পিডিএসও/এসএম শামীম