বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির পক্ষে সবাই

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:০৩ | আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:১৫

রাহাতুল ইসলাম রাফি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ‘রাজনীতির শিকড়ে’ টান পড়েছে আবার। সামনে এসেছে ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক রাজনীতি থাকা না থাকার প্রশ্নটি। ‘মাথাব্যথা সারাতে মাথাটাই কেটে ফেলা’র মধ্যে সমাধান দেখছে না কোনো ছাত্র সংগঠন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বিএনপির ছাত্রদল ও বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের নেতাদের কেউই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে নয়।

তারা বলেন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ জাতীয় যত অর্জন, তার সবই এসেছে ছাত্রদের হাত ধরে। তাই ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা মানে ছাত্রদের অবদানের প্রতি অসম্মান করা। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য মনে করেন, বাংলাদেশের যত জাতীয় অর্জন, তার সবকিছুই ছাত্রদের হাত ধরে। তাই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কোনো যুক্তি দেখছেন না তিনি। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্জনে ছাত্রলীগসহ ছাত্ররাজনীতির বিরাট ভূমিকা রয়েছে।’

তবে বুয়েটের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে লেখক বলেন, ‘মাথাব্যথার সমাধান কখনো মাথা কেটে ফেলা নয়। আমরা বুয়েট প্রশাসনকে এই সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানাচ্ছি।’

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সুযোগে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো ক্যাম্পাসে তৎপরতা শুরু করবে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন অনেকে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের কারণে বুয়েটে যদি মৌলবাদী-অসাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তবে তা ছাত্রলীগ শক্ত হাতে প্রতিহত করবে।’

বুয়েট পরিচালিত হয় সামরিক শাসক আইয়ুব খানের আমলে প্রণীত আইন ‘দ্য ইস্ট পাকিস্তান ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি অর্ডিন্যান্স’-এর মাধ্যমে। ওই অধ্যাদেশের ১৬ ধারা অনুযায়ী আগ থেকেই বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের কমিটি রয়েছে বুয়েটে। তবে এই অধ্যাদেশের সংশোধন চায় ছাত্রলীগ।

লেখক ভট্টাচার্য এই বিষয়ে বলেন, ‘বুয়েট যে অধ্যাদেশ বলে চলে তা সংশোধনের দাবি জানাচ্ছি। পরে এই বিষয়ে আলোচনা করে আমরা আরো কর্মসূচি নেব।’

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামলও চান না বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হোক। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। এই সিদ্ধান্ত একটি অপচেষ্টা মাত্র।’ ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে না থাকলেও শ্যামলের দাবি, আবরার হত্যার ঘটনায় বুয়েট থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত। তিনি বলেন, ‘আবরার হত্যার যে দায়, তা তো পুরো ছাত্ররাজনীতির নয়; বরং ছাত্রলীগের। এক্ষেত্রে ছাত্ররাজনীতি নয়, বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করাই যৌক্তিক হবে।’

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেল বলেন, বুয়েটে তো আসলে এত দিন ছাত্ররাজনীতি চলে নাই। সেখানে এত দিন চলেছিল প্রশাসন ও ছাত্রলীগের যৌথ স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা। বুয়েট প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটা আমরা মনে করি সঠিক না। যেসব সংগঠন চাঁদাবাজি, খুন এসবের সঙ্গে জড়িত তাদের নিষিদ্ধ করা দরকার ছিল। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে তারা এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকেই সুযোগ করে দিলো, যারা গোপনে রাজনীতি করে। আমরা এই সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য ও অগণতান্ত্রিক হিসেবে বিবেচনা করি। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বুয়েট প্রশাসন হয়ত সামনের দিনে চিন্তা করবে।

বামপন্থি ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘মানুষ কখনোই রাজনীতি বিচ্ছিন্ন নয়। সংবিধান মানুষকে সংগঠিত হওয়ার, রাজনীতি করার অধিকার দিয়েছে। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘটনা মূলত জাতীয় আন্দোলনে ছাত্রদের যে অবদান, সেগুলোর প্রতি অসম্মান করার শামিল।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, আমরা বুয়েট প্রশাসনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করছি। ভবিষ্যতে সেখানে আমাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চলবে। প্রয়োজনে প্রশাসনকে মোকাবিলা করব।

প্রসঙ্গত, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার জেরে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে গত ৬ অক্টোবর রাতে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে রাত ৩টার দিকে দোতলার সিঁড়ির করিডোর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। আর এই হত্যার প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বুয়েট ক্যাম্পাস। দাবি উঠে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েট ক্যাম্পােেস ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে প্রশাসন। তবে শুধু আবরার হত্যাই নয় অতীতে এ রকম আরো ঘটনা বুয়েটে ঘটেছিল। সে সময়েও উত্তাল ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছিল।

পিডিএসও/হেলাল