বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ

দাবি বাস্তবায়নের আগে ভর্তি পরীক্ষা নয়, আন্দোলন চলবে

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ১০:০৫

নিজস্ব প্রতিবেদক

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল বুয়েট প্রশাসন। একই সঙ্গে আবরার হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত ১৯ শিক্ষার্থীকে (আসামি) বুয়েট থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের ছাত্রত্ব স্থায়ীভাবে বাতিল হবে বলেও জানানো হয়। বুয়েটে টানা পাঁচ দিন ধরে ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন চলে আসছিল। ১০ দফার মধ্যে ষষ্ঠ দফায় বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছিল আন্দোলরত শিক্ষার্থীরা।

গতকাল শুক্রবার বিকালে বুয়েটের অডিটোরিয়ামে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে ভিসি ড. সাইফুল ইসলাম ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ঘোষণা দেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ১০ দফা দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন ভিসি। আবরারের জানাজায় নিজের অনুপস্থিতির জন্য ছাত্রদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। সম্প্রতি একই ইস্যুতে বুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধেরও ঘোষণা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। গত ৯ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বুয়েট প্রশাসন চাইলে তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে।

উপাচার্য সাইফুল ইসলাম গতকাল বলেন, বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি থাকবে না। আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং মামলার সমস্ত খরচ বহন করবে বুয়েট কর্তৃপক্ষ। বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে সরকারকে চিঠি দেওয়া হবে। বুয়েটে র‌্যাগিং থাকবে না। সরকার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে আশ্বস্ত করেছে বলেও জানান উপাচার্য।

এদিকে আবরার হত্যার প্রতিবাদে পঞ্চম দিনের মতো গতকাল সকাল থেকেই বুয়েট ক্যাম্পাসে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। সকালে তারা মিছিল ও পথনাটকসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী দাবি মেনে নিতে গতকাল বেলা ২টা পর্যন্ত সময়সীমা দিয়েছিলেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সেই আলটিমেটামের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বিকালে বুয়েট মিলনায়তনে ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ভিসি। বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে মিলনায়তনে আসেন উপাচার্য।

এ সময় বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিভিন্ন অনুষদের ডিনরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। কানায় কানায় পূর্ণ বুয়েট মিলনায়তনে বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকের শুরুতে নিহত শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। শিক্ষকদের আগে বৈঠকে অংশ নিতে শিক্ষার্থীরা প্রবেশপত্র দেখিয়ে সারিবদ্ধভাবে মিলনায়তনে প্রবেশ করেন। মিলনায়তনে প্রবেশের জন্য সাংবাদিকদের প্রেস কার্ডও সরবরাহ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

ক্ষমা চাইলেন বুয়েট উপাচার্য : এদিকে আবরার ফাহাদের জানাজায় উপস্থিত হতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি ক্ষমা চান। এ সময় উপাচার্য বলেন, ‘আবরারের ময়নাতদন্তের পর ক্যাম্পাসে যে জানাজা হবে সেই ইনফরমেশন আমার কাছে ছিল না। একটা গ্যাপ হয়েছিল। পরে জানতে পেরে যখন যেতে চেয়েছি, ততক্ষণে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবির মধ্যে ভিসির কাছে এই জবাবদিহির দাবিও ছিল। সপ্তম দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি এবং ৩৮ ঘণ্টা পরে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেন। কেন তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন। স্ব-শরীরে ক্যাম্পাসে এসে এর জবাবদিহি করতে হবে।’ গতকাল ভিসি ওই প্রশ্নের জবাবে ক্ষমা চান।

গত ৬ অক্টোবর রাতে ফেসবুক একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তিনি বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) ছাত্র ছিলেন। থাকতেন বুয়েটের শেরেবাংলা হলে। রাতভর আবরারকে ব্যাপক নির্যাতন করে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। রাত ৩টার দিকে হল থেকেই তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর থেকে শিক্ষার্থীরা আবরার হত্যার ঘটনায় খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি, বুয়েট ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করাসহ ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন।

অভিযুক্ত ১৮ জন গ্রেফতার : আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন তার বাবা। এই মামলায় এরই মধ্যে ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক আছে চারজন। এজাহারভুক্ত পাঁচজনকে এখনো গ্রেফতার করা যায়নি। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ইফতি মোশাররফ সকাল এবং গতকাল মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা আবরার হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দেন। বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ পদধারী ১১ জনকে সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

মামলায় আসামিরা হলো মেহেদী হাসান রাসেল, অনিক সরকার, ইফতি মোশারফ সকাল, মেহেদী হাসান রবিন, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুনতাসির আল জেমি, তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, মোজাহিদুর রহমান, মুহতাসিম ফুয়াদ, মনিরুজ্জামান মনির, আকাশ হোসেন, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মাজেদুল ইসলাম, মো. জিসান, শামীম বিল্লাহ, মো. শাদাত, এহতেমামুল রাব্বি তানিম, মো. মোর্শেদ, মো. মোয়াজ। এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে মো. জিসান, মো. শাদাত, এহতেমামুল রাব্বি তানিম, মো. মোর্শেদ ও মো. মোয়াজ এখনো পলাতক। অন্যদিকে এজাহারে নাম না থাকা গ্রেফতার চারজন হলো ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, অমিত সাহা, মিজানুর রহমান ও শামসুল আরেফিন রাফাত।

এদিকে আবরার ফাহাদকে নির্যাতনে জড়িত অভিযোগে ছাত্রলীগ যে ১১ জনকে বহিষ্কার করেছে, তাদের মধ্যে একজনের নাম এজাহারে কিংবা গ্রেফতারের তালিকায় নেই। তিনি হলো মুজতবা রাফিদ। তিনি বুয়েট ছাত্রলীগের উপদফতর সম্পাদক ছিলেন। বহিষ্কৃত অন্যরা হলো সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, নির্বাহী সদস্য মুনতাসির আল জেমি, এহতেমামুল রাব্বি তানিম ও মুজাহিদুর রহমান।

আন্দোলন চালাবেন শিক্ষার্থীরা, ভিসি বললেন পরীক্ষা নিতে দাও : সমঝোতা ছাড়াই শেষ হলো বুয়েট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের বৈঠক। আবরার ফাহাদ হত্যা কেন্দ্র করে তোলা প্রধান দাবিগুলো উপাচার্য মেনে নিলেও তার বাস্তবায়ন দেখে আন্দোলন থেকে সরতে চান শিক্ষার্থীরা। আলোচনার শেষ দিকে শিক্ষার্থীরা বলেন, ১০ দফা দাবির মধ্যে যেসব দাবি বুয়েট প্রশাসনের এখতিয়ারে তার বাস্তবায়ন না দেখা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। কোনো ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম চলবে না। এ সময় উপাচার্য বলেন, তোমরা আমার সন্তান। বাবা হিসেবে একটি আবেদন অন্তত পক্ষে আমাদের ইজ্জতটা মাটিতে লুটাবে না। ভর্তি পরীক্ষাটা নিতে দাও।

পিডিএসও/তাজ