*ভিপি নুরকে বরণ করে নিল ছাত্রলীগ *ক্লাস বর্জনের কর্মসূচি প্রত্যাহার

কোলাকুলিতে কমল দূরত্ব

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৯, ০৯:৪৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরকে স্বাগত জানিয়ে তাকে বরণ করে নিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। পাশাপাশি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন পরাজিত প্রার্থী ও ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিকালে অনির্দিষ্টকালের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার অঙ্গীকার করেছেন ভিপি নুর। বিকালে টিএসসি মিলনায়তনে কোলাকুলিও করেন শোভন ও নুর। তবে পরে সন্ধ্যায় বামদের সঙ্গে বৈঠকে ফল বাতিল করে ফের ভোট দাবি করেন নুর। পাশাপাশি ভিপি পদে শপথ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

সোমবার গভীর রাতে ডাকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়। সেখানে জিএস পদে ছাত্রলীগ প্রার্থী গোলাম রাব্বানীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ফল ঘোষণার পর গতকাল সকালে তা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করে ছাত্রলীগ ও অন্য প্যানেলের নেতা-সমর্থকরা। ছাত্রলীগ শুধু ভিপি পদে পুনর্নির্বাচন দাবি করে এবং অন্য সব প্যানেলের নেতারা পুরো নির্বাচনই পুনরায় অনুষ্ঠানের দাবিতে দিনভর বিক্ষোভ করেন। পরে দিন শেষে বিকেলে পাল্টে যায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চিত্র।

টিএসসিতে বিকেলে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন প্রতিদ্বন্দ্বী নুরুলকে বরণ অনুষ্ঠানে বলেন, আমাদের সবার চাওয়া-পাওয়া নুরুল হক পূরণ করবেন। আমি পারিনি তো কী হয়েছে, নুরুল হক পূরণ করবেন। সেজন্য সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, যেন স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ঠিক থাকে। এ সময় নুরুল হক ছাত্রলীগ সভাপতির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। এ সময় নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক বলেন, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের আমরা যে ঘোষণা দিয়েছিলাম, তা থেকে আমরা সরে এসেছি। তবে পুনর্নির্বাচনের দাবি অব্যাহত থাকবে। আমরা রায় মেনে নিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করব।

ভিপি নুরুল হক বলেন, ছাত্রলীগ আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। আমি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চাই। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের যে ঘোষণা দিয়েছিলাম, সেটা প্রত্যাহার করে নিলাম। আর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও পুনর্নির্বাচন চেয়েছেন, সেজন্য আমিও একই দাবি জানাচ্ছি।

এর আগে শোভনের অনুরোধে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে থেকে সরে যান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে ওই এলাকা থেকে ছাত্রলীগের কর্মীরা সরে যান। সেখানে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, আমাদের সবাইকে নিয়েই চলতে হবে। ক্যাম্পাসের পরিবেশ ঠিক রাখতে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। আমি সবাইকে অনুরোধ করব এখান থেকে সরে যেতে। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সবাই সরে যান। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে ওই এলাকায় যান চলাচল শুরু হয়।

এদিকে এই পরিস্থিতির মধ্যেই সন্ধ্যায় টিএসসিতে বাম ঐক্যের সঙ্গে বৈঠকের পর নুর ডাকসু নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবি করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে থাকার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি নিজে শপথ নেবেন বলেও জানান।

নুর বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে আমি বলতে চাই, যেহেতু আরো অনেক প্যানেল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, আমরা তাদের দাবির সঙ্গে একমত। এ নির্বাচন পুনরায় হতে হবে এবং নির্বাচনে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের পদত্যাগ করতে হবে; অন্যদের অধীনে আমরা নির্বাচনে অংশ নেব। হাইকোর্টের আগের নির্দেশনা অনুসারে ৩১ মার্চের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা। সেই সময়ের মধ্যেই নির্বাচন হোক।

নুর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে চলে যাওয়ার পর প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের ভিপি প্রার্থী ও ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী টিএসসিতে কথা বলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগামী তিন দিনের ভেতরে নতুন করে পুনরায় তফসিল ঘোষণা দিতে হবে। তা না হলে নতুন করে কর্মসূচি দেব। বুধবার (আজ) দুপুর ১২টার দিকে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে আমরা উপাচার্যের কার্যালয়ে যাব। সেখানে আমরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করব।

এর আগে সোমবার রাত ৩টা ২৪ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য ও পদাধিকার বলে ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করেন। ডাকসু নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত ছাত্রলীগ অন্য প্রায় সব পদে জয়ী হলেও ভিপি পদটি জিতে নেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নেতা নুরুল হক নুর। নির্বাচনে ছাত্র হল সংসদগুলোতেও ছাত্রলীগ একচেটিয়া জয় পেলেও ছাত্রী হলগুলোয় জয়ী হয়েছে কোটা আন্দোলনের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম ছাত্র সংগঠনগুলোর প্যানেলের বাইরে থেকে কাউকে ডাকসুর ভিপি পদে দেখার সুযোগ ঘটল। ছাত্রী হল সংসদে শীর্ষ পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত বছর বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ব্যানারে জোরাল আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিত পান এই ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক নুর। ভিপি পদে নুর পেয়েছেন ১১ হাজার ৬২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন পেয়েছেন ৯ হাজার ১২৯ ভোট।

জিএস পদে ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী ১০ হাজার ৪৮৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের রাশেদ খান পেয়েছেন ৬ হাজার ৬৩ ভোট। এজিএস পদে জয়ী হয়েছেন ছাত্রলীগের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। তিনি পেয়েছেন ১৫ হাজার ৩০১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ফারুক হোসেন ভোট পেয়েছেন ৫ হাজার ৮৯৬।

ছাত্রলীগ ডাকসুতে ২৩ পদে বিজয়ী হয়েছে। ডাকসুর ইতিহাসে এ-ই প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন বেশির ভাগ পদে বিজয়ী হলো।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অপর বিজয়ীরা হলেন সাদ বিন কাদের (স্বাধীনতা যুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক), আরিফ ইবনে আলী (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক), লিপি আক্তার (কমনরুম ও ক্যাফেটারিয়া সম্পাদক), শাহরিমা তানজিনা অর্নি (আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক), মাজহারুল কবির সায়ান (সাহিত্য সম্পাদক), সাম-ই-নোমান (সংস্কৃতি সম্পাদক), শাকিল আহমেদ তানভির (ক্রীড়া সম্পাদক) ও রাকিব হাওলাদার (ছাত্র পরিবহন সম্পাদক)।

নির্বাহী কমিটির নির্বাচিত ১৩ জন সদস্য হলেন, চিবল সাংমা, নজরুল ইসলাম, রকিবুল ইসলাম ঐতিহ্য, তানভির হাসান সৈকত, রাইসা নাসের, সাবরিনা ইতি, ইসহাত কাশফিয়া ইরা, নিপু ইসলাম তম্বী, হায়দার মোহাম্মদ জিতু, তিলোত্তমা সিকদার, জুলফিকার আলম রাসেল এবং মাহমুদুল হাসান।

ঢাবির ১৮টি আবাসিক হলে মোট ভোটার ৪৩ হাজার ২৫৬ জন। এদের মধ্যে ছাত্র ২৬ হাজার ৯৬৪ ও ছাত্রী ১৬ হাজার ২৯২ জন। প্রত্যেক ভোটার ডাকসু ও হল সংসদের ৩৮ পদে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ডাকসুতে ২৫টি ও হল সংসদে ১৩টি পদে ভোট হয়েছে। ১৮টি হলের মধ্যে ১০টিতে ছাত্রলীগ ভিপি ও জিএস পদে বিজয়ী হয়েছে। এছাড়া জহুরুল হক হলে ভিপি, ফজলুল হক মুসলিম হল ও অমর একুশে হলে জিএস পদে বিজয়ী হয়েছে।

পি​ডিএসও/হেলাল