*ভোটে উৎসবের আমেজ দীর্ঘ সারি *ঘুচল ছাত্ররাজনীতির অমানিশা

ডাকসুতে ছাত্রলীগের নিরঙ্কুশ জয়

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৯, ০৯:৪৩ | আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৯, ০৯:৫১

জিয়াউদ্দিন রাজু

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২৮ বছর পর শেষ হলো বহু প্রতীক্ষার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হলেন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩ হাজার ১৭৩ জন ভোটার শিক্ষার্থী। তারা স্বপ্নপূরণের মাহেন্দ্রক্ষণ কাটিয়েছেন উৎসবের আমেজে ভোট দিয়ে। আর অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) মেশিনে ভোট গণনা শেষে ফল ঘোষণা করেন নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান।

এর আগে সকাল ৮টা থেকে শুরু হয় ভোটগ্রহণ, চলে বিকেল ৫টা ১০ মিনিট পর্যন্ত। সকাল ৮টায় বিজয় একাত্তর হলে গিয়ে দেখা যায়, ভোটারদের লম্বা লাইন। ঠিক ৮টার দিকে ভোটকক্ষে উপস্থিত প্রার্থীদের সামনে ব্যালট বাক্স খুলে দেখান নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা। খালি ব্যালট বাক্স সবাইকে দেখানোর পর তা সিলগালা করা হয়। তবে রোকেয়া হলে এক ঘণ্টা ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ৩ ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়। এই ভোটে জয়জয়কার হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের। গভীর রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভিপি ও জিএস পদে বিপুল ভোটে এগিয়ে ছিলেন যথাক্রমে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। বাকি পদেও এগিয়ে ছিলেন এই প্যানেলের অন্য প্রার্থীরা। তবে হল সংসদে ছাত্রলীগের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও ভিপিসহ বিভিন্ন পদে জয়ী হয়েছেন। এই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা পেল, বন্ধ্যত্ব ও ছাত্ররাজনীতির অমানিশা ঘুচল।

৭০ বছর আগে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে পূর্ববাংলা আলোড়িত হয়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনেরও সূতিকাগার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যার পরিণতিতে আমরা স্বাধীন স্বদেশ পেয়েছি। জন্মের উৎসমুখের এই দিনটি ডাকসু নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আরো উজ্জ্বলতর হলো, গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা আরো কণ্টকমুক্ত হলো—এই স্বাধীনতার মাসেই।

ডাকসুর ২৫টি পদে এবং হল সংসদের ১৩টি পদে ভোট দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ভোট শুরুর পর কুয়েত মৈত্রী হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে ওই হলের প্রাধ্যক্ষ শবনম জাহানকে বহিষ্কার করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। উপাচার্য আখতারুজ্জামান ভোট নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, আমি শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানাই। তারা সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তারা গণতন্ত্রের রীতিনীতি অনুসরণ করেই ভোট দিয়েছেন। আমি অনেকগুলো কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। এই কারণে আমি তাদের ভূয়সী প্রশংসা করছি।

তবে ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে দুপুরে ছাত্রদলসহ ভোটবর্জন করেন বাকি প্যানেলের প্রার্থীরা। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ভিসির পদত্যাগ ও ফের ভোট চেয়ে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। এর মধ্যে কয়েকটি সংগঠন আজ মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।

ভোটগ্রহণ শেষে গণনা চলার মধ্যে বিকাল ৫টায় উপাচার্য ভবনের সামনে সমাবেশে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন বাম সংগঠনগুলোর প্যানেলের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্যানেল, স্বতন্ত্র জোটের প্যানেল, স্বতন্ত্র অন্য প্রার্থী ও তাদের প্রতিনিধিরাও এই সমাবেশে ছিলেন।

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করেছে ছাত্রলীগ। ফের ভোট গ্রহণের দাবি হাস্যকর বলে ছাত্রলীগ মন্তব্য করেছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, অনেকে নতুন করে ভোটের কথা বলছেন। এটা হাস্যকর। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিবেচনা করতে চাইলে সেটা তাদের ব্যাপার। আমরা গণতন্ত্রের পক্ষে, তাই আমরা নিয়ম মেনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিলে মেনে নেব।

আর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস প্রার্থী গোলাম রাব্বানী বলেন, নির্বাচনে পরাজয় বুঝতে পেরে এক্সিট রুট খুঁজছিলেন ছাত্রদল, বাম সংগঠন, কোটা আন্দোলনকারীসহ অন্যরা। সেজন্য তারা একজোট হয়ে নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। প্যানিক সৃষ্টি করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ভোট ব্যাহত করতে চেয়েছিলেন—এটা ডাকসুর অতীত ইতিহাসেও ছিল, ছাত্রলীগ একদিকে এবং বাকি সবাই একদিকে। হল সংসদেও ছাত্রলীগ এগিয়ে।

পি​ডিএসও/হেলাল