সবার চোখ আজ ডাকসুতে

১৮ হলের ৫১১ বুথে ভোট ২৫ পদে লড়ছেন ২২৯ আনন্দ-উচ্ছ্বাসে শিক্ষার্থীরা

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৯, ০৮:৪৫ | আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৯, ১৬:২৯

জিয়াউদ্দিন রাজু

অনেক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘ ২৮ বছরের অচলায়তন ভেঙে হতে যাওয়া এ নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সবাই তাকিয়ে রয়েছেন এই নেতা তৈরির আঁতুড়ঘরে। স্বাধীন দেশে এটি ডাকসুর অষ্টম নির্বাচন। নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে উচ্ছ্বাস-আনন্দ। তবে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি সারা দেশের মানুষ তাকিয়ে আছেন এ নির্বাচনের দিকে।

সকাল ৮ থেকে ২টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। গতকাল রোববার রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন থেকে পাঠানো বুথ সব হলে স্থাপন করা হয়েছে। এবার ভোটার ৪৩ হাজার ২৫৬ জন। প্রত্যেকে ৩৮টি করে ভোট দিতে পারবেন। ডাকসুতে ২৫ পদের জন্য লড়ছেন ২২৯ প্রার্থী। আর ১৮ আবাসিক হলের ৫১১ বুথে ভোট গ্রহণ হবে। এদিকে, নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। ১৮ হলে ১১৩ ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বসিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ক্যাম্পাসের সাতটি স্পটে তল্লাশি চালাবে পুলিশ। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে এ ক্যামেরার ব্যবহার বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ স্পটগুলো হলো শাহবাগ, নীলক্ষেত, পলাশী, জগন্নাথ হল ক্রসিং, রুমানা ভবন ক্রসিং, দোয়েল চত্বর ও শহীদুল্লাহ হল ক্রসিং। এসব স্পটে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ও অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ তল্লাশির বাইরে থাকবে। অবশ্য মেডিকেলগামী লোকদের বকশীবাজার, চানখাঁরপুল হয়ে আসার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য, গণতন্ত্রের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।’

ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রলীগ ছাড়া আর কোনো সংগঠনই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পারেনি। ডাকসুর গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অবস্থান না থাকার কারণে হলগুলোতে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ছাত্রদল।

তবে, কর্মী সংকট আর নিজেদের জনপ্রিয়তা না থাকার কারণে অন্যান্য সংগঠন প্যানেল দিতে পারেনি বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতারা। এরই মধ্যে হল সংসদ নির্বাচনে তাদের কয়েকজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানান তারা।

গতকাল রোববার ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, ভোটের আমেজ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে। প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন, নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের করণীয় তুলে ধরেন। বাম ছাত্রসংগঠন, কোটা আন্দোলনকারীরা ও ঢাবির সাংবাদিক সমিতির নেতারা একসঙ্গে হাতে হাত রেখে হাঁটতে দেখা গেছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে, আমরা খুশি। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন, ইচ্ছা করলে ডাকসুর নেতারা আগের মতো ভূমিকা করতে পারবেন না। ডাকসুর ভূমিকা ৪৮ থেকে ৫২ পর্যন্ত, ভাষা আন্দোলনের জন্য সবাই এক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও বিভেদ ছিল না। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীরা ভাগ হয়ে আছেন। তাদের দাবি নিয়েও ভাগ রয়েছে। ফলে ইচ্ছে করলেও নেতারা এগোতে পারেন না।

শেষ দিনেও হলের প্রচারে বেশি মনোযোগী ছিলেন প্রার্থীরা। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফরম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন হলে প্রচার চালান এ দিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারেও সরব থাকতে দেখা যায় সব প্যানেল ও প্রার্থীকে।

শেষ মুহূর্তে শিক্ষার্থীরা আগামী দিনে কাদের তাদের নেতা হিসেবে বেছে নেবেন, তা নিয়ে চলে নানা হিসাবনিকাশ। তবে প্যানেল দেখে নয়, যারা তাদের ন্যায্য দাবিতে দীর্ঘদিন সমর্থন দিয়েছেন, তাদেরই ভোট দেবেন বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

ডাকসুর ২৫ পদ ও হল সংসদের ১৩ পদসহ প্রতি ভোটার ভোট দেবেন ৩৮ পদে। এর মধ্যে ভিপি-জিএস-এজিএসসহ শীর্ষ পদগুলোয় জোর প্রতিযোগিতার আভাস পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় সংসদে ভিপি পদে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুরের মধ্যে। এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বী ১৯ জনের মধ্যে আলোচনায় থাকা অন্যরা হলেন ছাত্রদলের মোস্তাফিজুর রহমান ও বাম জোটের লিটন নন্দী।

ডাকসুতে প্যানেল দিয়ে নির্বাচন করছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাম সংগঠনগুলোর জোট, কোটা আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ বিসিএল, ছাত্রমৈত্রী, স্বতন্ত্র জোট, ছাত্র মুক্তি জোট, জাতীয় ছাত্রসমাজ ও বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন।

২৫ পদে ২২৯ প্রার্থী : প্রার্থী তালিকা অনুসারে, ডাকসুর ২৫ পদের বিপরীতে লড়বেন ২২৯ প্রার্থী। এর মধ্যে সহসভাপতি (ভিপি) পদে ২১, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৪ ও সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ১৩ জন। এ ছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক ১১, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ৯, কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক ৯, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ১১, সাহিত্য সম্পাদক ৮, সংস্কৃতি সম্পাদক ১২, ক্রীড়া সম্পাদক ১১, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক ১০ ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে ১৪ জন। পাশাপাশি ১৩ সদস্য পদের বিপরীতে লড়বেন ৮৬ জন। ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে যারা বাদ পড়েছিলেন, তার মধ্যে যে পাঁচজন প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার আবেদন করেছিলেন, তারা সবাই প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।

ছাত্রদের ১৩ এবং ছাত্রীদের ৫ হলে প্রস্তুত করা হয়েছে ৫০৮টি বুথ। এর মধ্যে মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ৩২, সলিমল্লাহ মুসলিম হলে বুথ ৩৫, শহীদুল্লাহ হলে ২০, ফজলুল হক মুসলিম হলে ৩৫, অমর একুশে হলে ২০, জগন্নাথ হলে ২৫, কবি জসীমউদদীন হলে ২০, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ৩০, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ২১, স্যার এ এফ রহমান হলে ১৬, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ২৪, জিয়াউর রহমান হলে ২০ এবং বিজয় একাত্তর হলে ৪০, রোকেয়া হলে ৫০, কবি সুফিয়া কামাল হলে ৪৫, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ১৯, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ২০ এবং শামসুন্নাহার হলে ৩৫টি বুথ থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্য সেন হলের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন বলেন, হলে বুথ স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে।

পি​ডিএসও/হেলাল