‘ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রয়োজন’

প্রকাশ | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৭:০৯

তহিদুল ইসলাম, জাবি

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনকে কেন্দ্র করে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠেছে। স্বাভাবিকভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও জোর দাবি উঠেছে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের। এই দাবিতে বাম সংগঠনগুলো বেশ কয়েকদিন যাবৎ নানা কর্মসূচি পালন করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে আশ্বস্ত করা হচ্ছে। এসব কিছুই দীর্ঘকাল পরে জাকসু নির্বাচন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে জাকসু নিয়ে কী ভাবছে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ? জাকসু নির্বাচন সহ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শাখা ছাত্রলীগের দু’পক্ষে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, র‌্যাগিং, আবাসন সংকট প্রভৃতি বিষয়ে প্রতিদিনের সংবাদের সাথে কথা বলেছেন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি তহিদুল ইসলাম।

জাকসু নির্বাচন নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ কী ভাবছে?

এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল: ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা স্বাগত জানায়। কারণ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য ছাত্র নেতৃত্ব তৈরি হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই যুগ ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই। আমি মনে করি, ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আরো আন্তরিক হতে হবে এবং নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে কাজ করতে হবে।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হলে ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থানের বিষয়টি কীভাবে দেখবেন? 

এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সব সময়ই ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতির প্রতিকৃত হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইতিহাস লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইতিহাস গৌরব-ঐতিহ্যের ইতিহাস। ইতিহাসে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রলীগ সব সময় অগ্রসৈনিক হিসেবে কাজ করেছে। সেই জায়গা থেকে ছাত্রলীগ সব সময় সহাবস্থানের পক্ষে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বান্ধব পরিবেশে কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে না তাদের সাথে সহাবস্থানে ছাত্রলীগ ইতিবাচক। যারা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এক থাকবে তাদের সাথে ছাত্রলীগ সহাবস্থানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এক থাকবে। যাদের বৈধ ছাত্রত্ব রয়েছে, যারা রাষ্ট্রের ধ্বংসাত্বক কাজে লিপ্ত নয়, যারা মুক্তিযুদ্ধে আদর্শ-চেতনাকে ধারণ করে, ইতিবাচক রাজনীতিকে ধারণ করে তাদের সাথে সহাবস্থানে ছাত্রলীগের ইতিবাচক মনোভাব অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। 

জাকসু নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আপনাদের কোনও দাবি দাওয়া আছে কী না?

এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল: জাকসু নির্বাচন নিয়ে যে আলোচনা তা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ কীভাবে রক্ষিত হবে, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ কীভাবে বজায় থাকবে এ নিয়ে যদি কোনও আলোচনা হয় তবে তা তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে সমাধান হবে বলে আমরা মনে করি।

সম্প্রতি আপনার অনুসারী ও অপর একটি পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে?

এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল: পহেলা ফাল্গুনে রাজিব আহমেদ রাসেল ভাই ক্যাম্পাসে আসেন। এটা শুনে আমি তার সাথে কথা বলতে যাই। সেখানে গিয়ে তার সাথে সম্মানপূর্বক কথা বলার চেষ্টা করি। তবে তিনি এক পর্যায়ে রেগে যান এবং আমার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে শুরু করেন। তারপরও আমি তাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছি। তখন তার সাথে আমার বাক-বিতণ্ডা হয়। এরপর আমি হলে চলে আসি। হলে আসার পরে আমি হলের সামনে ছিলাম। এখানে অন্যান্য হলের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরাও ছিল। এক পর্যায়ে শামীম মোল্লা ও সাদ্দাম হোসেনের নির্দেশনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের নেতাকর্মীরা এসে শহীদ সালাম-বরকত হল আক্রমণ করে। তখন সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মীরা তা প্রতিহত করে। আমি তার সাথে ভালোভাবে কথা বলতে গেছি। আর সে ছাত্রলীগকে বিভক্ত করার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দাঙ্গ-হাঙ্গামা তৈরি করলো। আর এটাকে জায়েজ করার জন্য সে তার স্ত্রীকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে একটা ঘৃণ্য অভিযোগ দিয়েছে। আমি এবং জুয়েল রানা সব সময়ই চাই ছাত্রলীগ সুসংগঠিত থাকুক। কিন্তু হিংসার বশবর্তী হয়ে এবং এটাকে ইতিবাচকভাবে না নিয়ে তারা সংঘর্ষের দিকটাই বারবার বেছে নেয়। তারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মনে করেন শিক্ষাঙ্গনে এ ধরণের সংঘর্ষ ও অস্ত্রের ব্যবহার শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করছে। সংঘর্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা?

এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল: সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন যেন বাধাগ্রস্থ না হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের পথ তৈরি না হয় এজন্য আমাদেরকে অনেক কিছু বিবেচনায় নিতে হয়। তবে আমি একটি বিষয় অকপটে বলতে চাই- যারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই তাদের ইতিবাচকভাবে নিবে না। আমরা সব বিষয় বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বিষয় সম্পর্কে জানিয়েছি। আমরা তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি।

জাবি ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির মেয়াদ দুই বছরের বেশি হয়ে গেছে। তবে এখনো হল কমিটি হয়নি। কারণ কী?

এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল: আমরা সব সময়ই চেয়েছি যারা ছাত্রলীগের জন্য কাজ করেছে, যারা পরিচ্ছন্ন ইমেজের অধিকারী, যারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য তাদেরকে দিয়ে হল কমিটির নেতৃত্ব তৈরি করা। তবে বাইরের অনেক প্রভাব ছিল। একজন সাবেক নেতার হস্তক্ষেপ এটার মধ্যে ছিল। সেসব ওভারকাম করে আমাদের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- যারা সংগঠনের জন্য শ্রম দিয়েছে, সংগঠনের সেবা করেছে এরকম ত্যাগী নেতাকর্মীদের দিয়ে হল ইউনিটের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তবে যত প্রতিবন্ধকতায় আসুক আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করবো।

হল কমিটি না হওয়ায় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?

এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল: একটি বিশেষ মহল চায় না- ছাত্রলীগে জনপ্রিয়, পরিচ্ছন্ন, মেধাবী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হোক। মূলত তাদেরই অপচেষ্টা এবং কুরাজনীতির কারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঠিক সময়ে হল কমিটি হয়নি। তবে কমিটি করার যে প্রক্রিয়া সেটা অব্যাহত আছে। আমরা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাথে যোগাযোগ রাখছি। আশা করছি খুবই কম সময়ের মধ্যে হল কমিটি দেয়া সম্ভব হবে।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার সংগঠন কী করছে?

এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল: আগে একটা সময় র‌্যাগিংয়ের ব্যাপক প্রচলন ছিল। আমরা বিভিন্ন হলে গিয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছি। তাদরে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছি। তাদের স্বাভাবিক শিক্ষা গ্রহণের পরিবেশ তৈরিতে কাজ করেছি। আমরা সব সময়ই র‌্যাগিংয়ের বিপক্ষে সোচ্চার ছিলাম। আমরা বিভিন্ন সময় সাংস্কৃতিক কর্মসূচি পালন করেছি, খেলাধুলার আয়োজন করেছি। মাদকের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছি। পাশপাশি শিক্ষার্থীদের খাবার ব্যবস্থা,ডাইনিং নিয়ে কথা বলেছি। আমরা শিক্ষার্থীদের দাবি প্রশাসনের কাছে তুলে ধরেছি। সাম্প্রতিক সময়ে মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। আমরা প্রশাসনের সাথে এ বিষয়ে কথা বলবো। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ যেন বিদ্যমান থাকে সেজন্য প্রশাসনকে সহযোগিতা করছি। বিভিন্ন সময়ে হলে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের খোঁজ খবর নিয়েছি। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।

আপনি জানেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকট রয়েছে। এই সংকটের কারণে নবীন শিক্ষার্থীদেরকে গণরুমে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। অনেকেই আবাসন সংকটের পেছনে ছাত্রলীগের দায় দেখেন। এ বিষয়ে কী বলবেন?

এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল: ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কারণেই আবাসন সংকট রয়েছে এ বিষয়টি মানতে রাজি নই। কারণ প্রতিটি ছাত্রলীগ কর্মী তাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার। শুধু তাই না যখন একটা ব্যাচের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয় তাদেরকে সেবা করা, তাদের অবিভাবকদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে। ভর্তি পরীক্ষার সময় ভর্তিচ্ছুদের আবাসনের ব্যবস্থা করে। প্রতিটি ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ত্যাগ-ছাড়ের মানসিকতা নিয়েই তাদের গ্রহণ করে। সুতরাং এখানে বৈরী হওয়ার কোন বিষয় নেই। যাদের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে গেছে তাদের কিন্তু আমরা বলি তারা যেন তাদের সিটটি নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য ছেড়ে দেয়। নেতাকর্মীরা হল প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহায়তা করে। আবাসন সংকটের পেছনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কোনভাবেই দায়ী না। 

২৪ ফেব্রুয়ারি ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হচ্ছে। নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনাদের বার্তা কী?

এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল: নবীন শিক্ষার্থীদেরকে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা। আমরা আশা করি তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে চেতনাকে ধারণ করে তাদের শিক্ষা জীবনের সঠিক ব্যবহার করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরবে এবং রাজনৈতিক সচেতনার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে একেকজন কারিগর হয়ে উঠবে।

পিডিএসও/রি.মা