স্কুলভর্তিতে লাগামহীন বাণিজ্য

নানা অজুহাতে বাড়তি ফি, জিম্মি অভিভাবকরা

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:০৮

জুবায়ের চৌধুরী
ama ami

সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে দেশের বেসরকারি স্কুলগুলোয় চলছে লাগামহীন ভর্তিবাণিজ্য। বেশির ভাগ স্কুলেই উন্নয়ন ফির নামে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি টাকা। এ অবস্থায় জিম্মি হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। আর স্কুলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এখনো প্রমাণের অপেক্ষায় শিক্ষা অধিদফতর।

ঢাকা মহানগরের নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা না মেনে নিজেদের ইচ্ছামতো ফি আদায় করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপায়ন্তর না দেখে বাধ্য হয়ে বাড়তি অর্থ পরিশোধ করে সন্তানকে ভর্তি করছেন অভিভাবকরা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টরা খোঁড়া যুক্তি দিয়ে বলছেন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনব্যয় বেড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে বাড়তি অর্থ নেওয়া হচ্ছে। স্কুলের বিভিন্ন খাতে অনেক ব্যয়। তাই কমিটির সিদ্ধান্তে ভর্তি ফি বাড়ানো হচ্ছে। আবার এটাকে অন্যায় মানতেও নারাজ তারা। গত নভেম্বর থেকে দেশের সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম শুরু হয়। লটারি ও ভর্তি পরীক্ষার পর্ব শেষে শুরু হয় ভর্তি কার্যক্রম।

এদিকে বাড়তি ফি আদায়ের ব্যাপারে গতকাল শুক্রবার দেশের নতুন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভর্তি ফি নেওয়া হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি বলেন, ‘ভর্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি আদায়ের বিষয়টি নিশ্চয়ই নিয়মবহির্ভূত এবং অন্যায় কাজ। আমি আশা করব বিদ্যালয়ে যে নিয়ম বেঁধে দেওয়া আছে, সেই নিয়ম মেনে তারা শিক্ষার্থী ভর্তি করবেন এবং অতিরিক্ত ফি আদায় করবেন না। কোনো ক্ষেত্রে যদি অতিরিক্ত ফি আদায় করা হয় এবং সে অভিযোগের প্রমাণ পাই, তাহলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’গতকাল চাঁদপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে নির্বাচন-পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।

শিক্ষার মান উন্নয়ন প্রসঙ্গে দীপু মনি বলেন, বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া, শিশুকে স্কুলমুখী করা এবং ঝরেপড়া রোধসহ শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপনসহ যেসব সাফল্য রয়েছে, তা এগিয়ে নিতে আগামী পাঁচ বছর এ ধারা অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্য যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তাও মোকাবিলা করা হবে। শিক্ষার মান উন্নয়নে যা কিছু প্রয়োজন, সবকিছু করা হবে। এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ জিয়াউল হক জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এ অসৎ বাণিজ্য বন্ধ করতে তৎপর রয়েছেন তারা। বাড়তি ফি কিংবা অন্য যেকোনো অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হয়ে যাচ্ছে, অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য যে কাগজপত্র দরকার তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না।

জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত রাজধানীতে ভর্তি ফি বাবদ এমপিওভুক্ত স্কুল ৫ হাজার টাকা, অর্ধ-এমপিও ও নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেশন চার্জ ও উন্নয়ন ফিসহ বাংলা মাধ্যমে ৮ হাজার আর ইংরেজি মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করতে পারবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ধানমন্ডিতে কাকলী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ। এমপিওভুক্ত এই স্কুলে শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাবদ প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ১৫ হাজার ৪০০ টাকা। যেখানে সরকারি নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় এমপিওভুক্ত স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে ভর্তি ফি নিতে পারবে ৫ হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত ফিই নিচ্ছে। বাকি টাকা স্কুল উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ বাবদ নেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীর বেশ কিছু স্কুল ঘুরে একই চিত্র মিলেছে। যাত্রাবাড়ী শামসুল হক খান স্কুল ১৪ হাজার ৪০০ ও খিলগাঁও ন্যাশনাল আইডিয়াল ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা ভর্তি ফি নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মিরপুরের মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মিরপুরের রূপনগন মডেল অ্যান্ড কলেজ, ধানমন্ডির জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাইস্কুল, স্ট্যামফোর্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাকলী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, বাড্ডার আলাতুন্নেছা স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে ঘুরে অতিরিক্ত ভর্তি ফি বাবদ অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সন্তানকে ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে এক ধরনের নিরুপায় হয়েই অভিভাবকরা এ ভর্তি-বাণিজ্যের কাছে জিম্মি হচ্ছেন। একজন অভিভাবক বলেন, ‘জানুয়ারির বেতন ছাড়াই ১৫ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে সন্তানকে স্কুলে রাখবে কি না তারই তো গ্যারান্টি নেই।’

একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, ধানমন্ডির নন-এমপিওভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্ট্যামফোর্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্লে থেকে কেজি শ্রেণিতে বেতন তিন হাজার টাকাসহ ভর্তি ফি নেওয়া হচ্ছে মোট ২৮ হাজার টাকা। প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে বেতনসহ ভর্তি ফি ৩০ থেকে ৩৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। আবার পুনঃভর্তির ক্ষেত্রেও সমান অর্থ নেওয়া হচ্ছে।

ধানমন্ডির জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাইস্কুলেও দেখা যায় একই চিত্র। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিরপুরের মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের চিত্রও একই রকম। সরকারের দেওয়া নীতিমালা অনুসরণ না করে সেখানেও ‘গলাকাটা’ ভর্তি ফি নেওয়া হচ্ছে। স্কুলটির কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করে জানান, এখানে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি ফি নেওয়া হচ্ছে আট হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া শুধু প্রথম শ্রেণির জন্য উন্নয়ন ফি বাবদ বাড়তি ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য শ্রেণিতে ফি নেওয়া হচ্ছে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। জানতে চাইলে স্কুলটির অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘স্কুলের বিভিন্ন খাতে অনেক ব্যয়। কমিটির সিদ্ধান্তে আমরা ভর্তি ফি নির্ধারণ করেছি।’

একইভাবে বাড্ডার এমপিওভুক্ত স্কুল আলাতুন্নেছা স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ১২ থেকে ১৮ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ শামসুল আলম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বেশি। ফি তো একটু বেশি নিতেই হয়, না হলে চলব কীভাবে?’

কয়েকজন অভিভাবক বাড়তি ফি নেওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, সরকার অনেক কিছু বিবেচনা করেই ভর্তি ফি নির্ধারণ করেছে। এর পরও এসব প্রতিষ্ঠান গলাকাটা ফি আদায় করছে। আমরাও নিরুপায়। আমাদের বাচ্চাদের তো বাধ্য হয়েই ভর্তি করাতে হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ফির বাড়তি অর্থ আদায় করতে না পারে।

এ বিষয়ে মাউশির মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক সরকার আবদুল মান্নান জানান, স্কুলগুলোতে বাড়তি ফি আদায় বন্ধে মাউশির ১১টি টিম কাজ করছে। বাড়তি ফি নিয়ে কেউ পার পাবে না। সবাইকে বাড়তি ফি ফেরত দিতে হবে। তিনি বলেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণসহ মাউশিতে প্রতিবেদন জমা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান মাউশির নির্দেশে বাড়তি অর্থ ফেরত দিচ্ছে। আবার বাড়তি অর্থ ফেরত দেওয়া হলেও সন্তোষজনক কারণ জানাতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পিডিএসও/তাজ