প্রতিবন্ধী শিক্ষকদের চাকরির মেয়াদ ২ বছর বাড়ছে

প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠাচ্ছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় : বেসরকারি স্কুলের প্রতিবন্ধী শিক্ষকরাও এ সুযোগ পাবেন

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:১৪

গাজী শাহনেওয়াজ

দেশে সরকারি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত প্রতিবন্ধী স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চাকরির মেয়াদ ২ বছর বাড়ানো হচ্ছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বয়স বৃদ্ধি সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ তৈরি করছে, যা শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। এই প্রস্তাবে বেসরকারি স্কুল-কলেজে যারা প্রতিবন্ধী কোটায় শিক্ষকতা করছেন তারা এ আওতায় পড়বেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সারা দেশে ৫৬টি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের বেসরকারি শিক্ষকদের শতকরা ১০ ভাগ বেতন সহায়তা পাচ্ছে, যা জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন বাস্তবায়ন করছে।

এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে সুইড বাংলাদেশ পরিচালিত ৪৮টি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ৭টি ইনক্লুসিভ বিদ্যালয় এবং প্রয়াসের একটি অটিস্টিক শিশুদের বিদ্যালয়। এ খাতে সরকারে বরাদ্দ রয়েছে সাড়ে ৯ কোটি টাকা। খবর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রের।

জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রতিষ্ঠান ও প্রতিবন্ধিকতা) সুশান্ত কুমার প্রামাণিক বলেন, এ ধরনের একটি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেখানে প্রতিবন্ধী স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চাকরির মেয়াদ ২ বছর বাড়ানো প্রস্তাব রাখা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের একজন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্যান্য অনেক সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির বয়স বাড়িয়েছে সরকার। প্রতিবন্ধী স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বয়স বৃদ্ধির বিষয়টি যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য দাবি। কারণ প্রতিবন্ধীরা সমাজ কিংবা পরিবারের বোঝা না হয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করতে কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন। এ সংক্রান্ত একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করা হচ্ছে, শিগগিরই তা অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। এখানে কর্মরতদের বয়স ২ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের চাকরির বয়সসীমা বাড়ানোর জন্য সময়ে সময়ে দাবি উঠে থাকে। তবে বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় সরকার এসব দাবির প্রতি একাত্মতা পোষণ করেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার সময়সীমা বাড়িয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে যুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বয়সসীমা।

মুক্তিযোদ্ধা ও সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়টি কয়েক বছর হয়ে গেছে। এখন নতুন করে দাবি উঠেছে অবসরের বয়সসীমা আরো বাড়ানোর; এর সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর প্রস্তাব। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি সম্প্রতি বৈঠকেও অবসর এবং চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর সুপারিশ জানিয়েছে।

গত জুনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২৯তম সভায় সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করার সুপারিশ করা হয়। এর আগে কমিটির ২১তম সভায় বয়স ৩২ বছর করার সুপারিশ করা হয়েছিল। আর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশে অবসরের বয়সসীমা ৫৯ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, স্থায়ী কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছে। আর সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের যুক্তি চাকরিতে প্রবেশের কোনো ধরনের বয়সসীমা থাকা উচিত নয়।

এর আগে ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অবসরের বয়স ৫৭ থেকে বাড়িয়ে ৫৯ বছর করা হয়। তবে অধ্যাদেশ জারির কারণে তা ২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এছাড়া গত বছরের ২১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৬০ বছর করার ঘোষণা দেন।

এদিকে, সরকারি কিংবা মুক্তিযোদ্ধা প্রজাতন্ত্রের কর্মরতদের চাকরির বয়সসীমা বাড়ানোর ভিড়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে প্রতিবন্ধী স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পাশাপাশি বেসরকারি স্কুল-কলেজে পাঠদান দেওয়া প্রতিবন্ধী শিক্ষকরা।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য মতে, দেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৮ লাখ ৬ হাজার ৩১০ জন। যাদের মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী ৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৬৩ জন এবং বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ১ লাখ ২১ হাজার ৪৭ জন। প্রতিবন্ধীবান্ধব বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীদের নিয়ে বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা-২০০৯ এর আওতায় জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে ২০১১ সালে স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম চালু করা হয়। স্কুলগুলো সম্পূর্ণ অবৈতনিক বলে জানা গেছে।

বিএসএড ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেয়ার-বিভাগের সমন্বয়ে এসব স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। এসব স্কুলে সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ হাজার ৭০৯ জন। বর্তমান সরকারের সময়ে ঢাকা শহরের মিরপুর, লালবাগ, উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীতে ৪টি, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর ও সিলেট এই ৬টি বিভাগীয় শহরে এবং গাইবান্ধা জেলায় একটিসহ মোট ১১টি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুল রয়েছে। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সর্বমোট ৬২টি প্রতিবন্ধী স্কুল চালু রয়েছে।

এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যে দেখা গেছে, স্কুলের বাইরে থাকা সব অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুকে শিক্ষার মূলস্রোতে আনার উদ্যোগ রয়েছে সরকারের। এ লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে দেশের ৮ বিভাগে একটি করে বিশেষায়িত ‘ইনক্লুসিভ মডেল স্কুল’ গড়ে তোলা হচ্ছে; সেগুলো হচ্ছে ঢাকায় জিনজিরা পিএম পাইলট স্কুল, রাজশাহীতে অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, খুলনায় সরকারি দৌলতপুর মহসিন স্কুল, সিলেট সরকারি হাইস্কুল, ময়মনসিংহে মুকুল নিকেতন উচ্চবিদ্যালয়, বরিশালে সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং রংপুরে চন্দন পাঠ হাইস্কুল।

প্রতিবন্ধী স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পাশাপাশি বেসরকারি স্কুলে পাঠদান করা প্রতিবন্ধী শিক্ষকদের বয়স বাড়ানো প্রস্তাব করছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের বয়সসীমা ২ বছর বাড়ানো হবে। শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠাচ্ছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

পিডিএসও/তাজ