বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এখনো রাজপথে

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৮, ০৮:৫৭ | আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৮, ১১:০৫

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীতে চলমান ছাত্র বিক্ষোভ গতকাল পঞ্চম দিন পাড়ি দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। কিন্তু তারপরও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গতকাল সদলবলে রাজধানীর রাস্তায় অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেয় ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস।’ বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এদিন স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে যোগ দেয়।

ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, মিরপুর রোড, ফার্মগেট, ইএমএস-হোটেল রেডিসন সংলগ্ন এলাকা, কাকলী-বনানী-মহাখালী, গুলশান-১-২, এয়ারপোর্ট রোড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, শাহবাগ, মতিঝিল যাত্রাবাড়ীসহ বেশির ভাগ সড়ক- মহাসড়ক শিক্ষার্থীদের দখলে চলে যায়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মহানগরীর বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ করেছে। অন্যান্য দিনের মতো গতকাল কোনো গণপরিবহন রাস্তায় দেখা যায়নি। রিকশা, পায়ে হেঁটে এবং মোটর বাইক চড়ে গন্তব্যে আসা-যাওয়া করেছেন কর্মজীবী মানুষ।

এদিকে, আন্দোলন শুরুর দিন থেকে বাস, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের যাত্রীদের বৈধ কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করে দেখেছে শিক্ষার্থীরা; গতকালও তা অব্যাহত ছিল। এ তালিকা থেকে বাদ যায়নি রাষ্ট্রের মন্ত্রী, এমপি, পুলিশ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও। পুলিশও লাইসেন্স না থাকায় মামলার মুখোমুখি হন। এমনকি বৈধ কাগজপত্র না থাকায় অনেককে গন্তব্যে ফিরে যেতে অনুরোধ জানায় বিক্ষোভকারী তরুণ-তরুণীরা। তবে এদিন গাড়ি ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আবার তরুণ-কিশোরদের এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার আকরাম খান ও কাউন্টার টেরিরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলামসহ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী অনেকেই। আর নবীন ছাত্রছাত্রীদের ৯ দফা দাবিকে যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির সঞ্চালক হানিফ সংকেত তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ দেখে, আনন্দ-আবেগে চোখ ভিজে গেছে।

এদিনে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবার। দুই পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে ৪০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র অনুদান হিসেবে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাহী বিভাগের প্রধানের কাছ থেকে এ অনুদান পেয়ে নিহত শিক্ষার্থীর পরিবার বলেন, তাদের দাবি পূরণ হয়েছে। তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু এতেও কোনো লাভ হয়নি; আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ফুঁসে ওঠা আন্দোলনে এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ৩০৯টি গাড়ি ভাঙচুর করেছে।

সরেজমিনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশিরভাগ সরকারি গাড়ির ড্রাইভারের লাইসেন্স নেই। গাড়ির যথাযথ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। এ কারণে সার্জেন্ট ডেকে সরকারি গাড়িতে মামলা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। ফার্মগেটে হলিক্রস কলেজের শিক্ষার্থী হাবিবা জানান, ‘আমরা যে কয়টা সরকারি গাড়ি থামিয়েছি, কোনো গাড়িতেই লাইসেন্স ছিল না। এমনকি পুলিশ, বিজিবির গাড়িতেও লাইসেন্স নেই।’ এলিফ্যান্ট রোডে থাকা কমার্স কলেজের শিক্ষার্থী ঋধ্য অনিন্দ্য বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি গাড়ি থামিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু কোনো লাইসেন্স ছিল না। ডিআইজির গাড়িতেও লাইসেন্স ছিল না। আমরা সার্জেন্টকে ডেকে মামলা দেয়ার ব্যবস্থা করেছি।’ আবার অনেকেই দাবি করেছেন, সরকার লিখিতভাবে দাবি পূরণের অঙ্গীকার দিলে আন্দোলন থেকে ঘরে ফিরব আমরা জানান কয়েকজন শিক্ষার্থী।

রাজধানীর বাইরের সিটিগুলোতে সমানতালে বিক্ষোভ করেছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ বড় বড় শহরগুলোতেও আন্দোলন হয়েছে। আমাদের প্রতিনিধিরা জেলা শহরের বিক্ষোভের তথ্য পাঠিয়েছেন—

খুলনা : খুলনার নগরীর শিববাড়ি মোড়ে গতকাল রাস্তা অবরোধ করে মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থীরা। এ কর্মসূচিতে জেলার বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। এ সময় নিরাপদ সড়কসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে সেগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা।

সিলেট : নগরীর চৌহাট্টা পয়েন্ট ও সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় বেলা আড়াইটা থেকে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগ দাবিসহ ৯ দফা দাবিতে জড়ো হয় হাজারো শিক্ষার্থী। তারা নগরীর ব্যস্ততম চৌহাট্টা সড়কের চারটি রাস্তা অবরোধ করে রাখে। তবে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে কোনো বাধা দেয়নি তারা। এদিকে সকালে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন পালন করে।

চট্টগ্রাম : বেলা সাড়ে ১০টার দিকে ওয়াসার মোড় পার হচ্ছিলেন নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (উত্তর) হারুনুর রশিদ হাজারী। চালকের লাইসেন্স দেখতে ব্যর্থ হলে তার সরকারি গাড়িটি আটকে দেয় শিক্ষার্থীরা। এভাবে পুলিশের একটি টহল ভ্যান ওয়াসার মোড় অতিক্রমকালে তার লাইসেন্স দেখাতে বললে চালক গাড়ি টান দেন। ছাত্ররা পাথর ছুঁড়ে মারলে ওই পুলিশ সদস্যের মাথা ফেটে যায়। দুপুর ১টার দিকে নগরের এ কে খান এলাকায় একটি লরির চালকের লাইসেন্স দেখতে চান শিক্ষার্থীরা, তখন চালক গাড়ি টান দিলে শিক্ষার্থীরা ঢিল ছুঁড়ে সামনের কাঁচ ভেঙে দেয়।

এছাড়া নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানের কাগজপত্র ও চালকের লাইসেন্স না পেয়ে গাড়িটি আটক করে ট্রাফিক পুলিশের মাধ্যমে জরিমানার মুখোমুখি করে। দুই নম্বর গেট এলাকায় বান্দরবান জেলা পরিষদের কার্যালয়ের গাড়ির চালকের লাইসেন্স পায়নি শিক্ষার্থীরা। ওই এলাকায় সড়কের পাশে অবৈধভাবে রাখা ইটগুলো নিজেদের দায়িত্বে সড়কে বিছিয়ে দিয়ে গর্ত ভরাটও করে তারা।

মুরাদপুর, ষোলশহর, জিইসি, ওয়াসা, দেওয়ানহাট, অক্সিজেনসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা অবস্থানের কারণে শহরের সড়কে যানবাহন কম দেখা গেছে। অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট চলেছে চট্টগ্রামে।

রাজশাহী : নগরীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে বিক্ষোভ করেছে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে হাতে নানা প্ল্যাকার্ড নিয়ে জিরো পয়েন্টের রাস্তায় জড়ো হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। এ সময় ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কেন্দ্র করে সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের চারপাশ দিয়ে পুলিশ ঘিরে রাখে।

নোয়াখালী : ‘নিরাপদ সড়ক চাই, পথ যেন হয় শান্তির, মৃত্যুর নয়’—এই স্লোগানে নোয়াখালীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করছে বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। বেলা ১১টা থেকে জেলার বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা শহরের মাইজদী-চৌমুহনী সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। ফলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর দেড়টার দিকে একদল যুবক সড়কে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও লাঠিপেটা করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় কয়েকটি বাস ভাঙচুর করে শিক্ষার্থীরা। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে তারা।

রংপুর : গতকাল রংপুরের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার পর থেকে চেকপোস্ট মোড় থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত পুরো সড়ক ছিল তাদের দখলে। এতে রংপুর মহাসড়ক হয়ে দিনাজপুর নীলফামারী পঞ্চগড়গামী সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে ভোগান্তিতে পড়ে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী শত শত বাস ও মালবাহী ট্রাক।

পিডিএসও/হেলাল