মতামত

নির্যাতিত মুসলিম বিশ্ব

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০১৭, ১৩:০৩

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম

বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটি। এটা মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। আজকের বিশ্বে মানুষ হাজারো সমস্যায় জর্জরিত। এ সমস্যা থেকে মুক্তির পথ কী? এটা আজ সব মহলেরই প্রশ্ন। অপরদিকে, মুসলিম জগৎ আজ পৃথিবীর এক বিরাট শক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাদের সমস্যার অন্ত নেই। এর কারণ কী?

বিশ্বের বিভিন্ন জনপদে তারা আজ লাঞ্ছিত, নির্যাতিত ও অপমানিত হচ্ছে। এর থেকে মুক্তির উপায় কী-তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। যে মুসলমানরা অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছিল, যাদের শৌর্যবীর্যের সামনে রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের বিশাল শক্তির নির্মম পরাজয় হয়েছিল, সে মুসলিম জাতি আজ বেদম মার খাচ্ছে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের হাতে। স্পেনে শত শত বছর মুসলমানরা ক্ষমতাসীন ছিল। সে স্পেনের পাশের দেশ বসনিয়া হার্জেগোভিনার ইতিহাস আমরা জানি। হাজার হাজার মুসলিম নর-নারীকে সেখানে নির্মমভাবে হত্যা ও অগণিত মুসলিম নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে।

বর্তমানে মিয়ানমারে যেভাবে গণহত্যা চলছে এ গণহত্যা বন্ধের কিছু মৌখিক দাবি উচ্চারিত হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হচ্ছে না। প্রতিবেশী কাশ্মীর, আফগানিস্তান, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় হাজার হাজার স্বাধীনতাকামী মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। মসজিদ ও মাজার ধ্বংস করা হয়েছে। যে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন ছিল সাত-আট শ বছর, সে ভারতে মুসলিম শাসনের পতনের পর রাজত্বকারী দুই শ বছরের ইংরেজ শাসনেরও পতন ঘটল। কিন্তু মুসলমানদের অবস্থার কি পরিবর্তন হয়েছে? সবকিছুরই আজ হিসাব মেলানো প্রয়োজন? মধ্য এশিয়ায় একসময় মুসলিম শাসন ছিল, আজ সেখানে নাস্তিক্যবাদীরা ক্ষমতায়। কমিউনিজম শাসনের পতনের পরও সেখানকার মুসলমানদের অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। চেচেন মুসলিমরা স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিচ্ছে, কিন্তু তাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে কি? রাবাত থেকে আরম্ভ করে জাকার্তা পর্যন্ত সুবিশাল মুসলিম জনপদের কয়টিতে সত্যিকার অর্থে শান্তি ও স্বস্তি আছে? আর যেখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সেখানকার অবস্থা তো আরো করুণ।

দেড় হাজার বছর আগে অমুসলিমদের হাতে যে অস্ত্র ছিল মুসলমানদের হাতেও একই অস্ত্র ছিল। ফলে সমশক্তির সমরাস্ত্রের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় মুসলিম জাতি প্রায় গোটা পৃথিবীতেই আধিপত্য বিস্তার লাভ করে। মধ্য এশিয়াসহ ইউরোপে ও আফ্রিকার মিলনস্থলের সবকয়টি দেশই মুসলিম শাসনাধীন ছিল। তখনকার নব্য সমরাস্ত্রে প্রশিক্ষিত মুসলমানরা অতীত সমর কৌশলীদের পরাজিত করে পৃথিবীর বুকে নবতর ইতিহাস সৃষ্টি করে। কালক্রমে মুসলমানদের মাঝে ইসলামী আদর্শ, ইসলামী ভ্রাতৃত্ব, ইসলামী ঐক্য, ইমানি শক্তি, আধ্যাত্মিক শক্তিমান যোগ্য নেতা ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয়, ফলে তারা আত্মকলহ ও স্বজাতীয় ভ্রাতৃঘাতীতে নিমগ্ন হয়ে পড়ে। ইসলামী আদর্শ, ইমান আকিদা তাদের মধ্য থেকে লোপ পেতে থাকে। তারা তাদের সমরশক্তি বৃদ্ধির পরিবর্তে দুর্বল হতে থাকে। এমনি করে রিসালাতের সূর্য যাদের আলো বিকিরণ করেছিল তারাই পুনরায় অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। আজ গোটা পৃথিবী অমুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, মানবসেবা ও সমর শক্তির নিচে মাথানত করে দিয়েছে।

কোরআনের প্রথম বাণী ছিল জ্ঞান অর্জনের। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী ছিল- জ্ঞান হিকমত (বিজ্ঞান) অর্জনের। মুসলমানরা তা বর্জন করেছে। অমুসলিমরা তা গ্রহণ করেছে। ফলে জ্ঞান বিজ্ঞানে আজকে অমুসলিমরা এগিয়ে। আজ মুসলমান তাদের নিকট থেকে জ্ঞান আহরণ করছে এবং তাদের কাছেই জ্ঞান-বিজ্ঞান ভিক্ষা করছে। আজ মুসলমানরা ভ্রাতৃঘাতী কলহে লিপ্ত হয়ে নিজেরাই নিজেদের কোরবানি দিচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান আহরণের পরিবর্তে মূর্খতা ও অন্ধত্বকেই আঁকড়ে ধরছে। নিজের দেশ রক্ষার জন্য ভাড়াটিয়া অমুসলিম ইসলাম বিধ্বংসী বাহিনী রাখছে। আর সামান্য বজ্রপাতের আওয়াজে দেশ থেকে পলায়নের রাস্তা খুঁজে বেদিশা হয়ে পড়ছে। দেশপ্রেমের পরিবর্তে জানপ্রেমই গুরুত্ব হয়ে পড়ছে। আর সোনালি যুগের মুসলমানদের মাঝে যোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতার নেতৃত্ব ছিল। নেতার প্রতি আনুগত্যও ছিল। কালে কালে যোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতার অপমৃত্যু ঘটে।

আজ ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলো অমুসলিমদের সেবাধর্মী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অমুসলিমরা মুসলিমদের আত্মকলহ মীমাংসার সালিশ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। মুসলমানরা ইসলামী আদর্শ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণের পরিবর্তে ইসলাম ও রাসূলের আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের খুশিমতো জীবন তরী চালাচ্ছে। আজো মুসলমান জাতি ইমানি বলে বলিয়ান হয়ে রাসুল (সা.)-এর আদর্শে উজ্জীবিত হলে এবং মদিনার আনসারদের ভ্রাতৃত্বে আবদ্ধ হয়ে অধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হলে গোটা পৃথিবী তাদের কাছে মাথানত করবে। মুসলমানদের নেতৃত্বের বড় গুণ আধ্যাত্মিক শক্তি। আধ্যাত্মিক শক্তিমান নেতার নেতৃত্বেই পুনরায় গোটা পৃথিবী জয় করা সম্ভব। শুধু সমরশক্তিই মুসলিম শক্তি নয়, অমুসলিমরা মুসলমানের আধ্যাত্মিক শক্তির কাছেই মাথানত করে। নবী-রাসূলসহ আউলিয়ায়ে কেরাম ও বিগত মুসলিম মুজাহিদদের মাঝে আধ্যাত্মিক শক্তি ছিল বলেই বিনা যুদ্ধেই অমুসলিমরা মুসলমানদের কাছে মাথানত করেছে। ইসলামী আদর্শ, সমর শক্তি, ঈমানি শক্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি মিলেই মুসলমানদের সামগ্রিক শক্তি।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে মুসলিম উম্মার আবির্ভাব ঘটেছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জাতিরূপে। মুসলিমরা শ্রেষ্ঠত্বের আসন সংরক্ষিত রেখেছিল খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনকালেও। সব কিছুর সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায় প্রতিষ্ঠা ছিল মুসলমানদের অনন্য কৃতিত্ব। মুসলিম ভূখন্ডে ন্যায়পরায়ণতার সুবাতাস মানুষের জীবনকে স্নিগ্ধ করে তুলছিল। পার্শ্ববর্তী অমুসলিম দেশগুলোর মানুষেরা এই স্নিগ্ধতার পরশ পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকত। ন্যায়ের প্রতি এই অনুরাগই মুসলিম উম্মাহকে বিশ্ব সমাজের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল। অতীতের মুসলমানরা ছিল শক্তিধর। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় তাদের স্থান ছিল সবার ঊর্ধ্বে। রণক্ষেত্রে একদিকে প্রয়োজন পড়ে অনড় মনোবলের এবং উন্নত মানের সমরাস্ত্রের। সেই দিনে কোনোটিরই অভাব ছিল না মুসলিম জাতির।

পবিত্র কোরআন থেকে বিচ্যুতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রতি অবজ্ঞা, উন্নতমানের সমরাস্ত্র তৈরির প্রতি উদাসীনতা মুসলমান জাতিকে শ্রেষ্ঠত্বের আসন থেকে নিচে নামিয়ে দেয়। অথচ মুসলমানদের কাছ থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সবক গ্রহণ করে ইউরোপীয়রা। ইউরোপ থেকে সেই জ্ঞানের আলো পৌঁছে আমেরিকায়। এমন সময় ইউরোপ ও আমেরিকা সামরিক শক্তি দিয়ে মুসলমানদের ছাড়িয়ে যায়। শুধু তাই নয়, উন্নততর সামরিক শক্তি নিয়ে ইউরোপ ঝাঁপিয়ে পড়ে মুসলিম দেশগুলোর ওপর। কেড়ে নেয় তাদের মূল্যবান সম্পদ। এটাই আজকের মুসলিম জাহানের বাস্তবতা। আজকের এই অক্ষমতা শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়, গোটা পৃথিবীর মানুষের জন্যও দুঃখের কারণ। পৃথিবীতে অনেক শক্তিধর দেশ আছে। কিন্তু ন্যায়নীতি সমুন্নত রাখর মতো দেশ কোথায়! দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করে না এমন দেশ কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব? পক্ষপাতমুক্ত, নিরপেক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ কর্মনীতি অনুসরণের উজ্জ্বল উদাহরণ সোনালি যুগের মুসলমানদের ছাড়া আর কে কবে পেশ করতে পেরেছে? পৃথিবীবাসীকে পরিত্রাণ দিতে পারে মুসলিম জাতিই, যদি তারা আবার আঁকড়ে ধরে কোরআন ও হাদিস আর মনোযোগ দেয় জ্ঞান-বিজ্ঞানে। আশা করি বর্তমান দুনিয়ার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট মুসলিম দেশগুলোর শাসকের চোখ খুলে দেবে।

আমেরিকা ক্রমেই মধ্য এশিয়ায় মুসলিম জনগণ অধ্যুষিত দেশগুলোর তেল সম্পদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। মার্কিনিদের জ্বালানি সম্পদের লোভে এ অঞ্চলের ওপর আগ্রাসী তৎপরতা শুরু করাই স্বাভাবিক। তেল-গ্যাস ছাড়াও এই অঞ্চলে এত বিপুল পরিমাণ গন্ধকের মজুদ রয়েছে যে, পৃথিবীর আর কোথাও তা নেই। উল্লেখ্য যে, ভারী শিল্প-কারখানাগুলোর জ্বালানি উপাদান হিসেবে গন্ধকের ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই অপরিহার্য। তাছাড়া মূল্যবান সব খনিজ সম্পদ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেই রয়েছে, যার জন্য ইউরোপ ও আমেরিকা হুমড়ি খেয়ে আছে এ অঞ্চলের দিকে। আফগানিস্তানে পাশ্চাত্য সা¤্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসন এবং ইরাকের ওপর হামলাই মুসলমানদের ‘বরদাশত’ না করারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

পিডিএসও/তাজ