তুমিও তো মা

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৭, ১২:০১

সাঈদ সাহেদুল ইসলাম

যা লিখতে চাইছি তা নিয়ে লিখতে ব্যক্তি জীবনের বাস্তবতাটা আসতেই পারে কখনো কখনো। সেটা দিয়েই শুরু করি। গ্রামে থাকি। বাড়িতে বেড়াতে এসেছে বড় বোন একজন, ছোট বোন একজন। মায়ের ঘরে মায়ের সঙ্গে কথা বলছে তারা। কর্মস্থল থেকে ফিরে দুপুরের খাবার খেতে রান্না ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মায়ের ঘরের দিকে তাকিয়ে ডাকলাম- ‘আপা, ছোট, মা-কে আমাকে খেতে দেবে, সে রান্না ঘরে এসো।’ জবাব পেলাম মায়ের কাছ থেকে ‘কী বাবা, আসছি।’ হাসতে হাসতে ছোট বোনটাকে বললাম, ‘দ্যাখ-তিনজনকেই ডাকলাম; মাকে ডাকলাম সবশেষে- অথচ মা-ই জবাব দিল।’ ছোট বোনটাও হাসতে লাগল, ‘আমি শুনেছি এবং আপাকে বলেছি যে ভাই ডাকছে।’ আপার মুখেও হাসি, ‘ভাই রে, ফ্যানের শব্দে শুনতে পাইনি।’ সে যা-ই হোক মা কিন্তু শুনতে পেয়েছিল এবং জবাব কিন্তু সে-ই দিয়েছিল। মা রান্না ঘরে এসে খাবার দিল, সামনে বসে থেকে খাওয়াল। একেই বলে মা। এর বাইরে মায়ের কোনো জাত, ধর্ম, সংজ্ঞা হয় কি?
মায়ের সন্তান সংখ্যা যত বেশিই হোক না কেন, তার ‘মা’ ডাক শুনতে কখনো ক্লান্তি আসে না। এ জন্যও তার মতো আপন কেউ হতে পারে না। আজ আমিও বাবা হয়েছি, তাও আবার এক যুগের বেশি হবে। তবু মায়ের কাছে আমি সেই শিশুটিই থেকে গেলাম, থাকতেও হবে। সন্তান বুড়ো হয়ে গেলেও মায়ের কাছে সে সন্তান ছোট খোকাখুকির মতো। সব মায়ের কথা বলছি না-আপনার, আমার বা আর কারো মা এমন হলেও সব মা তো এমন নয়! এটাই পৃথিবীর একটা বিস্ময়। পৃথিবীর যত পরিচিত আশ্চর্য আছে তার মধ্যে ‘মা, মায়ের মতো নয়’ গণনায় এমন বিস্ময়টির স্থান এক নম্বরে থাকলে কেউ সেটার প্রতিবাদ করবে বলে মনে হয় না!
সম্প্রতি একটি দৃশ্য মনের মধ্যে দাগটিই কেটে গেল। দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে থাকলে সবকিছু কেমন জানি এলোমেলো হয়ে যায়। মুখে লজ্জায় কোনো ভাষা আসে না। আসার কথাও নয়। কিছু ঘৃণা, দুঃখ, যন্ত্রণা, হতাশা সেখানে এসে ভিড় করে। চোখের কোনা ছলছল করে ওঠে। ডাস্টবিনে পড়ে আছে একটি সদ্যজাত প্রাণী। কোনো হীন-চতুষ্পদ প্রাণীর নয়। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষের শিশু। সে তো কেবল একটি শিশুর কথা বা দৃশ্য, যা দেখা গেছে- তাই। কিন্তু সব কিছু কি দেখা যায়? সব দৃশ্যের আড়ালে কত কিছুই না ঘটে যায়, তা কি জানা যায়? যায় না। আর তা জানা যায় না বলেই এমন ঘটনা যে আর ঘটে না তাও বলা মুশকিল।
এমন অনেক সদ্যজাত শিশুর খবর পত্রপত্রিকায় এসেছে। কাউকে জীবিত, কাউকে বা মৃত পাওয়া গেছে ডাস্টবিনে। জীবিতকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মৃতের যা হওয়ার তাই হয়েছে। পৃথিবীতে মায়ের পেট থেকে জন্ম নেওয়া সবাই কিন্তু আলো-বাতাসের স্বাদ পায় না, স্পর্শ পায় না। তাহলে এভাবে মানব শিশু ডাস্টবিনে পড়ে থাকতেই পারে- এমন ভাবনা কি যুক্তিসংগত? অবশ্যই নয়। যারা পৃথিবীর বুকের আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত তারা তো প্রাকৃতিক নিয়মেই চলে যাবে। কিন্তু কাউকে যদি এভাবে ডাস্টবিনে ফেলে রাখা হয়, হত্যা করা হয়, সেক্ষেত্রে কারা দায়ী? সব দোষ শুধু কর্র্তৃপক্ষকে দিয়ে পার পাওয়া যায় না। এখানে দায়ী একজন মা (প্রচলিত অর্থে শুধু গর্ভে ধারণ করার জন্য তাকে মা বলা, প্রকৃত অর্থে নয়), এখানে দায়ী একজন বাবাও (শুধু জন্মদান অর্থেই বাবা বলা, প্রকৃত অর্থে নয়)। যে শিশুটিকে এভাবে ডাস্টবিনে ফেলে রাখা হয়, সে তো মায়ের পেটে এমনি এমনি আসেনি। তার একজন জন্মদাতা রয়েছে, যেমন একজন গর্ভধারিণীও রয়েছে। যদি তারা স্বামী-স্ত্রী হয়ে থাকেন, তবে তারা এমনটি করতে পারেন কোন বিবেকে? আর যদি তারা স্বামী-স্ত্রী না হয়ে থাকেন, তবে যে গর্ভধারিণী তাকে ধারণ করেছে তিনি কি লোকলজ্জা থেকে বাঁচতে এমনটি করেছেন? যদি তাই হয়, তবে সেই শিশুটি যে দশ মাস দশ দিন তার গর্ভে ছিল, তখন কি তা লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল? হ্যাঁ, ধরে নিলাম লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল কোনো না কোনাভাবে- কিন্তু শিশুটির কোনো পাপ ছিল কি? অবশ্যই কোনো পাপ ছিল না শিশুটির। কারণ শিশুটি তার জন্ম-সংস্কৃতি নিয়েই পৃথিবীতে এসেছে। যে পুরুষ নারী সেই সুখ-পাপ করেছিল তারা দায়ী, শিশুটি নয়। তবে কেন সেই শিশুটিকে এমন পরিণতি ভোগ করতে হবে? জীবিত অবস্থায় ডাস্টবিনে পড়ে থেকে কেন তাকে কাকের ঠোকর সহ্য করতে হবে আর কুকুরের খাবার হতে হবে?
বিবেক পচে গেলে সব কিছুর উত্তর হয় না, কেবল শ্রেষ্ঠ জীবের প্রতি ঘৃণা বাড়ে। বিবেক সতেজ থাকলে এসব চিত্রও দেখতে হয় না। এক্ষেত্রে, আমরা যে সভ্য-সামাজিক মানুষ দাবি করি তার যৌক্তিকতা কোথায়? তাই বলা যায়, সমাজে বাস করলেই, মানুষের মতো হাত, পা, চোখ, মুখ থাকলেই সে কখনো মানুষ দাবি করতে পারে না। কেউ আগে মানুষ না হলে, সে কখনো সামাজিক বা মানবিক হয় না।
যা বলছিলাম, একজন মা কীভাবে পারে তার গর্ভে ধারণ করা শিশুটিকে এভাবে ডাস্টবিনে রেখে যেতে? যে জন্মদাতা সে তো তার সুখ-পাপ করেই চলে গেছে, সে তো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে এখন নিষ্পাপ! কিন্তু যার কাছে, যার গর্ভে শিশুকে রেখে গেছে সে তো মা। তার বুকের দুধ পাওয়া শিশুটির অধিকার। সেই মা কোন পাপে ভর করে এত কঠিন কাজটি করতে পারে? এখানে পুরুষ বা মহিলা উভয়ের সম্মতিতে সুখ-পাপের নিষ্পাপ ফসল এ শিশুটি। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বারাঙ্গনা’ কবিতার ভাষায়-‘সেরেফ্ পশুর ক্ষুধা নিয়ে হেথা মিলে নরনারী যত,/ সেই কামনার সন্তান মোরা! তবুও গর্ব কত!/ শুন ধর্মের চাঁই-/ জারজ কামজ সন্তানে দেখি কোনো সে প্রভেদ নাই।/ অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়,/ অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়।’ এখানে পুরুষের দায়কে অস্বীকার করছি না, তবে যিনি মা হবেন- তিনি তো সন্তানের কাছ থেকে ‘মা’ ডাকটা শুনতে চাইবেন। সে ডাকটা যে কত সুন্দর সেই মা কি সেটা জানেন না? মাকে তো এটা বোঝা উচিৎ যে, একটি শিশুর জন্মের পর তার পিতা না থাকলেও চলে, কিন্তু মা না থাকলে সে শিশুটা বাঁচবে কী করে? এ জন্যই মায়ের প্রতি সব ধর্মই অধিক শ্রদ্ধা-ভক্তির কথা বলে।
পৃথিবীর কোনো মা-বাবা কি সন্তানের কাছে কোনো প্রতিদান চায়? চায় না। যদি প্রতিদান চাওয়াটা রেওয়াজ হতো, তবে কেউ পিতামাতা বা কেউ সন্তান হতো না। সন্তান বড় হয়ে পিতামাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখছে, রাখবেও অনেকে! এই ভয়ে কি কোনো পিতামাতা তার সন্তানকে লালনপালন করা থেকে বিরত থাকে? সন্তানের হাতে পিতামাতা খুন হওয়ার নমুনাও রয়েছে। তাই বলে কি কোনো পিতামাতা তাদের সন্তান জন্ম হওয়ার পরপরই সে সন্তানকে হত্যা করবে? এমনটিও নয়। যদি তাই হতো তবে পৃথিবী থেমে যেত, পৃথিবীতে কোনো মানুষ থাকত না। পৃথিবীতে কেবল দানবরাই বাস করত তখন। শিশু- সে বৈধ হোক আর সুখ-পাপের ফসলই হোক, পৃথিবীর আলো-বাতাস-জল উপভোগের অধিকার তার রয়েছে এবং সে নিষ্পাপ। তাই আর কোনো শিশু ডাস্টবিনে নয়- ওহে গর্ভধারিণী, মা হিসেবে মর্যাদা অর্জন কর। মা হতে পারলে সেলাম পাবে, মা।

লেখক : কলামিস্ট

পিডিএসও/রানা