দুর্নীতি প্রতিরোধে নারী

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৭, ১১:১৯

ইয়াসমীন রীমা

‘নারী’ একটি ছোট্ট শব্দ কিন্তু এর তাৎপর্য আকাশ অথবা সমুদ্র সমান। এক নারী জন্মের পর একজন থেকে ধারাবাহিকভাবে আসে তিন রূপকন্যা, জায়া ও জননী। নারীর এরূপ শাশ্বত, তুলনাহীন। সিমোন দ্য বুভেয়ার ও ভার্জিনিয়া উলফ নারীর অবস্থানকে যথাক্রমে ‘অপর’ ও ‘আয়না’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আজকের দিনে শুধু শিক্ষিত নারীই যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, তাও না। অশিক্ষিত, সুশিক্ষিত নারীরাও ব্যাপকভাবে শিল্প-কারখানা, নির্মাণশিল্পে এবং রাস্তা মেরামত, জমিতে মাটি কাটার শ্রমিকের কাজ করছেন। এর ফলে পরিবারের মধ্যে নারীর ওপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ হাজার হাজার বছর ধরে বজায় থেকেছে, সেটা শেষ না হলেও ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। এই শিথিল অবস্থার সঙ্গে সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন যে সম্পর্কিত, এ নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। নারী-পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রেই পরিবর্তনকে এক ধরনের নীরব বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত চলে।

সভ্যতার বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেও সমাজ তার ‘অর্ধেক আকাশ (নারী)’ সম্পর্কে যথেষ্ট গোড়া ও রক্ষণশীল। তবে আশার কথা হলো—এ রকম প্রতিবন্ধকতার বেড়াজাল ডিঙিয়েও নারীদের একটি অংশ ওঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেদের জায়গা দখল করছেন। কিন্তু সাধারণভাবে পারিবারিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই তাদের অসংখ্য বাধা শুধু ‘মানুষ’ হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার প্রশ্নে নয়, জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত-স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, ইচ্ছা-অনিচ্ছার মতো প্রয়োজনীয় বিষয়ে মতামতের প্রশ্নে। নারীর অধিকার, নারীর ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আজ সময়ের দাবি। জেন্ডার বৈষম্য দূর করা এবং নারীর ক্ষমতায়ন বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম। নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনের বহু বছর পর আজও দেশে দেশে নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যদিও বাংলাদেশের সংবিধান নারীদের ক্ষমতায়ন প্রশ্নে শুরু থেকেই সোচ্চার। সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।’

নারীর ক্ষমতায়ন এবং উন্নয়নে নারীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ বিভিন্ন আইন ও জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা (সংশোধিত-২০১১) প্রণয়নের পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারী শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপসহ ছাত্রীদের জন্য স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে। সম্প্রতি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর ৫০ শতাংশকে উপবৃত্তি প্রদান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে; যার মধ্যে ৪০ শতাংশ ছাত্রী। নারীর স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবায় নারীর অভিগম্যতা নিশ্চিতকরণে গর্ভকালীন স্কিম, মাতৃত্বকালীন ভাতার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কমিটিতে এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় সংরক্ষিত তিনজন নারী এবং উপজেলায় একজন নারী ভাইস চেয়ারম্যানের পাশাপাশি জাতীয় সংসদে রক্ষিত নারী আসন পঞ্চাশে উন্নীত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে নারী স্পিকার নির্বাচন এবং আপিল বিভাগে নারী বিচারপতি নিয়োগ নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বলতম এক দৃষ্টান্ত। নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে চাকরিতে নারী কোটা, অন্যান্য খাতের ন্যায় সেনাবাাহিনীর নন-কমিশন এবং অফিসার পদে নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তি শুরু হয়েছে। নারীর ব্যবসায়িক সম্প্রাসরণের লক্ষ্যে বিনা সুদে ঋণ প্রদান ,আয়কর প্রদানে আয়ের সীমা বর্ধিতকরণ, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রয়াসসহ (জয়িতা) নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

সমঅধিকার ও সমমর্যাদা মানুষের জন্মগত অধিকার। সব পর্যায়ে নারী-পুরুষের সমতা মৌলিক অধিকার এবং একই সঙ্গে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত। তবে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নৈতিক মূল্যবোধের অভাবে সমাজে সুবিধাভোগী এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বৈষম্য প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো নারীকে অবদমন এবং নারীর অধিকার হরণের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাহীন করে তুলছে। ফলে অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ন্যায় নারীরাও আজ দুর্নীতি, অন্যায্যতা আর বিচারহীনতার প্রকট শিকারে পরিণত হচ্ছে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে রুখে দাঁড়াতে পারছেন না।

‘দুর্নীতি’ শব্দটি যখন বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সাংস্কৃতিক অর্থে ‘সমূলে বিনষ্ট হওয়াকে নির্দেশ করে’। বর্তমানে আমাদের সবার কাছে অত্যন্ত পরিচিত দুর্নীতি শব্দটি। কারণ দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রতিনিয়ত দুর্নীতি নামক শব্দটির মুখোমুখি হচ্ছি। সাধারণভাবে বলা যায়, নীতি ও নৈতিকতাবিরোধী যেকোনো কর্মই হচ্ছে দুর্নীতি। যুগের পর যুগ সমাজের আর্থিক, সমাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক অবক্ষয়ের ফলশ্রুতি হিসেবে এ ব্যাধি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ক্রম বিস্তার লাভ করে। দুর্নীতির মানসিকতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি নয়। শিশু জন্মলগ্ন থেকে দুর্নীতির বীজ নিয়ে জন্মায় না, পারিপার্শ্বিকতা ও সামাজিক আচরণই তাকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে। দুর্নীতি কবে কোথা হতে মানবসমাজে এসেছে এবং কালক্রমে শিকড় ছড়িয়ে মহীরূপে পরিণত হয়েছে, তা হয়তো কারো পক্ষেই সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কমবেশি দুর্নীতির প্রচলন অব্যাহত রয়েছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের নিরিখে এ উপমহাদেশে দুর্নীতির বিস্তার দ্রুত ঘটেছে। এ কথা সত্য যে, নিম্ন আয়ের উপার্জনশীল ব্যক্তিদের অনেকেই নিরুপায় হয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নেন। কিন্তু লক্ষ করা যায়, উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী, অর্থশালী ব্যবসায়ীরা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে সমাজকে কলুষিত করছেন। তবে সমাজে এমন শ্রেণির লোকও আছেন, যারা মজ্জাগতভাবেই দুর্নীতিবাজ। ছোটবেলায় পিতা কিংবা অন্যান্য অভিভাবককে যা করতে প্রত্যক্ষ করেছেন, কর্মজীবনে এসে তিনি নিজেও তা করছেন। সংসারে অভাব-অনটন না থাকলেও অভ্যাসগতভাবে তিনি দুর্নীতির নেশায় আবেশিত।

আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক এমনকি সামাজিক পরিবেশ আজ কলুষিত। নীতিহীনতা আজ পাকা আসন নিয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রমূলে। দারিদ্র্য ও অসচ্ছলতা, অফুরন্ত আকাক্সক্ষা, নৈতিক অবক্ষয়, ক্ষমতা লাভের অতিশয্য আমাদের দেশে দুর্নীতির আগমনকে সহজতর করেছে। ভবিষ্যৎ জীবনের নিরাপত্তাহীনতা, সরকারি প্রশাসনে জটিলতা এবং ধর্মের প্রতি আস্থাহীনতাও দুর্নীতি বিকাশের অন্যতম কারণ। দেশের এ দুঃসময়ে দুর্নীতি নামক মারাত্মক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে আমাদেরকে সহায়তা করতে পারেন পরিবারের সচেতন নারীরা। এবার তারাই এ ডুবন্ত নৌকায় হাল ধরতে পারেন। আন্তরিকতার সঙ্গে তারা এগিয়ে এলে দুর্নীতিহনী কলুষমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব হতে পারে। হয়তোবা সব ইতিবাচক ফলপ্রাপ্তি নাও হতে পারে। কিন্তু ক্ষণিকের তরে হলেও দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির বিবেক কিছুটা জাগ্রত হতে পারে এবং স্বীয়হীন কার্যকলাপ সম্পর্কে অনুশোচনা হতে পারে। ফলে এ ব্যক্তির মনে অপরাধ করার প্রবণতা হ্রাস পাবে। যে যাই বলুক সমাজে সৎ হিসেবে বাঁচার একটি স্বতন্ত্র অনুভূতি আছে। যে অনুভূতি ব্যক্তিকে সমাজের সবার সামনে নিজের মাথা উন্নত করে দাঁড়াতে সাহায্য করে। নিজের মনোবল দৃঢ় হয় পরিবার, সমাজ তথা দেশের মাটির সঙ্গে নিজের নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে অবৈধ অর্থের দ্বারা স্থূল সুখ ভোগ করার মধ্যে কোনো গৌরব নেই। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যেকের নিজ নিজ পরিধিতে সুখের সংজ্ঞা খোঁজা উচিত। প্রতিটি পরিবারের মাতা, স্ত্রী, ভগ্নি ও অন্য বয়োজ্যেষ্ঠ নারীরা সমাজ থেকে দুর্নীতি নামক এ বিষফোঁড়া নির্মূল করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারেন, যা নিশ্চিত করে বলা যায়।

দেশ ও সমাজের দুর্নীতিরোধে পরিবারের নারীদের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। পরিবার ও সাংসারিক সঞ্চালক হিসেবে মাতা কিংবা স্ত্রীদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। চাকরিজীবী স্বামীর মাসিক বেতনের অঙ্ক অবশ্যই তার স্ত্রীর অবগত আছে। আর এই মাসান্তে বেতনের অর্থ দিয়ে পরিবার ও সাংসারিক যাবতীয় খরচাদি করতে হয়। এতে দুজনের শলাপরামর্শ বিদ্যমান থাকে। গৃহকর্তার রোজগার অনুয়াযী গৃহকর্ত্রীকে সব ব্যয় নির্বাহ করতে হয়। তবে প্রায় মানুষই স্বাচ্ছন্দ্যতায় পরিবার ও এর সদস্যদের নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে চায়। তাই বলে স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য দেশ ও জাতির সম্পদকে কুক্ষিগত করে তো অবশ্যই নয়। এ ক্ষেত্রে নারীরা তাদের পিতা, স্বামী, ভ্রাতা কিংবা রোজগারশীল সন্তানকে সুপরামর্শে দুর্নীতি নিরাশ্রয় পরিচালিত করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমে অগ্রগণ্য শিক্ষিত নারীদের ভূমিকাই ফলপ্রসূ হতে পারে। স্বামী কিংবা সন্তানদের অবৈধ অর্থ উপার্জনের অদম্য ইচ্ছাকে পুরো অংশে তারাই দমিত রাখতে পারেন। পরিবারে এমন অনেক বিলাসিতা প্রিয় নারী রয়েছেন, যারা প্রত্যহ বিলাসময় জীবনযাপনে বিশ্বাসী। কর্তাব্যক্তিটির সীমিত উপার্জনের দিকে দৃকপাত করেন না। নিত্য চাহিদা মুখে উপার্জনশীল কর্তাব্যক্তিটিকে ফরমায়েশ পালন করতে হয়। এমন কু-মানসিকতাসম্পন্ন নারীদের আকাক্সক্ষা ও বিপুল চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তাকে বেছে নিতে হচ্ছে দুর্নীতির পথ। ইচ্ছার বিরুদ্ধে করতে হচ্ছে অপরাধ, অন্যায়মূলক কাজ। বিসর্জন দিতে হচ্ছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। জড়িয়ে পড়ছেন দুর্নীতির বলয়ে। সংসারের স্ত্রী-মাতা, স্বামী-সন্তানের কিংবা উপার্জনশীল ব্যক্তির আয়ের উৎসের কথা না ভেবে কেবল নিজের প্রয়োজনীয়তাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন তারা আর যাই হোক সমাজ ও দেশের জন্য শুভাকাক্সক্ষী হতে পারে না। তাদের সমষ্টিগত ভূমিকাই আমাদের সমাজকে ক্রমে ক্রমে বিনষ্টের পথে অগ্রগামী করছে। সামাজের দুর্নীতি রোধকল্পে স্বামী কিংবা সন্তানকে সতর্ক করা ছাড়াও নারীদের সংসারে বিকল্প আয়ের উৎসের ব্যবস্থা নিয়ে সংসারে খানিকটা হলেও সচ্ছলতা নিয়ে আসতে পারে। তাতে এ দুর্মূল্যের দিনে পরিবারের কর্তার মানসিক স্বস্তিটা কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে। পাশাপাশি দুর্নীতিরোধে সহায়ক হবে।

ডিএসও/হেলাল