ফেসবুক : কী দিচ্ছে কী নিচ্ছে

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৭, ১১:৩৬ | আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৭, ১১:৪২

এ এফ এম ফৌজি চৌধুরী

আজকের যুগ তথ্যপ্রযুক্তির। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ফসল ফেসবুক, টুইটার, লিঙ্কেডিন এবং আরো কত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মাধ্যমগুলো আমাদের খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তাজা খবরসমূহ পৌঁছে দেয়। শুধু সংবাদই নয়, এর মাধ্যমে স্থির চিত্র বা ধারণকৃত ভিডিও পাঠানোও খুব সহজলভ্য। আগেকার দিনে একটি পোস্টকার্ড, এনভেলাপ, টেলিগ্রাম বা ওয়্যারলেস ব্যবস্থাই ছিল মানুষের যোগাযোগের বড় মাধ্যম। এখন দেশে বা বিদেশে মোবাইল ঘোরালেই আপনজনের সঙ্গে কথা বলা খুব সহজ। মোবাইলেও রয়েছে নানা ধরনের কম খরচের ব্যবস্থা ইমো, ভাইবার, ওয়াটসঅ্যাপ, স্কাইপ ও টুইটারসহ আরো কত উন্নত ব্যবস্থা।

মানবকল্যাণে, দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে যত সহজতর প্রযুক্তি সুবিধা মানুষ পাবে তাকে স্বাগত জানাতেই হবে। এখন জরুরি প্রয়োজনে এক নিমিষেই কথা হয় মোবাইলে বা ই-ফোনে। ফেসবুক নিয়ে পারিবারিক বা সামাজিক দায়িত্ব অবশ্যই একটি বড় দিক। পারিবারিক পরিবেশ যত সুন্দর হবে এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ যত বেশি সুন্দর ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসবে, ততই ফেসবুকের কল্যাণ সাধিত হবে। বুদ্ধি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কোমলমতি ছেলেমেয়েদের ভালো-মন্দ বিষয় নিয়ে তাদের অভিভাবকদেরই বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট মানুষকে নেতিবাচক অনুভূতিও দিচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইনে অন্য বন্ধুদের সুখী জীবন দেখে অনেকে ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়েন। ফেসবুকের লাইক পাওয়ার আশা এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে আশানুরূপ লাইক না পেলে অনেকে বিচলিত ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যরা বেশি লাইক পেলে ৪২ শতাংশ মানুষ ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ে। রাশিয়ার অ্যান্টিভাইরাস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কি ল্যাব বিশ্বের ১৬ হাজার ৭৫০ ব্যক্তিকে নিয়ে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে।

ওই সমীক্ষার ফল অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে। গত ২৮ জুন ফ্লোরিডার বাসিন্দা মাকেভা জেনকিনস তার ফেসবুকে গৃহহীন অবস্থা থেকে কঠিন পথ পেরিয়ে কোটিপতি হওয়ার সাফল্যের কথা লেখার এক দিন পরই রাতে তার বাড়িতে ঢুকে তাকে খুন করল এক মুখোশধারী। সঙ্কল্প ও দৃঢ়তা থাকলে যে কারো পক্ষেই কোনো কাজ অসম্ভব নয়। এ পোস্ট লেখার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘনিয়ে আসে তার মৃত্যু। ফেসবুকে রোজগারের কথা ঘোষণা করেই হয়তো নিজের বিপদ ডেকে এনেছিলেন জেনকিনস।

মানুষের জন্ম হয়, মৃত্যু হয়-এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। মানুষ যতই অমরত্বের পেছনে ছুটুক না কেন, শেষমেশ অমরত্ব আর মেলে না। মানবদেহ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিলীন হয়ে গেলেও শুধু রয়ে যায় ওই ব্যক্তির কাজ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই প্রযুক্তিবান্ধব সময়ে মানুষ মরলেও রয়ে যায় তার সাধের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি। যতদিন বাড়ছে ততই ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। আর স্বাভাবিক মানবমৃত্যুর কারণে বাড়ছে মৃত মানুষদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা। ফেসবুক তাই ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে মৃত মানুষদের ডিজিটাল গোরস্তানে। ২০০৪ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির যাত্রা শুরু হয়।

জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ২০০ কোটি ব্যবহারকারীর মাইলফলক ছুঁয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ এখন ফেসবুক ব্যবহার করে। ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টের মাধ্যমে এ তথ্য জানিয়েছেন। ২০১২ সালের অক্টোবরে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০০ কোটি ছাড়িয়েছিল। এরপর পাঁচ বছরে ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্বিগুণ হলো। এদিকে, এত ব্যবহারকারী পেয়েও সন্তুষ্ট নন মার্ক জাকারবার্গ! ইউএসএ টুডেতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ২০০ কোটি ছাড়ালেও আমরা এখনো সবাইকে সংযুক্ত করতে পারিনি। সবচেয়ে যে বিষয়টি তিনি বলেন, তা হলো সবাইকে সংযুক্ত করা।

হ্যাঁ, বিশ্বের সবাই ফেসবুকে সংযুক্ত হবে। কিন্তু আমাদের এও জানতে হবে যে, ফেসবুকে বাড়ে বিষণ্নতা। যারা দীর্ঘক্ষণ ফেসবুকে অপরের পোস্ট করা ছবি দেখে সময় কাটান, তাদের ব্যক্তিজীবনে বিষণ্নতা বৃদ্ধি পায়। নানা রকম বিতর্ক, খুনসুটি; রসালো মন্তব্য, ফটো মন্তব্য, ফটো ব্যানার, কত কিছুই না হচ্ছে ফেসবুকে। ঈর্ষা, হিংসা, বিদ্বেষও কম ছড়াচ্ছে না ফেসবুকের মাধ্যমে। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মাইল দূরত্ব এখন ঘুচে গেছে ফেসবুকের বদৌলতে। পেশা জীবনের নিশ্চয়তা, বিচ্ছেদ ইত্যাদি নানা কারণে অনেকেই দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। এক পর্যায়ে কারো কারো মনে হয়, কী পেলাম এই বিদেশে এসে। এখানে কাউকে কিছু দেখানোর নেই। সব দেখানোর জায়গা সেই নিজের দেশে। নিজের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এদের দেখাতে না পারলে মনের শান্তি কোথায়? কিন্তু এখন যে যেখানেই থাকুক না কেন একটা সেলফি ক্লিক করে ফেসবুকে আপলোড করে দিলেই ফেসবুকের সব শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুরা, আত্মীয়-স্বজনরা তার অবস্থানরত, জায়গাটি জানতে পারছে। সঙ্গে লাইক, কমেন্ট দিয়ে জানান দিচ্ছে যে, তুমি যেখানেই থাক না কেন আমরা আছি তোমার পাশে। এমনটা হয়। ফেসবুকাসক্তদের মনে সেই আক্ষেপ-অনেকেরই লাইক, কমেন্ট পাওয়া খুবই কষ্টের। ফেসবুকাররা শাইলকের চেয়েও কৃপণ ও নিষ্ঠুর। ভাগ্যিস ফেসবুক ডিসলাইক অপশন এখনো চালু করেনি।

এই সময়ের প্র্যাকটিসিং মনোরোগ চিকিৎসকরা অনেকেই বলছেন, অতিরিক্ত ফেসবুকাসক্তি এখন মনোরোগে রূপ নিতে চলেছে। এমন অনেকের মুখোমুখি হচ্ছি এখন-মধ্যরাত, শেষ রাত অবধি মেতে রয়েছে ফেসবুক নিয়ে। ফেসবুক মানুষের অতি প্রিয় ঘুমটাকেও এখন কেড়ে নিয়েছে। মানুষ এখন ঘুমানোর সময় ফেসবুক চালায় আর কাজের সময় ঘুমায়। পাশে স্বামী বা স্ত্রী ঘুমাচ্ছেন। অন্যজন তখন আলো নিভিয়ে হাতে ট্যাব, আইপ্যাড বা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ফেসবুকে। সর্বশেষ যে ছবি বা স্ট্যাটাস দিয়েছেন, সেটায় কে কে আরো লাইক দিল সেটার খোঁজে ব্যস্ত মানুষ। কেউ প্রশংসা বা টিটকিরি দিলে চটজলদি প্রতিক্রিয়া জানাতে হবেই। মানুষ তার মনের জটিলতাকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করে। কেউ তাকে অস্বীকার করে। কেউ মনের মাঝে তালাবন্দী করে চেপে রাখে। আবার কেউ নিজের মনের অস্থিরতা, জটিলতা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে কথা বলে। কেউ ঝি-কে মেরে বউকে শেখানোর মতো পথও বেছে নেয়। সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সভ্য প্রমাণের জন্য মনের কুটচালের বিষয়গুলো ছবি, গল্প, উপন্যাসের মাধ্যমে প্রকাশ করে।

দীর্ঘক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলে এবং সে সময় শুধু অপরের পোস্ট কিংবা ছবিগুলোতে ঘুরে বেড়ালে মনে হিংসার উদ্রেকও হয়। আর পরবর্তী সময়ে জীবনে নেমে আসে বিষণœতা। ডেনমার্কের গবেষকরা এক গবেষণায় এক হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী বেছে নিয়েছিলেন যাদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী। এদের মধ্যে অর্ধেক ব্যক্তিকে বলা হয় ফেসবুক ব্যবহার চালিয়ে যেতে, আর বাকি অর্ধেককে লগইন করতে মানা করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, যারা ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের কার্যক্রমে ঈর্ষান্বিত হন, তাদের ক্ষেত্রে ফেসবুক ব্যবহার থেকে বিরত থেকে বিষণœতা কমার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার আমাদের জীবন নিয়ে আত্মতুষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে মানুষের মধ্যে অবাস্তব আর্থ-সামাজিক তুলনা করার মানসিকতা বৃদ্ধি পায়। প্রতিদিন ফেসবুকে লাখো ঘণ্টা ব্যয় হয়। কিন্তু এই সংযুক্ততা কি আমাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে এনেছে। ফেসবুকে সক্রিয়ভাবে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার মানসিকতা মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে। কিন্তু যারা নীরবে অন্যের পোস্ট দেখে সময় কাটান, তাদের প্রতি রয়েছে সতর্কবাণী।

আজকের এই যুগে ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জীবনকে সহজ থেকে সহজতর করে দেওয়ার প্রচেষ্টা। বিশাল বিশ্ব এখন আমাদের ক্ষুদ্র হাতের মুঠোয়। আর এ কারণেই বর্তমানে ছেলেমেয়ে লালন-পালনের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের চিন্তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে নতুন বিষয় ইন্টারনেট ও ফেসবুক। মা-বাবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন ছেলেমেয়েরাও সময়ে-অসময়ে ব্যবহার করছে ইন্টারনেট। এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা হোক অথবা পারদর্শিতা, বড়দের চেয়ে কোনো দিক দিয়েই পিছিয়ে নেই ছেলেমেয়েরাও। এগুলো ব্যবহার করে বিভিন্ন ভুল তথ্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক শিশু-কিশোর-তরুণ নিজেদের ঠেলে দিচ্ছে নানা অন্যায়-অপকর্মের দিকে। যার ফলে তারা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে নৈতিকতা-মূল্যবোধ থেকে।

আমরা যেন ফেসবুক বা ইন্টারনেটকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করে দেশকে বা দেশের মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা বা বিপদের হাত থেকে রক্ষার কাজে এগিয়ে নিতে পারি। এটাই হোক আমাদের শপথ।

পিডিএসও/হেলাল