দুঃসময়ের ঈদ...

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২০, ১০:৫৪

ড. শাহনাজ পারভীন

ঈদ অর্থ আনন্দ। ঈদ অর্থ খুশি। অথচ সেই আনন্দ, সেই ঈদ যদি আসে পৃথিবীময় দুঃসময়ে, তখন তা আর আনন্দের বিষয় থাকে না। তা হয়ে যায় যেকোনো একটি সাধারণ দিন—বর্তমানের মতো। যেখানে সূর্য উঠলেই তাকে আমরা দিন বলতে পারি না, চাঁদ হাসলেই তাকে আমরা রাত বলতে পারি না। দিন যেখানে দিন নয়, রাত যেখানে রাত নয়, সময় যেখানে সময় নয়, আটকে আছে ঝিনুকের খোলের মধ্যে, সেখানে আর ঈদ কী? যেখানে আমাদের ঘুম ভাঙছে আতঙ্ক, দুঃসংবাদ আর মহামারির মৃত্যু সঙ্গে নিয়ে, যেখানে একটি দিন সুস্থভাবে যাপন করতে পারাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার, মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। সেইখানে আবার ঈদের প্রসঙ্গ কেন?

তারপরও এই মহামারি, এই আতঙ্ক, এই মৃত্যুকে নিয়েই আমাদের দিন গড়িয়ে যাচ্ছে, রাত নেমে আসছে পৃথিবীতে। ১ আগস্ট সারা দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হবে। অন্যবারের মতো এবার আর মহাবিশ্বের আকাশে-বাতাসে ঈদের আনন্দে মুখরিত হবে না, মুখরিত হবে না মন ও মননে। সকলেরই আত্মিক এবং মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। অবনতি ঘটেছে অর্থনৈতিক। অন্যসব বিগত দিনের মতো এবার হয়তো অনেকেই কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। নেই হাসি আনন্দ।

এ বছর পবিত্র হজব্রত পালনেও একই অবস্থা। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি ফরজ ইবাদত হজ। হজের শাব্দিক অর্থ ‘জিয়ারতের সংকল্প’। মহান আল্লাহ সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলমানরা পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ বা জিয়ারতের সংকল্প নিয়ে ছুটে আসেন বলেই এর নাম ‘হজ’। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন, ‘এতে রয়েছে মাকামে ইব্রাহীমের মতো প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ ঘরের হজ করা হলো মানুষের ওপর মহান আল্লাহর প্রাপ্য, যে লোকের সামর্থ্য রয়েছে এ পর্যন্ত পৌঁছার। আর যারা অস্বীকার করবে (তাদের স্মরণ রাখা উচিত) মহান আল্লাহ বিশ্ববাসীর মুখাপেক্ষী নন’। (আল কোরআন, ২:৯৭)

প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে মহান আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম আ. পবিত্র হজের প্রবর্তন করেন। মহান আল্লাহ হজরত জিব্রাইল আ.-এর মারফত তাকে হজের সব আহকাম সম্পর্কে অবহিত করেন। ইব্রাহিম আ. তার পুত্র ইসমাঈল আ.-কে নিয়ে পবিত্র কাবাঘর সাত বার তাওয়াফ করেন, চুম্বন করেন হাজরে আসওয়াদ এবং একে একে সম্পন্ন করেন পবিত্র হজের সব আহকাম। এরপর মহান আল্লাহর নির্দেশ এলো, বিশ্ববাসীকে হজের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

হজরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, ‘যখন ইব্রাহীমকে হজ্ব ফরজ হওয়ার কথা ঘোষণা দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়, তখন তিনি মহান আল্লাহর কাছে আরজ করেন—‘এটা তো জনমানবহীন প্রান্তর। এখানে ঘোষণা শোনার মতো কেউ নেই। যেখানে ঘনবসতি আছে, সেখানে আমার আওয়াজ কীভাবে পৌঁছবে?’

মহান আল্লাহ তখন বললেন, ‘তোমার দায়িত্ব শুধু ঘোষণা দেওয়া। সারা বিশ্বে পৌঁছনের দায়িত্ব আমার।’ এ কথা শুনে হজরত ইব্রাহীম আ. তখন মাকামে ইব্রাহীমে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন। মহান আল্লাহ তা উচ্চ করে দেন।’ কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, তিনি আবু কুবায়েস পাহাড়ে আরোহণ করে ঘোষণা দিয়েছিলেন। বর্ণিত আছে, মহান আল্লাহ ইব্রাহিম আ. এর সেই আহ্বান জড়জগতের সীমা অতিক্রম করে রুহানি জগতে গিয়ে পৌঁছেছিল এবং লাব্বাইক বলে যেসব রুহ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল মহান আল্লাহ চান তো, কিয়ামত পর্যন্ত তারাই পর্যায়ক্রমে আরাফাতের প্রান্তরে সমবেত হবে।’এরপর থেকে নবী রাসুল পরম্পরায় চলে আসছে হজব্রত পালনের বিধান। হজরত মুহাম্মদ সা. সামর্থ্যবান মুসলমানদের ওপর হজ্ব অবশ্য পালনীয় বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আমাদের উচিত, হজ ফরজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পালন করা। বলা তো যায় না, ভবিষ্যতের সময় আমাদের জন্য কীভাবে অপেক্ষা করছে। এ বছর আমার কলিগসহ বেশ কয়েকজন পরিচিত আত্মীয়জন পবিত্র হজব্রত পালনের জন্য রেজিস্ট্রেশন করা সত্ত্বেও হজে যেতে পারলান না।

প্রতি বছর পঁচিশ থেকে ত্রিশ লাখ হাজির উপস্থিতিতে হজব্রত পালন হলেও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এ বছর গ্লোবাল পেন্ডামিকের কারণে স্বল্প পরিসরে মাত্র দশ হাজার মুসল্লিকে নিয়ে শুরু হয়েছে হজের আনুষ্ঠানিকতা। প্রতি বছর বাসায় কোরবানি হয়। অনেক লোকজন আসে, কোরবানি করাসহ আনুষঙ্গিক কাজ করে তারা। তাদের নিজ হাতে রান্নাবান্না করে খাওয়াই। খুব ভালো লাগে, এক স্বর্গীয় আনন্দে মনটা ভরে থাকে। মেয়ে, জামাই, নাতি, দেবর, জাসহ সবাই আসে ঈদ করতে। কিন্তু সময় পাল্টেছে। গত ঈদুল ফিতরের মতো এবারও ঈদ আসবে কিন্তু ঈদের চাঁদ উঠবে না ঘরে। জানি না, কত দিন পৃথিবী এভাবে থমকে থাকবে। হে মহান আল্লাহ! তুমি সব ঠিক করে দাও, পৃথিবীকে সুস্থ করো আগের মতো। এরই মধ্যে আমরা অনেক আপনজনকে হারিয়েছি, অসুস্থ রয়েছে অনেকেই। প্রতিদিন নতুন নতুনভাবে আক্রান্ত হচ্ছে বিশ্বময়।

আশা করছি, খুব শিগগিরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা, অফিস-আদালত চলবে আগের মতো। নিকট অতীতেই কোভিড নাইনটিনের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবে। দিন ফিরে পাবে তার কলহাস্য। হইহুল্লোড়, আনন্দ-আমেজে ফিরে যাবে ঈদ তার আপন বৈশিষ্ট্যে।

লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল