সিয়াম সাধনায় জেগে ওঠে ভ্রাতৃত্ববোধ

প্রকাশ : ০৩ মে ২০২০, ০৯:৪০

মাওলানা মাসউদুল কাদির

আজ রোজার নবম দিন। রমজানুল মোবারক ভ্রাতৃত্বেরও ছায়াদার এক বৃক্ষ। একজন বন্ধুর কাছে যেমন জীবনের চলার পথে ছায়া পাওয়া যায়, তেমনি সিয়াম সাধনায়ও বন্ধুত্ব রক্ষা বা ভ্রাতৃত্ববোধ জেগে ওঠে। কারণ সিয়ামে কাউকে কষ্ট দিতে মানা, কারো ওপর জুলুম করতে মানা। কেবল সহানুভূতির পসরা মেলেই সিয়াম সাধনায় মগ্ন হতে হয়। তাই ভ্রাতৃত্ববোধ সুসংহত থাকার মাসই রমজান।

মাহে রমজানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এ মাসের মূল অবদান ও পুরস্কার হচ্ছে পরকালীন জীবনকেন্দ্রিকতা। ‘তাকওয়া অর্জন, নেক আমলের বহুগুণ সওয়াব পাওয়া, ক্ষমাপ্রাপ্তি, জান্নাত লাভ, দোজখ থেকে মুক্তি, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান প্রাপ্তি’ সবই রোজাদার মুমিন বান্দাদের জন্য আখেরাতের কামিয়াবির একেকটি স্তর।

কিন্তু রমজান ও রোজার বিভিন্ন আমল-ইবাদত ও করণীয় দেখলে এটাও বোঝা যায়, ইহজীবনেও এসবের বিরাট প্রভাব রয়েছে। কোনো কোনো আমলের বিষয়ে হাদিস শরিফেও ইহকালীন সুফলের কথা বিবৃত হয়েছে। যেমন বেশি দান-খয়রাত করা, অপরের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা, অপরকে ইফতার করানো, ঝগড়া-বিবাদ না করা, মিথ্যাচার ও অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকা ইত্যাদি।

মূলত এসব পার্থিব বা ইহকালীন সদাচার ও সাফল্য আখিরাতের কামিয়াবিরই বিভিন্ন উপায় বা সিঁড়ি। এজন্যই পুণ্য ও মুক্তির ইবাদত রোজার পূর্ণতার সঙ্গে এসব পার্থিব সদাচারের আমলগুলোও যুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটা ইসলামের সামগ্রিকতারই বৈশিষ্ট্য।

আইয়ামে বিজের রোজার ক্ষেত্রে নবীজীর ভাষ্য শুনে এ কথাই প্রতিয়মান হয় যে, হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয়, অন্তরঙ্গ ভালোবাসা অর্জন করা চাই। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, সবরের মাসের (রমজান) এবং প্রতি মাসের তিন দিনের (আইয়ামে বিজ) রোজা অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়। (মুসনাদে বাযযার, মুসনাদে আহমাদ)

এছাড়াও রোজার সামগ্রিক সংযমচিত্র এবং রোজার অধিকার ও শর্তগুলো খতিয়ে দেখলেও এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, একজন প্রকৃত রোজাদারের সঙ্গে, একজন পূর্ণাঙ্গ সিয়ামসাধকের সঙ্গে হিংসা বা ঘৃণার কোনো সম্পর্ক নেই। রোজাদারের হৃদয়ের ঈমান, মানুষ ও দেশের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন কারো প্রতি বিদ্বেষ থাকার সুযোগ নেই। বরং ব্যাপক ভ্রাতৃত্বের প্রতি টান, বন্ধন ও প্রেরণাই রোজার মৌল আবেদন।

মাহে রমজানের রোজা সম্পূর্ণভাবেই আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত ত্যাগ, ধৈর্য ও ক্লান্তিসাপেক্ষ একটি ইবাদত। স্বভাবতই অন্যকে ব্যথিত না করার নির্দেশ, কলহ-বিবাদ এড়িয়ে যাওয়ার আদেশ, রোজাদারকে ইফতার করানোর পুরস্কার ঘোষণা, দরিদ্র মানুষের প্রতি সহায়তা করার প্রেরণা এবং রমজানের শেষে সদকাতুল ফিতর আদাইয়ের বিধান মুমিনকে আরও বেশি বন্ধুবৎসল করে তোলে। সবগুলোই বাহ্যিক ফলাফলের দিক থেকে পরিপূর্ণ মানবিক এবং ভ্রাতৃত্ব-জাগানিয়া আমল। তাই রোজার শিক্ষা ও চেতনার একটি বড় দিগন্ত হচ্ছে হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতিশোধ পরিহার। রোজার শিক্ষা হলো, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন নির্মাণ।

রোজায় মূলত সংযত মুমিনের যে ভূমিকা, তাতে অন্যের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যখন বিবাদ কম হয়, গিবত কম হয়, পরশ্রীকাতরতা থেকে মানুষ বেঁচে থাকে, তখন নিজের অজান্তেই মানুষ অন্যের প্রতি টান অনুভব করে। ভালোবাসা ও হৃদ্যতা উপলব্ধি করে। প্রেমময়তার চাদরে গোটা সমাজই যেন মুড়িয়ে যায়। বন্ধুত্বের এ রেশ সারা বছর টেনে নিয়ে যেতে পারলে গোটা সমাজই উপকৃত হবে নিঃসন্দেহে।

লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক