মহিমান্বিত শবেবরাতে করণীয়

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২০, ১৪:৩৭

মুহাম্মাদ আবদুল হামিদ

শবেবরাত একটি মহিমান্বিত রজনি। এ রাতে আল্লাহতায়ালা তাঁর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন, পাপী বান্দাদের উদারচিত্তে ক্ষমা করেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এজন্য এ রাতকে শবেবরাত বলা হয়। হাদিস শরিফে এ রাতটিকে ‘নিসফে শাবান’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রজনি তথা ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রি। মুসলিম উম্মাহর কাছে এ রাতটি খুবই গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ।

শাবান মাস হলো বিশেষ মর্যাদাবান। মোবারক মাহে রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে এ মাসটি। রমজানের প্রস্তুতির জন্য এ মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) এ মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদত করতেন। অন্যান্য মাসের চেয়ে এ মাসে নফল রোজা বেশি রাখতেন। হজরত আয়শা সিদ্দিক (রা.) বলেছেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা রাখতে দেখিনি। কিন্তু তিনি শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রেখেছেন।’ (সহি মুসলিম)।

এ মাসের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান হলো উম্মতের মাস। রাসুল (সা.) রজব, শাবান মাসের অত্যাধিক গুরুত্ব ও তাৎপর্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শা’বান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান” এ দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন এবং উম্মতকে পড়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। যার অর্থ হচ্ছে, ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে রজব ও শাবানের সব বরকত দান করুন এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ এ মাসে রয়েছে বিশেষ ফজিলতময় শবেবরাত।

বিভিন্ন হাদিসে শবেবরাতের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হজরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করেন, কোনো এক শাবানের অর্ধরাতে রাসুল (সা.)-কে বিছানায় পাওয়া যাচ্ছিল না। খুঁজে দেখা গেল তিনি জান্নাতুল বাকিতে কবর জিয়ারত করছেন। (সহি মুসলিম)।

আরেক হাদিসে হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন অর্ধ শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে ইবাদত করো এবং পরের দিনটিতে রোজা রাখো। কেননা এ রাতে আল্লাহতায়ালা সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো রিজিকপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দান করব। কোনো বিপদগ্রস্ত আছে কি? আমি তাকে বিপদমুক্ত করব। আর সুবহে সাদিক পর্যন্ত এ ডাক অব্যাহত থাকে। (ইবনে মাজাহ)।

হজরত ইকরিমা (রা.)-সহ প্রমুখ তাফসিরবিদের মতে, আল কোরআনে সুরায়ে দোখানের প্রথম আয়াতগুলোতে শবেবরাতের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় এ রাতকে ‘লাইলাতুসসফ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং এর বরকতময় হওয়া ও রহমত নাজিল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কেউ কেউ শবেবরাত সম্পর্কিত কিছু হাদিসকে দুর্বল বলে একেবারেই অস্বীকার করে ফেলেন। এটা মোটেই উচিত হবে না। কারণ, একই বিষয়ে একাধিক হাদিস বর্ণিত হলে এর গ্রহণযোগ্যতায় আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় শবেবরাতের বরকত ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। ঢালাওভাবে সবগুলো হাদিসকে দুর্বল বলে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া হাদিস শাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী ফজিলতের হাদিসগুলো দুর্বল হলেও পালনযোগ্য।

মুসলিম উম্মাহর তিনটি স্বর্ণোজ্জ্বল যুগ তথা সাহাবা, তাবেইন ও তাবে তাবেইনের যুগেও এ রাতের ফজিলত থেকে উপকৃত হওয়ার বিশেষ গতি ও গুরুত্ব ছিল। সেই যুগের মানুষরাও এই রাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত-বন্দেগি করেছেন। এ রাতটি বিশেষ ফজিলতময় ও গুরুত্ববহ। তাই এ রাতে দীর্ঘক্ষণ জেগে থাকা ও ইবাদত করা সওয়াবের অছিলা হিসেবে গণ্য হবে নিঃসন্দেহে।

শবেবরাত বিশেষ ফজিলতময় হওয়ায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হন। নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ পাঠ, জিকির-আজকার, তাওবা-ইস্তেগফার করে নিজেদের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করেন এবং তাদের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন।

অধিক নফল নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত করা, তাসবিহ পড়া, দোয়া করা; এসব ইবাদত এই রাতে করা যায়। কোনো কোনো হাদিসের আলোকে শাবান মাসের ১৫ তারিখ অর্থাৎ বরাত রজনির পরের দিন নফল রোজা রাখা অনেক সওয়াবের কাজ।

এই রাতে আরেকটি বিশেষ আমল রয়েছে, যা একটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তা হলো, রাসুল (সা.) এই রাতে একবার জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন। যেহেতু রাসুল (সা.) জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন এই রাতে, তাই মুসলমানরাও এই রাতে কবরস্থানে যাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। নবী (সা.) থেকে যে কাজটি যেভাবে এবং যে স্তরে প্রমাণিত, সেটাকে সে স্তরে রাখাই বাঞ্ছনীয়। সেই সীমারেখা অতিক্রম করা কিছুতেই উচিত নয়। এই রাতের বিশেষ কোনো ইবাদত ও ইবাদতের বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। নেই নামাজের কোনো নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা, নেই ভিন্ন কোনো পদ্ধতি। এই রাতে যেসব ইবাদত করা হবে সবই নফল ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। আর নফল ইবাদত নীরবে আপন আপন ঘরে একাগ্রচিত্তে করা উত্তম।

এসব ইবাদতের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু এবারের পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় কবরস্থান ও মসজিদে না যাওয়াটাই বেশি সওয়াবের কাজ হবে বলে আশা করা যায়। যেখানে ফরজ নামাজের জন্যই মসজিদে গমন না করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে, সেখানে নফল ইবাদতের জন্য মসজিদে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাই মৃত আত্মীয়-স্বজন ও মুসলিম মরহুম-মরহুমাদের জন্য ঘরে বসেই দোয়া করা উত্তম হবে। এবারের শবেবরাতে আমাদের আল্লাহর কাছে একটা চাওয়া হোক, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সবাইকে করোনা নামক এই মহামারি থেকে যেন রক্ষা করেন। আমিন।

লেখক : ইসলামি চিন্তাবিদ

পিডিএসও/তাজ