আসুন মানসম্পন্ন বই কিনি

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০:০৮

সাহাদাৎ রানা

‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।’ প্রথিতযশা সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর বিখ্যাত উক্তি। এর সহজ-সরল অর্থ বই মানুষকে কখনো দেউলিয়া করে না। বরং বই মানুষকে সমৃদ্ধ করে। সত্যিকার অর্থে বই-ই মানুষের প্রকৃত বন্ধু। কারণ একজন মানুষ জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে নিজেকে জানার পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারেন। আর সেই জানার মাধ্যমে নিজেকে নিজে তৈরিও করে নেন। এসব কিছু সম্ভব হয় শুধু একটি ভালো বই পড়ার মাধ্যমে। তাই জ্ঞান আহরণে ভালো বইয়ের কোনো বিকল্প নেই।

বই নিয়ে এত কথা বলার কারণ এখন চলছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে চলছে প্রাণের এই বইমেলা। যে মেলাকে কেন্দ্র করে লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে বইমেলা। বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। প্রতিবারের মতো এবারও সেই আমেজ চলছে। বলা যায়, প্রতি বছরই বইমেলার প্রতি মানুষের আগ্রহ দিনকে দিন বাড়ছেই।

নির্দিষ্ট কোনো বয়সের মানুষ শুধু এখন আর বইমেলায় যান না। সব বয়সি মানুষই বইমেলামুখী। এটা একটা ইতিবাচক দিক একটি জাতির জন্য। কেননা, বই পড়ার মাধ্যমে জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে আরো অগ্রসর হয়ে এগিয়ে যাবে সামনে। পাঠকদের আগ্রহের কারণে কয়েক বছর আগে বইমেলার পরিসরও বাড়ানো হয়েছে। এটা মানুষের বইমেলার প্রতি আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। এ কারণে দেশের প্রকাশক, লেখক ও পাঠকরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন এই সময়টার জন্য। এখন শিশুদের মধ্যেও বইমেলা নিয়ে বিশেষ আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য আলাদা চত্বর ভালো উদ্যোগ।

ব্যস্ত নগরবাসী তাদের সময় কাটার জন্য এখন বইমেলাকে বেছে নেয়। এ কারণে এখানে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের মিলনমেলাও বটে বইমেলায়। তবে এখানে একটি তথ্য প্রকাশকদের কিছুটা হতাশ করছে। কেননা, যে পরিমাণ মানুষের উপস্থিতি মেলায় ঘটে; সে তুলনায় বই বিক্রি হয় না। অনেকে এখন বইমেলায় যাওয়া শুধু ফ্যাশন হিসেবে মনে করেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে যা অনেকাংশে সত্যি। আমাদের তরুণ প্রজন্ম বইমেলায় যাওয়ার সংখ্যা বাড়ছে, এটাও সত্যি। কিছু বইও কেনেন তারা। তবে তরুণ প্রজন্মকে বই আরো বেশি কেনার বিষয়ে উৎসাহিত করতে হবে। কেননা, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এখন বইয়ের চেয়ে মোবাইল, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও ফেসবুকে নিজেদের বেশি ব্যস্ত রাখে। এমন ব্যস্ততার মাঝে যেন বই পড়ার সময় নেই তাদের। তবে মোবাইল, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও ফেসবুকের প্রতি এমন আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে তরুণ প্রজন্মকে। কেননা, তারাই আগামীর ভবিষ্যৎ। কারণ বই না পড়লে নিজেকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে তারা নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে না।

এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বাড়তি কিছু দায়িত্ব রয়েছে। তাদের কাজ হবে তরুণরা যেন নিয়মিত বই পড়েন; সে বিষয়ে তাদের উৎসাহিত করা। বইমেলা উপলক্ষে তাদের নির্দিষ্ট কিছু অর্থও দিতে হবে, যেন সেই অর্থ দিয়ে বই কেনেন। তবে সব বই কিনলে হবে না। যে বইয়ের মাধ্যমে সে নিজেকে আলোকিত করতে পারবে, সেই বইটি বেছে নিতে হবে তাকে। তবে এখানে আমাদের কিছু ব্যর্থতাও রয়েছে। যে ভাষার মাসে বইমেলা হয়, সেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে বইমেলায় বই কিছুটা কম। এটা শুধু মাতৃভাষার ক্ষেত্রে নয়, মহান

মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের সংখ্যাও প্রত্যাশিত নয়। তাই এ বিষয়ে লেখক ও প্রকাশকদের আরো মনোযোগী হতে হবে। এ ছাড়া ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর বইয়ের সংখ্যাও বৃদ্ধি করতে হবে; যাতে তরুণ প্রজন্ম আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের বই পড়ে দেশকে বেশি জানতে পারে।

বইমেলায় অনেক ভালো বইয়ের পাশাপাশি কিছু অপ্রয়োজনীয় বইও প্রকাশ পায়। বিশেষ করে দেখা যায়, অনেক বই ভালোভাবে সম্পাদনা করা হয় না। দায়সারা গোছের প্রকাশ করার ফলে থেকে যায় অসম্পাদিত। এ ছাড়া বইয়ে ভুলবাক্য ও ভুল বানানের অসংখ্য উদাহরণও পাওয়া; যা একটি বই প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই কাম্য নয়। আরো কিছু দুর্বলতা রয়েছে। সেটা ছাপা ও বাঁধাইয়ের ক্ষেত্রে। কিছু প্রকাশক দ্রুত বই প্রকাশের তাগিদে কোনো রকমে ছাপিয়ে বাঁধাই করে বইটি বের করেন। এ ক্ষেত্রে প্রকাশকের পাশাপাশি লেখকেরও দায় রয়েছে। লেখককে এ বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে। দ্রুত প্রকাশ না করে তাদের মানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বইমেলা আমাদের জন্য বই কেনার একটি বড় প্ল্যাটফরমও। পাঠকরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন এ সময়টার জন্য। এখন সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব হলো মানসম্পূর্ণ বই যেন প্রকাশ পায় এবং পাঠকরা তা কিনতে পারেন। এর ফলে লাভবান হবেন লেখক, প্রকাশক ও বিক্রেতা থেকে শুরু করে সবাই। শুধু তাই নয়, মানের দিক দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে বইমেলাকে। এটা সম্ভব হবে মানসম্মত বই প্রকাশের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে; যা এখন সময়ের দাবিও। কারণ দীর্ঘ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ভালো বইয়ের সংখ্যার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার এখনই সময়। পুরোনো লেখকদের বইয়ের নতুন সংস্করণের দিকেও মনোযোগী হতে হবে প্রকাশকদের। যা বিদেশের পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রকাশকদের পুরোনো বই প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছুটা উদাসীনতা লক্ষ করা যায়।

বর্তমান প্রজন্মের লেখকদের মধ্যে একটি সমস্যা চলমান। অতি দ্রুত নিজেকে লেখক হিসেবে দেখতে চান, চান পরিচিতি। আর এর সহজ-সরল পথ একটি বই প্রকাশ করা। এখন অনেক নতুন লেখকের মধ্যে সাধনা ও পরিশ্র্রমের বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। কিন্তু সেই লেখকটির আদৌ বই লেখার যোগ্যতা রয়েছে কি না; সেটা কেউ বিচারও করেন না। যা করার দায়িত্ব প্রকাশকদের। অনেক প্রকাশক টাকার বিনিময়ে এসব অপাঠ্য বই প্রকাশ করছেন। যেখানে থাকে শুধু বাণিজ্যিক চিন্তা। কিন্তু একবারও ভেবে দেখেন না এর সাহিত্যমান রয়েছে কি না। এ বিষয়ে এখন সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। আরো একটি বিষয় বইমেলাকে কেন্দ্র করে অভিযোগ রয়েছে। সেটা হলো প্রকাশকরা লেখকদের প্রাপ্য রয়্যালটি বা সম্মানী দেন না। নামিদামি লেখকরা হয়তো প্রাপ্য সম্মানী পান। কিন্তু তরুণ বা উদীয়মান লেখকরা এ ক্ষেত্রে বঞ্চিত হন। সম্ভাবনাময় লেখকরা যদি তাদের প্রাপ্য রয়্যালটি বা সম্মানী প্রকাশকদের কাছ থেকে না পান; তবে স্বাভাবিকভাবে হতাশ হন তরুণ লেখকরা। লেখকদের তাদের প্রাপ্য সম্মানী দিতে হবে। এতে লেখকরা আরো বেশি উৎসাহিত হবেন।

এখানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসা প্রয়োজন। সব পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আছে। যাদের কাজ সেই পণ্যটির মান ঠিক রয়েছে কি না যাচাই করা। কিন্তু বইয়ের মানের বিষয়টি বিচার করার জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। কিন্তু এখন এ বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। কারণ মানহীন বই প্রকাশ পাচ্ছে অনেক বেশি। বইমেলায় যেন কোনো মানহীন বই প্রবেশ করতে না পারে, এর জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে। এখানে সচেতন পাঠকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। ভালো বই কিনতে হবে। পাশাপাশি ভালো বই কেনার বিষয়ে অন্যকে উৎসাহিত করতে হবে। এখন মেলার পরিধি বেড়েছে। পাঠকের চাহিদার কারণে আগামীতে হয়তো আরো বাড়বে। কিন্তু এই বাড়ার মধ্যে যেন শুধু বাণিজ্যিক বিষয়টি প্রাধান্য না পায়। বইয়ের মান, সৃজনশীলতা ও শিল্পবোধ যেন সবার আগে স্থান পায়; সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার এখনই সময়। তবেই বইমেলার কাক্সিক্ষত সাফল্য আমাদের কাছে ধরা দেবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল