প্রবাল দ্বীপে যতো অনিয়ম

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪:৪৮ | আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:০৫

‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া’- রবীন্দ্রনাথের এই কথার উপর ভর করে ভ্রমণপিপাসু মানুষ অনবরত ছুটে চলেছে প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর কিছু স্থানের পানে। বাংলাদেশের যে কয়টি স্থানের প্রতি যারপরনাই অন্তিম আগ্রহ অনবরত কিলবিল করে ভ্রমণপ্রেমিদের মনে, তারমধ্যে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন অন্যতম। সৃষ্টিকর্তা যেনো অতি যত্ন করে বানিয়েছেন এই রহস্যঘেরা দ্বীপটিকে।

প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য্য ঘেরা এই স্থানের উদ্দেশে কয়েকদিন আগে ঢাকা থেকে ২৫ জনের একটা বহর নিয়ে যাত্রা করেছিলাম। যদিওবা আগেই একবার গিয়েছিলাম সেখানে। কক্সবাজারের বাসিন্দা বলে নিজের মধ্যে আগ্রহটা কম থাকলেও সফরসঙ্গীদের আগ্রহ ছিলো তুঙ্গে। যথারীতি আগে থেকেই ওখানে একরাত থাকার উদ্দেশে হোটেলে রুম বুকিং দেয়া ছিল।

ঢাকা থেকে রাত ৮টায় ছেড়ে যাওয়া সেন্টমার্টিন হুন্ডাই পরিবহনে করে শুরু হলো যাত্রা। পরদিন সকাল সাড়ে ৭টায় পৌঁছালাম টেকনাফ জাহাজ ঘাটে। জাহাজও বুকিং দেয়া ছিলো। সাড়ে ৯টায় যথানিয়মে ছাড়ল জাহাজ। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় জাহাজে সিটে বসা নিয়ে। এ যেন মুড়ির টিনের দশা। যে আগে জাহাজে উঠে সিট দখল করতে পারে এই নিয়ম। তারপরও অনেক কষ্টে বসার স্থান আদায় করা হলো। সেন্টমার্টিনে পা রাখলাম দুপুর ১২টায়। এরপর ভ্যান ভাড়া করে হোটেলের উদ্দেশে যাত্রা। সেখানেও আক্কেলগুড়ুম। ১০ মিনিটের রিক্সা পথের ভাড়া ৪০০টাকা। জানা গেলো, যে সময় জাহাজ আসে সেসময় নাকি ভাড়া ৫গুন বেশি। অন্য সময় ৮০ টাকা। উপায় নেই ভেবে রওয়ানা দিলাম হোটেল অভিমুখে।

সেন্টমার্টিনের কোরাল আইল্যান্ড রিসোর্টে আমাদের রুম বুকিং ছিলো্। ইন্টারনেটে যার ছবি দেখে সবাই খুব মুগ্ধ ছিলো। কিন্তু যেই না সেই রিসোর্টে পৌঁছালাম দেখে আতঁকে উঠলাম সবাই। এতো সাড়ে সর্বনাশ। যে রুমের ভাড়া সাড়ে ৩ হাজার টাকা সেই রুম দেখে হাত কি কপালে ঠেকবে নাকি মাথায় ঠেকবে কোনও দিশা পাওয়া যাচ্ছিল না। রুম তো নয় যেনো কোনও বোডিং। বাথরুম অপরিস্কার। দরজায় ছিটকিনি লাগেনা। রশি দিয়ে তারকাটায় আটকাতে হয় বাথরুমের দরজা। পানির অবস্থা তো আরও শোচনীয়। কালো, লবণাক্ত যা মুখে দেয়া যায় না।

রুমের বিছানাতেও গরীবি হাল। শক্ত বেডের উপর নেই কোনও তোশক। নরমাল চাদর বিছানো যা বারবার সরে যায়। রুমের চেহারা দেখে মনে হলো এই রুম ৫০০ টাকার বেশি ভাড়া হওয়ার কথা না। শীতের সময় তাই কম্বল দেখলাম পাতলা। যা ঢাকায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় পাওয়া যায়। এই কম্বলগুলো শীতের সময় শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র হিসেবে বিতরণ করা হয়। কে জানে রিলিফের মাল কিনা। 

রাতে বালিশ ও কম্বল চাইলে দায়িত্বে থাকা লোকজন অপরাগতা জানায়। তাদের নাকি এর বেশি কিছু নেই। তাহলে প্রশ্ন, এত টাকা ভাড়া নিয়ে এমন দৈর্ন্যদশা কেন? হোটেল মালিকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও কথা বলতে রাজি হয়নি। এতে বুঝলাম এরা মানুষ ঠকাচ্ছে। গলাকাটা বাণিজ্য। সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপন করতে আসা পর্যটকদের ঠকাচ্ছে। যার কোনও প্রশাসনিক প্রতিকার নেই। দ্রুত এইসব হোটেল ও রিসোর্ট মালিকদের উপর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সেন্টমার্টিন থেকে ট্রলারে চেপে যাওয়া যায় ছেঁড়াদ্বীপ। এই স্থানের প্রতিও পর্যটকদের আগ্রহের কমতি নেই্। সেখানেও বাণিজ্য। ১০ মিনিট যাত্রার একটা ট্রলার ভাড়া করতে হলো ৪০০০ টাকায়। যাইহোক, ঘুরা হলো ছেঁড়াদ্বীপও। সেন্টমার্টিনের ফিরে খাওয়া হলো টাটকা ফিস ফ্রাই।

পরদিন দারুচিনি বিচ, নারিকেল বিচ ঘুরার পর ফেরার পথে আগেভাগে জাহাজে উঠার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কারণ রিটার্ণ টিকিট তাই সিট দখল করতে হবে। আমরা করলামও তাই। ৩টায় জাহাজ ছাড়বে আমরা ২টায় জাহাজে উঠে সিটে বসলাম। নির্দিষ্ট সিটে। কিন্তু একটু পরপর একই সিটের টিকিট নিয়ে লোকজন আসা শুরু করল। বুঝলাম এক টিকিট কয়েকজনের কাছে বিক্রি করেছে জাহাজ কতৃপক্ষ। এমভি শহীদ সালাম জাহাজের নাম। এদের নিয়মকানুন পছন্দ হলো না। সিটের টিকিট কেটেও প্রচুর যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকলো। আর একটা জিনিস খেয়াল করলাম, এক জাহাজে যে পরিমাণ যাত্রী উঠানোর কথা তার দ্বিগুন যাত্রী নিয়ে এরা টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে যাওয়া আসা করে। এটা রিস্কি। এই বিষয়টার উপরও প্রশাসনের নজর দেয়া জরুরি। তা না হলে যেকোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

সেন্টমার্টিন ঘুরে এসে যে অভিজ্ঞতা হলো তার সারমর্ম হচ্ছে- ওখানাকার হোটেল, রিসোর্টগুলো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেও পর্যাপ্ত সেবা দিচ্ছে না। এরা রুম ভাড়া দিয়ে দায়সাড়া ভাব দেখায়। এদের আইনের আওতায় আনা উচিত। আর দ্বিতীয়ত, জাহাজ কতৃপক্ষও কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যাচ্ছেতাইভাবে যাত্রী আনা-নেওয়া করছে। এই বিষয়গুলোর প্রতি দ্রুত দৃষ্টি দেয়া জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক, নাট্যকার ও লেখক