মুজিববর্ষে নতুন করে আলোর পথে যাত্রা

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ১০:২৫

মোতাহার হোসেন

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘ঘরের ছেলে, ঘরে ফিরলেন,’ ফিরলেন আপনালয়ে স্বমহিমায়, স্বগৌরবে বিজয়ীর বেশে স্বাধীন স্বদেশভূমিতে। আর এই দিনে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। এ কারণে এবারের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের আপামর মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নতুন এক বাংলাদেশ বিনির্মাণে।

তার স্বদেশে ফেরা, তার বেঁচে থাকাটা ছিল মহান আল্লাহর অশেষ রহমত। কারণ পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধু জীবন-মৃত্যুর দুয়ারেই অবস্থান করেছিলেন। তাই তার বেঁচে থাকাটা অলৌকিক এবং অবিশ্বাস্য ব্যাপার। এবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনসহ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও অধিদফতর থেকেও নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দেশ জাতির উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করেই আমাদের নতুন করে আলোর পথে যাত্রা করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশভূমিতে ফেরা বা প্রত্যাবর্তন নিয়ে অনেক কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস রচিত হয়েছে। এমনি একটি গান ‘বঙ্গবন্ধু তুমি ফিরে এলে তোমার স্বাধীন সোনার বাংলায়’। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বেতার থেকে বেজে উঠেছিল এই গান। আবার তার স্বদেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ওইদিন পত্রিকায় শিরোনাম করেছে ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়’। আবার কেউ কেউ লিখেছে ‘মাগো, তোর মুজিব এলো ফিরে।’ পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠ থেকে বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে এলেন তার প্রিয় জন্মভূমিতে সেই ৪৬ বছর আগে। তার আগমনের মধ্য দিয়ে হানাদারমুক্ত দেশে বাঙালির শুরু হয়েছিল নতুন অভিযাত্রা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস তাকে থাকতে হয় পাকিস্তানের কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে। এখানে আরেকটি কথা স্মরণীয় যে, বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি করে রাখা হলেও বীর বাঙালি জাতির জনকের নির্দেশ পালনে বিন্দুমাত্র বিলম্ব করেনি। তারা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। সেদিন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ সবার স্বপ্ন ছিল একসূত্রে গাথা। কারণ বঙ্গবন্ধু ছিলেন জাতির ঐক্যের প্রতীক।

বঙ্গবন্ধুর আগমনে বদলে গিয়েছিল সবকিছু। মানুষ সব হতাশা ও দুর্ভোগ ভুলে দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করেছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের কল্যাণার্থে নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। শিক্ষা, কৃষিসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি রচিত হয়েছিল সেসময়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর আগমন বাঙালি জাতির জন্য একটি বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি শত বছরের খাদ্য ঘাটতির দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। শিক্ষা, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন হয়েছে। মাথাপিছু আয়, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, গড় আয়ু সবই উন্নতির দিকে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। যে বিচার বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন। সে বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধুর কর্মময় জীবন ও রাজনীতি থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধীদের মোকাবিলায় আমাদের নতুনভাবে উজ্জীবিত হতে হবে। জঙ্গি ও দুর্নীতিমুক্ত-অসাম্প্র্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের নতুনভাবে শপথ নিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সবার চেতনায় উজ্জীবিত, এটা সব সময়ই অম্লান। এই চেতনা সর্বদা সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। জাতির জনক নিজেই তার এ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে। তাইতো বাঙালি জাতির মহান মুক্তি-সংগ্রামের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ৯ মাসের সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাঙালির বিজয় পূর্ণতা লাভ করে।

ইতিহাসের পেছন ফিরে তাকালে দেখব, ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের পূর্বপরিকল্পিত বাঙালি নিধনযজ্ঞের নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নে লাখ লাখ নিরীহ জনগণের ওপর আক্রমণ ও গণহত্যা চালায়। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে সর্বস্তরের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ লড়াই শুরু করার ডাক দেন। স্বাধীনতা ঘোষণার অব্যবহৃতি পর পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসা থেকে গ্রেফতার করে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে কারাগারে আটকে রাখেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতেই দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে যখন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ যুদ্ধ চলছে, ঠিক তখন পশ্চিম পাকিস্তানে প্রহসনের বিচারে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। কারাগারের সেলের পাশে কবর পর্যন্ত খোঁড়া হয়। এ সময় বঙ্গবন্ধু তাদের একটি অনুরোধ করেছিলেন, বাংলার মানুষের অধিকার আদায় ও স্বাধীনতা অর্জন প্রশ্নে তিনি আপস করবেন না। যদি তারা তাকে হত্যা করে তবে তার লাশ যেন প্রিয় স্বদেশের মাটিতে পাঠিয়ে দেয়। এদিকে, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাকেই রাষ্ট্রপতি করে গঠিত হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে খ্যাত এ সরকারের নেতৃত্বে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে গোটা বাঙালি জাতি। দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র যুদ্ধে বহু ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতি বিজয়ের লাল সূর্য ছিনিয়ে আনে।

এর আগে থেকেই কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে বিশ্বব্যাপী প্রবল জনমত গড়ে উঠেছিল। স্বাধীনতা লাভের পর নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশও বিশ্ববাসীর কাছে তার নেতার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি জানালে বিশ্বনেতারাও তার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন। অবশেষে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়ে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দেয়। দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যু যন্ত্রণা শেষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন-দিল্লি হয়ে মুক্ত স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসেন তিনি। এক সাগর রক্ত দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বাংলাদেশের সৃষ্টি, সেই দেশে বঙ্গবন্ধুর ফেরার দিনটি ছিল অনন্য এক দিন। তাই অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিকভাবেই ১০ জানুয়ারিকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনার দিন হিসেবে ধার্য করা হয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে তার জন্ম যেমন বাংলাদেশের জন্য, বাঙালির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ১০ জানুয়ারিও তেমনি তাৎপর্যময়। সেই দৃষ্টিকোণ আমাদের প্রত্যাশা মুজিববর্ষে বাংলাদেশকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন ভাবনা, তার দর্শন, তার কর্ম, তার চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন ও বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। একই সঙ্গে এ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সভা-সেমিনার, সিম্পোজিয়াম চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে এ নিয়ে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হবে—এমনটিও প্রত্যাশিত। পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ ক্ষেত্রে এই উদ্যোগগুলো গ্রহণ করবে এবং অসংখ্য বইপত্র প্রকাশিত হবে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা না হলে পরবর্তী ১৫-২০ বছরে বাংলাদেশ উন্নয়নের কোন স্তরে অবস্থান করত, তার একটি সমীকরণও হবে এসব আলোচনা ও লেখালেখিতে।

সবশেষ কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, তত দিন বঙ্গবন্ধু প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য থাকবেন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব থাকবে সমভাবে। এই মহান দিনের স্মরণে মহান আল্লাহর দরবারে বঙ্গবন্ধুসহ ১৯৭৫ সালে ঘাতকদের নির্মম বুলেটে শহীদ ও তার পরিবারের সদস্যদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। একই সঙ্গে আগামী দিনে আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হোক পাথেয়—এ প্রত্যাশা করছি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম (বিসিজেএফ)
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল