দিনে লাখো পিস সোনালি ব্যাগ উৎপাদন

পাটের সুদিন ফিরছে

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৫:৫৫ | আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:০৯

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্লাস্টিক এখন সর্বত্র। কি অফিসের কাজে, কি ঘরে, সব জায়গায় প্লাস্টিকের রাজত্ব। এমনকি আমরা আমাদের শিশুদের হাতেও নির্দ্বিধায় তুলে দিচ্ছি প্লাস্টিকের নানা রঙিন খেলনা। সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে যাবে। চলতি শতকে আমরা যে পরিমাণ প্লাস্টিক উৎপাদন ও ভোগের মধ্যদিয়ে গিয়েছি, তা পৃথিবীর ইতিহাসে রেকর্ড!

প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের শিকার হয়ে মরতে হচ্ছে অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর। মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। এই অবস্থায় পরিবেশ দূষণকারী পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার কমাতে দৈনিক এক ১ পিস সোনালি ব্যাগ উৎপাদনের কার্যক্রম চালু করেছে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)। এতে অর্থায়ন করছে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড।

সোনালি আঁশ পাটের হারানো দিন ফেরাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। মানসম্মত পাট উৎপাদন, পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, পাটকলের আধুনিকায়ন, পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ— এই পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে জাতীয় পাটনীতিতে। এছাড়া পাট নিয়ে উৎসাহ ও জনসচেতনতা যেমন বাড়ছে, তেমনি স্বপ্ন দেখার পরিসরটাও বড় হচ্ছে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশবান্ধব সোনালি ব্যাগ উৎপাদনে অধিকতর গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ ও সম্পাদন শীর্ষক প্রকল্পে ৯ কোটি ৯৬ লাখ ৮৯ হাজার টাকা বরাদ্দের জন্য এরই মধ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় হতে প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়েছে।

প্রথমবারের মতো ‘বস্ত্র দিবস’ পালনের পদক্ষেপ নিতে ওই বৈঠকে সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি। একইসঙ্গে এর মাধ্যমে এ সেক্টরের যাবতীয় কার্যক্রম ব্যাপকভাবে প্রচারের জন্য সুপারিশ করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন কৃষক এক হেক্টর জমিতে পাটচাষ করলে তা মোট ১০০ দিনে ১৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রকৃতি থেকে শোষণ করে, আর ১১ টন অক্সিজেন প্রকৃতিকে দেয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ৮ লাখ ১৭ হাজার ৩৮৩ হেক্টর জমিতে পাটচাষ হয়েছে, যাকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পাটের ফলনে স্মরণকালের রেকর্ড বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবিদরা।

এক সময় দেশের প্রধান রফতানি পণ্য ছিল পাট। রফতানি আয়ের শীর্ষ খাতও ছিল পাট। সেই দিন আর নেই। কিন্তু বিশ্বব্যাপী সবুজ পণ্য ব্যবহারের যে প্রবণতা বাড়ছে তাতে পাটের সেই সোনালি দিন ফেরার আশা জেগেছে। পাট দিয়ে বাহারি ডিজাইনের ভীষণ নান্দনিক জুতা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া পাট দিয়ে ঢেউটিন থেকে চেয়ার, সবকিছু বানানোর কাজও চলছে।

পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা পাটের পাতা থেকে চা উদ্ভাবনের কথা শুনিয়েছেন সম্প্রতি। পাট শাকের মেমন ভেষজ গুণ, তার সবটুকুই এই পাটের চায়ে পাবেন চা-প্রেমীরা। আর সে কারণেই এই চা খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পাবে বলে বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তাদের আশা। সম্প্রতি জার্মানিতে এই চা রফতানি করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। হ্যাঁ, এই গল্পগুলো আমাদের সামনের দিকে চোখ মেলে তাকাতে বলে। পাটকে নিয়ে নতুন করে ভাবার, কাজ করার কথা সামনে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন পাটকলগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে তিনটি পাটকলের আধুনিকায়নে (ঢাকার করিম জুট মিলস, চট্টগ্রামের আমিন জুট মিলস ও খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলস) চীনের সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি সই করেছে সরকার। আর মাত্র তিনটি পাটকল আধুনিকায়নে খরচ ধরা হয়েছে ৩৪০ মিলিয়ন ডলার। এই এত এত টাকা খরচ করে পাটকল আধুনিকায়নের যে স্বপ্ন, সেটা একদিকে যেমন আমাদের সক্ষমতা ও সাহসিকতার বার্তা জানান দেয়, তেমনি পাটের সোনালি সুদিনের ইঙ্গিতও আমরা পাই।

বর্তমানে আমরা প্রতি টন কাঁচা পাট রফতানি করে ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার পাই। কিন্তু মিলগুলো আধুনিকায়ন করার পর সেখানে পাটের শাড়ি, সোফা, কভার ইত্যাদি পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে প্রতি টন পাট থেকে ১০ হাজার ডলারের পণ্য উৎপাদন করা যাবে। এছাড়া আধুনিকায়নের ফলে তিনটি পাটকলে ৫৩ দশমিক ৩৫ একর জমিতে বছরে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন পাট পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে।

পিডিএসও/তাজ