হুমায়ূন আহমেদ স্যার কেমন আছেন

প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ১০:১৭

সরদার শরাফত আলী
হুমায়ূন আহমেদ (১৩ নভেম্বর ১৯৪৮–১৯ জুলাই ২০১২)

হুমায়ূন আহমেদের বই পড়া শুরু সেই কবে প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস নন্দিত নরকে থেকে মৃত্যুর পর প্রকাশিত দেয়াল কিছুই বাদ যায়নি। যখন প্রথম নন্দিত নরকে প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে, তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। আমি তখনই পাঠক। বুঝে না বুঝে সব আউট বই-ই পড়ি। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের বাইরের বইকে আউট বই বলা হতো। এক চাচাতো ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের তুখোড় ছাত্র (বর্তমানে প্রয়াত)। আমার হাতে দিয়ে গেল নন্দিত নরকে। চতুর্থ শ্রেণির পাঠক আমার সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল লেখক হুমায়ূনের।

সেই শুরু, আর কখনো তা থামেনি। শেষ লেখা দেয়াল পর্যন্ত। আজও আপনার যেকোনো বই টেনে নিয়ে বসলে শেষ না করে ওঠা যায় না। রুনু, ঝুনু, রাবেয়া আপা কিটকির সঙ্গে আমি প্রায় আপনার মতোই পরিচিত। আপনার অসাধারণ সব এপিগ্রাম আজীবন থেকে আমার মতো লাখো কোটি পাঠককে মুগ্ধ করেছে দীর্ঘদিন। আপনিই প্রথম লেখক (কাজী আনোয়ার হোসেন ও সেবা প্রকাশনী ছাড়া) যিনি এ দেশে নিজের পাঠক তৈরি করেছেন প্রথম থেকে। আপনিই প্রথম লেখক, যার কপিরাইট হিসেবে প্রকাশক মাইক্রোবাস পাঠিয়ে দিয়েছে আপনার শহীদুল্লাহ হলের হাউস টিউটরের বাসায়। যেটা হয়েছে মেয়েদের পুতুল খেলার ঘর। শহীদুল্লাহ হলে লেখা চারটি উপন্যাস আমার মতে আপনার জীবনের সেরা লেখা। যে চারটিই চলচ্চিত্র রূপ পেয়েছে। কী লিখব আর কী লিখব না, ভেবে লেখা আটকে যাচ্ছে বারবার কখনো ঠোঁটে মুচকি হাসি, কখনো চোখে জল। আপনার মতোই লিখতে লিখতে উঠে যাচ্ছি, আবার এসে বসছি।

আপনার প্রথম লেখা শঙ্খনীল কারাগার হলেও প্রকাশিত উপন্যাস নন্দিত নরকে। শঙ্খনীল কারাগার আপনি আপনার মতোই রোমান্টিক বাবা একাত্তরের শহীদ ফয়েজুর রহমানের অফিসে নীলখাতায় লিখে রেখেছেন শঙ্কায়। আপনার বাবা খাওয়ার পর আপনার মাকে বলেছে, ‘আল্লাহর কাছে শুকরিয়া তোমার ছেলেকে তিনি লেখক হিসেবে পাঠিয়েছেন’। কত কিছুই লেখার আছে। একটা বইই ফেলতে পারি খবরের কাগজের ফিচার কি তা পারে? আপনার লেখাকে আমি তিন ভাগে ভাগ করতে চাই, ১. লেখক হিসেবে পূর্ণ প্রতিষ্ঠার আগের লেখা। ২. পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রকাশকের চাপে বইমেলার জন্য লেখা। ৩. শেষ দিকে দ্বিতীয় বিয়ের ভুলটা মনে হয় একসময় বুঝেছিলেন তার পরের লেখা।

প্রথম ভাগের (১) লেখা আপনার শ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয় ভাগের (২) লেখা বাজারি লেখা অনেকটা অর্ডার সাপ্লাইয়ের মতো। তৃতীয় ভাগের (৩) লেখা আপনাকে ফিরিয়ে এনেছে আসল হুমায়ূনকে। আপনার লেখা ‘হোটেল গ্রেভার ইন’-এর সেই অন্ধ ছাত্র আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে। ফ্রেঞ্চ টোস্ট আর সেই পাঁচ সুন্দরীর আপনাকে ডিনার খাওয়ানো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আজীবন আবেগপ্রবণ মানুষ আপনার মতোই আমারও কেন যেন চোখে জল আসে।

কত কিছু তো লিখেছেন আর করেছেন। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্র প্রযোজনা নির্মাণ, নাটক, ধারাবাহিক নাটক শিল্পের প্রায় প্রতিটি শাখায় আপনার জাদুকরী কলমের স্পর্শে জীবন পেয়েছে। শুধু যদি ছোটগল্প লিখতেন, তাহলেও কয়েকটি গল্পের জন্য আপনি নমস্য হয়ে থাকতেন চিরদিন ছায়াসঙ্গী, জলিল সাহেবের পিটিশন কল্যাণীয়েষু, পিঁপড়া, জিন ককিল কিংবা বিভ্রম সবই যেকোনো মাপে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। ছোট পরিসর তাই নাম দিতে পারলাম না আরো কত গল্পের।

আপনার উপন্যাসের যে ভাগ করেছি তার ১ম ভাগের কথা কিছু বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগেও কিছু ভালো ভালো লেখা যে হয়নি, তা নয়। এরই মধ্যে তো পরস্পরবিরোধী দুই চরিত্র হিমু আর মিসির আলীও আছে। লক্ষ কোটি মানুষের মতো আমিও কখনো মিসির আলী বা হিমু হয়ে যাই নিজেই কখন জানি না।

তৃতীয় ভাগে আমি রাখব লীলাবতী, মাতাল হাওয়া, মধ্যাহ্ন জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প এবং দেয়ালকে। লীলাবতী থেকে অঙ্ক শাস্ত্রবিদ শংকরাচার্যের কথা জেনেছি। বাবা-মেয়ের গভীর স্নেহ-মমতার কথা জেনেছি। চারটি খাতা ভরে লীলাবতী লিখে যাওয়া একটি অপ্রকাশিত প্রেম যে কত গভীর হতে পারে, তা জেনেছি। মাতাল হাওয়া থেকে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, আসাদ গেটে যে শহীদ আসাদের নামে জানতাম, কিন্তু তার হত্যাকারীর নাম জেনেছি। কবি নির্মলেন্দু গুণের কবি হয়ে ওঠার কথা জেনেছি। মিসির আলীর জন্মলগ্ন জেনেছি।

ময়মনসিংহ বারের স্বাধীন ল’ ইয়ার মোনায়েম খানের তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজধানীর গভর্নর হওয়ার গল্প জেনেছি। নাদিয়া নামের অকালমৃত মায়াবতী মেয়েটির দেওয়া টাকায় আপনার প্রথম কবিতা লেখার গল্প জেনেছি এন এসের পাঁচ পাত্তরের পতনের ও প্রতাপের কথা জেনেছি। বঙ্গবন্ধুর মাঝিবিহীন নৌকার মতো দেশে একজন সত্যিকার নেতার উত্থান জেনেছি। বিদ্যুৎ কান্তি দের মতো একজন শিক্ষকের কথা জীবনে প্রথম জেনেছি। চোখের মনির ডাউলেশনে যে সত্য-মিথ্যা ধরা যায়, তা জেনেছি। আরো কত কী?

মধ্যাহ্নে জেনেছি ঋষি হরিচরণের ইতিহাস। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রথম স্কুলের ইতিহাস। অপূর্ব সুন্দরী জুলেখার ব্রথেল থেকে চান বিবির মতো সুকণ্ঠী গায়িকার ইতিহাস। উকিল মুন্সীর ইতিহাস স্বদেশী আন্দোলনের অনেক অজানা তথ্য। সব লিখে শেষ করা যায়? মাস্টার দা সূর্যসেনকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন তার জ্ঞাতি ভাই নেত্র সেন তরুণ প্রজন্মের কজন এ তথ্য জানে।

গুলতেকিন ভাবী আপনাকে পাঁচশ পাতার একটি ডায়েরি দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি প্রতিদিন এক পাতা করে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি উপন্যাস লিখবে।’ আপনি হয়তো জীবনের নানা সমীকরণে সময়মতো লিখতে পারেন। তবু স্যার কৃতজ্ঞতা অভাজনের আমরা পেয়েছি ‘জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প’। এই একটি উপন্যাসের ওপর একটি উপন্যাস লিখলে স্যার আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তৃপ্ত হতাম। সামান্য ফিচারে কি সে স্বাদ মেটে। তবু তো মুন্সি ইরতাজ উদ্দিন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতা, আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা কম তো লেখেননি। আপনি ডিসক্লেইমার দিয়ে লিখেছেন, ‘বীরঙ্গনাদের কাহিনি আপনি চোখের জলের জন্য লিখতেই পারেননি।’ আমি এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। ঐতিহাসিক উপন্যাসে লেখককে সবকিছুতে নির্লিপ্ত থাকতে হয়। আপনি নিজেই এক লেখায় লিখেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণী অধ্যাপিকার অনুপ্রেরণায় ছবি দেখা শুরু করেছিলেন রোমান হলিডে ছবি দিয়ে এবং আপনার সবচেয়ে বেশিবার দেখা ছবিটির নাম ‘দি ক্রেইনস আর ফ্লাইং’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর নির্মিত একটি ছবি। বলুন তো কী নির্লিপ্ত থেকেছেন সেই গল্পের লেখক, পরিচালক। ঘটনাক্রমে দুটি ছবিই আমারও দেখা। তাই আমার অনুযোগ। আশা করি, কেউ এক দিন এই অংশ পূর্ণ করবেন।

এরপর ‘দেয়াল’ দিয়ে শেষ করতে হচ্ছে। এই উপন্যাসটি আপনার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছে। এর মুখবন্ধ লিখেছেন শ্রদ্ধেয় আনিসুজ্জামান স্যার। তার পরও সংক্ষিপ্ত একটু লিখতে ইচ্ছে করছে।

স্বাধীনতা সংগ্রাম। বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতির বর্ণনা ধারাবাহিকভাবে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের জাতির পিতার পরিবারসহ (দুই মেয়ে বাদে) নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড। সিঁড়ির ওপর পিতার লাশ পড়ে থাকা অবস্থায় এরপর অবৈধ মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে বিভিন্ন বন্ধু ও অবন্ধু রাষ্ট্রের তৎপরতা।

৩ নভেম্বরের জাতীয় চার নেতার নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের বিবরণ। খালেদ মোশাররফের উত্থান। মোশতাকের পতন। কর্নেল তাহেরের মাধ্যমে জিয়ার পুনর্জন্ম। খালেদ মোশাররফের সাহসিক মৃত্যু। ক্যান্টনমেন্টের খেজুরতলার তার মৃতদেহ পড়ে থাকা।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়ার মৃত্যু। মেধাবী কর্মকর্তা জেনারেল মঞ্জুরের মৃত্যু। খুব জানতে ইচ্ছে হয়, এত পরে লেখাটি লিখলেন কেন। আনিসুজ্জামান স্যারের সঙ্গে প্রশ্ন করি শেষটা এত দ্রুত হলো কেন? আমার মনে হয়, আপনি বুঝে গিয়েছিলেন আপনার আর আয়ু নেই।

সিলেটে মীরা বাজারে শুক্লাদি দি আপনাকে মিষ্টি দিতেন গেলেই। পরে ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে দুজন হয়ে গেলেন। শুক্লাদি দি হাসিমুখে দুটো মিষ্টিই দিতেন। এক দিন মিষ্টি ফুরিয়ে যাওয়াতে হাতে তুলে দিয়েছিলে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’। আপনার পাঠক হওয়ার গল্প। আমার জীবনে ১৯৭২ সালে খোকন ভাই ‘নন্দিত নরকে’ তুলে দিয়ে পাঠক বানিয়েছেন। সে অর্থ দুজনের পাঠক হওয়ার গল্পই স্যার একই রকম মনে হয়।

এই লেখা যখন ছাপা হবে আমি থাকব ভারতে চিকিৎসার জন্য। ড. জাফর ইকবাল সাহেবের হাতে পৌঁছে দেব যেকোনো মূল্যে। আর যদি গুলতেকিন ভাবির হাতে পৌঁছায়, ভাবি আমি সাধারণত কাউকে সালাম করি না। আপনার সঙ্গে দেখা হয় শুধু আপনাকে সালাম করতে চাই।

তথ্য সূত্র : হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সব বই

লেখক : কলামিস্ট ও সরকারি কর্মকর্তা

[email protected]

পিডিএসও/হেলাল