ভুয়া সংবাদের উৎস ফেসবুক!

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৩৬

মোহাম্মদ আবু নোমান

একবিংশ শতাব্দীর এই বিজ্ঞানের যুগে প্রযুক্তিকে এড়িয়ে চলা অসম্ভব। তথ্যপ্রযুক্তির মধ্যে ফেসবুক পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারীর পছন্দের একটি গণমাধ্যম। ভালো কাজের জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেকে এটিকে খারাপ দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি হচ্ছে। মানুষ ইন্টারনেট এবং সামাজিক মাধ্যমগুলো ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কেনাকাটা সবকিছুই হাতের নাগালে চলে এসেছে। মানুষ এ থেকে উপকারও পাচ্ছে। অনেক সেবা পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে দ্রুত।

ফেসবুক একটি মিডিয়াসহ অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ বা জানা ও জানানোর মাধ্যমও। ফেসবুক মাধ্যমটি এখন যেমন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তেমনি ফেসবুক উন্মাদনাও এখন চরমে। অনেকেই ব্যবহার করে এটিকে ভালোভাবে, আবার অনেকেই ব্যবহার করে খারাপভাবে। তাই কোনো পোস্ট পড়ার পরে যাচাই না করে মতামত দেওয়া ঠিক নয়। যেকোনো ঘটনা যখন দুর্ঘটনায় পরিণত হয়, এটি এমনি এমনি হয় না। যেকোনো ব্যক্তি বা চক্র একত্র হয়ে কাজ করে। তাই এসব শনাক্ত করে দ্রুত সময়ের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।

ভুয়া সংবাদের এখন অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে ফেসবুক। উন্মুক্ত এই মাধ্যমে যা ইচ্ছা তা-ই পোস্ট করা যায় বলে একে সুযোগ হিসেবে নিয়ে দুষ্টরা ভুয়া সংবাদ পোস্ট করে থাকে। কারা ফেসবুকে ভুয়া কথা ছড়ায়, বিভ্রান্তি ছড়ায়, কারা ফেসবুকের আইডি হ্যাক থেকে মিথ্যা তথ্য দেয়, তা বের করা কঠিন কিছু নয়, এ কথা সব ফেসবুক ব্যবহারকারীকে জানাতে হবে। এজন্য ফেসবুক নীতিমালা প্রণয়ন ও গণমাধ্যমে তা প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। ফেসবুক হেল্প সেন্টারও চালু করা যেতে পারে। পূর্ণ নাম-ঠিকানা, নির্দিষ্ট বয়স, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, পাসপোর্ট নম্বর, এনআইডি কার্ডের তথ্য এবং ভেরিফাইয়ের ব্যবস্থা রেখে ফেসবুক আইডি খোলার নিয়ম চালুও হতে পারে ভালো উদ্যোগ। সবার ফেসবুক পেইজের কভার ফটোতে আইসিটির আইনের সংক্ষিপ্ত শাস্তির বিধান রাখা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

আগেও গুজব নামের দুর্যোগের কবলে পড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গুজব এক ধরনের টোপ, যা ব্যবহার করে কুচক্রী মহল ফায়দা লুটে নেয়। ফেসবুক তেমন একটি মাধ্যম। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে গুজব ছড়ানো হয়, পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে। যার জেরে সারা দেশে আতঙ্ক ছড়ায়, গণপিটুনিতে নিহত হন এক মাসহ বেশ কয়েকজন। ফেসবুক প্রকাশিত খবরে অস্থির হয়ে, ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে, কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ফেসবুকে ভুয়া তথ্য দিয়ে যেহেতু ধর্মীয় বিরোধ সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাই এ বিষয়ে সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আলোচনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এমনিভাবে শিক্ষার্থীরাই যেহেতু সবচেয়ে বেশি ফেসবুক ব্যবহার করে; তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেসবুক ও ইন্টারনেট অপব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষাদান জরুরি। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের এটি বোঝাতে হবে, যা ক্ষতিকর, যা অপরাধ, সেটি ছড়িয়ে দেওয়া ও নিজের অ্যাকাউন্টে যুক্ত করাও অপরাধ। ফেসবুকে কোনো তথ্য দেখে যাচাই-বাচাই না করে যারা গর্জে উঠবে, সমাজে বিদ্বেষ ছড়াবে, তান্ডব সৃষ্টি করবে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

সম্প্রতি ভোলার বোরহানউদ্দিনে, অতীতে কক্সবাজারের রামুতে, রংপুরের গঙ্গাচড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও গুজবে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয় আক্রান্ত হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। করতে হবে দ্রুত বিচার। সর্বসাধারণের এ কথা ভালোভাবে জানতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজ কোনো নিউজই নয়! বেশির ভাগ সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর খেয়ালখুশি বৈ অন্য কিছু নয়। অনেক আবেগপ্রবণ ফেসবুকারই লাইক বা কমেন্ট শেষে এসব মিথ্যা পোস্ট শেয়ারও করে থাকে। সত্যতা যাচাই না করেই কত বড় অপরাধে অপরাধী হয়ে যাচ্ছে, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে।

কিন্তু কিছু মানুষ ফেসবুকের যে ব্যবহার করছে তাতে যন্ত্রণার বড় কারণ হয়ে উঠছে। এখন ব্যাপ্তি যেহেতু বেড়েছে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের যখন থাকতেই হবে, সেহেতু ফেসবুকসহ সব সামাজিক মাধ্যম নিয়েই আইটি বিশেষজ্ঞদের আরো বিস্তরভাবে ভাবতে হবে। এ ভাবনায় জনসাধারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের ভূমিকা থাকবে। বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশলকে তাৎক্ষণিক মোকাবিলা করে, হ্যাকার শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে সরকারকে তৎপর হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে শক্তিশালী আইসিটি তথা সাইবার ক্রাইম বিভাগ খোলা হয়েছে। তাদের দেশ-বিদেশের উপযুক্ত ট্রেনিং দিয়ে যুগোপযোগী করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে দেশের সব সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকে সাইবার ক্রাইম তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করার উপযোগী প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রশিক্ষিত করা অত্যাবশ্যক।

ইতোপূর্বে ফেসবুকে একটি পোস্টে দেখা গেছে, মসজিদে পবিত্র কোরআন ছেঁড়া ও পায়খানার ছবি। পোস্টে বিভিন্নজনে চরম ক্ষোভও প্রকাশ করেছিল। পরবর্তীতে জানা গেছে, এটি মূলত কুমিল্লার একটি মসজিদের ঘটনা, যা ২০১৬ সালের দিকে ঘটেছিল। এক পাগল মসজিদে ঢুকে এই কাজটি করেছিল। আল্লাহর পেয়ারা রাসুল মোহাম্মদ (সা.)-এর সময়ও মসজিদে জনৈক মুশরিক প্রস্রাব করে দিয়েছিল। আল্লাহর রাসুল তাকে আক্রমণ করতে নিষেধ করেছিলেন। আমাদের দেশে মূলত এমন ঘটনাই ঘটছে বেশি। সামাজিক যোগাযোগ সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ মুহূর্তে খবর পেয়ে যায়। এরই সঙ্গে রয়েছে অতি বাড়াবাড়ির আবেগ ও অপপ্রচারও। পুরো ঘটনা না জেনে উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। এর মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে সংঘাত। এর জন্য আমাদের অসচেতনতা বেশি অংশে দায়ী। বেশ কিছু অনলাইন পোর্টাল এই অপপ্রচারের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। অনুমোদনহীন এই সংবাদমাধ্যমগুলো যা ইচ্ছা তা প্রচার করে দিচ্ছে। এতে সহজে বিভ্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

কতিপয় স্বার্থান্বেষী, জ্ঞানহীন, মূর্খ রয়েছে, সে হিন্দু কি মুসলমান, না বুঝে বিবেক বিবেচনা না করে, স্বধর্মকে পুঁজি করে সামাজিক অস্থিরতা ও সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার লক্ষ্যে অপপ্রয়াস চালিয়ে থাকে। এটি আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমগুলোতে কিছু বিকৃত, নোংরা মানসিকতার মানুষ দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে থাকে। যেকোনো ঘটনায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা যেতে পারে। সর্বসাধারণ ও পুলিশের অধৈর্যের কারণেই ভোলায় চারটি তাজা জীবন ঝরল।

বহু বছর ধরে বাংলাদেশে নানা ধর্মের লোকপ্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ। ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম সৌভ্রাতৃত্বের ধর্ম। ফেসবুকে ভুয়া তথ্য দিয়ে যে তান্ডব হয়েছে এর মধ্যে রয়েছে গভীর চক্রান্ত। সময়মতো পদক্ষেপ নিলে এত বাড়াবাড়ি হতো না। মন্দিরের নিরাপত্তায় মাদরাসাছাত্রদের উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে এবং বেশ প্রশংসিত হয়েছে। সমাজের নানা নেতিবাচক ঘটনার মধ্যে এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এমন সংকটময় সময়ে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয়জনরা যদি কার্যকর ভূমিকা পালন করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। দেশে ১৮ বছরের নিচের শিশু-কিশোররা ব্যাপকভাবে ফেসবুক ব্যবহার করে। কেন, কীভাবে তারা চালায় খোঁজ নিতে হবে। মা-বাবার উচিত তাদের ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকা। ১৮ বছরের নিচের বয়সি কেউ যেন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলতে না পারে, এ ব্যাপারে ভাবা দরকার।

ফেসবুকে ব্ল্যাকমেইল করা হয় নারীদের; নোংরা ছবি জুড়ে দেওয়া হয়। লজ্জায়, অপমানে অনেক নারী আত্মহত্যাও করেছেন। ফেসবুকে এসব অপকর্ম পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলেও অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সে রকম প্রযুক্তিও বিশ্বব্যাপী রয়েছে। সরকার যেভাবে কতিপয় পর্নো সাইট বন্ধ করেছে, সেভাবে অপরাধীদের আইডি বন্ধ করতে হবে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে। কারণ ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তাদের স্বার্থেই সহায়তা করবে।

ফেসবুক গুজব আগামীতেও দেশের ভয়ংকর ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা রকম গুজব রটিয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল। সন্ত্রাসী ও জঙ্গি কার্যক্রম, চাঁদাবাজি, নারীকে উত্ত্যক্ত করাসহ অনেক বড় বড় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে।

শিশু, কিশোর ও তরুণদের ইন্টারনেটযুক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে। স্কুল, কলেজ, মাদরাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাইকে সচেতন করতে হবে। সারা দেশে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সঙ্গে গণমাধ্যমকে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ভুয়া তথ্য দিয়ে তান্ডব সৃষ্টির ঘটনায় জড়িতদের বিচার বিশেষ আদালতে সীমিত সময়ে শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কম ঘটবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

পিডিএসও/হেলাল