বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সাতকাহন

প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০১৯, ১১:১৭

রেজাউল করিম খান

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে দেশের সর্বত্র সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে সরকারের নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে তারা রাষ্ট্রের প্রধান সমন্বয়কারী। এ ছাড়াও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আইন রক্ষা, নির্দেশ দান, বিভিন্ন সমস্যায় সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯, ধারা ৫) গঠনের ক্ষমতা রাখেন।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ক্যাডার হিসেবে উত্তীর্ণ হলে শুরুতে সহকারী কমিশনার বা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করতে হয়। যোগদানের ছয় বছরের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হওয়া যায়, আর একজন ইউএনওকে উপজেলা পর্যায়ে সরকার নিয়োজিত ‘রাজা’ বললে ভুল হয় না, তাদের জন্য বাংলো ও গাড়ি বরাদ্দ আছে। উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদিতে প্রধান অতিথি অথবা বিশেষ অতিথি হিসেবে যেতে হয়। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও ও জেলা পর্যায়ে ডিসিদের ক্ষমতা ব্যবহারের পরিধি অনেক। থাকে ব্যাপক সুবিধাও। প্রচুর স্কলারশিপ থাকায় বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অনেক বেশি, উচ্চশিক্ষা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাতে প্রেষণে (ডেপুটেশনে বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, ইউনেস্কো, এডিবি ইত্যাদিতে) যাওয়ার সুযোগ অন্য সব ক্যাডারের চেয়ে বেশি। চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রশিক্ষণের পরই ডিসি অফিসে কাজ করতে হয়। অবশ্য কিছুসংখ্যক অ্যাডমিন ক্যাডার সচিবালয়ে সহকারী সচিব হিসেবেও কাজ করেন। তাদের পূর্ব-অভিজ্ঞতার কোনো প্রয়োজন হয় না এবং স্নাতক পাস হলেই আবেদন করা যায়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) সাবেক সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস অব পাকিস্তান থেকে উদ্ভূত, যা উপনিবেশিক শাসনামলের ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী নিয়ন্ত্রিত ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের উত্তরসূরি। স্বাধীনতার পর থেকে এটি সিভিল সার্ভিস অধ্যাদেশের দ্বারা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস হিসেবে পরিচিত হয়। এর মূলনীতি ও পরিচালনা পরিষদ বাংলাদেশ সরকারী কর্মকমিশন কর্তৃক নির্ধারিত।

একসময় দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীরা আইসিএস অফিসার হিসেবে যোগ দিতেন। পাকিস্তান আমলেও এই ধারাবাহিকতা অনেকটাই অব্যাহত ছিল। পরবর্তী সময়ে ‘ভালো’ শিক্ষার্থীরা প্রথমে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে চান। এরপর খোঁজেন বিদেশি কোম্পানি। বৃত্তি নিয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা তো আছেই। অবশিষ্টরা এবং অপেক্ষা কম মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এর মধ্যে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারই তাদের কাছে অধিকতর লোভনীয়। প্রশাসন ক্যাডারের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে ভ্যারিয়েশন, এই ক্যাডারের লোকজন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সুযোগ পান, এমনকি চাকরি শেষ হলে যোগ্যতা ও দক্ষতার (ও রাজনৈতিক) ভিত্তিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও তারা এগিয়ে থাকেন।

পররাষ্ট্র ক্যাডার না হয়েও অনেকে বিদেশে কূটনৈতিক মিশনে কাজ করার সুযোগ পান, এ ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার রেকর্ডও এই ক্যাডারের আছে। এই ক্যাডারে প্রমোশনের ক্ষেত্রে দক্ষতা (উচ্চশিক্ষা, বৈচিত্র্যময় কাজের অভিজ্ঞতা) সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়। তবে যোগ্যতা না থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবে প্রমোশন হয়। এই ক্যাডারে একই ব্যাচের সদস্যের যেমন উপ-সচিব হয়ে অবসরে যাওয়ার রেকর্ড আছে, তেমনি অন্যজনের কেবিনেট সচিব হওয়ারও রেকর্ড আছে। দুই একটি বাদে প্রায় সবগুলো মন্ত্রণালয়, অধিদফতর এবং সরকারি ও স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরাই দফতরপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত হন।

প্রশাসনের চাকরিতে যেমন সুবিধা অনেক, তেমন শ্রমসাধ্য বটে। আবার ঝুঁকিও কম নেই। তদুপরি মধ্যম শ্রেণির মেধাবীদের জন্য এই চাকরি বেশ আকর্ষণীয়। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণের জন্য প্রণীত বিসিএস বিধিমালা-২০১৪ অনুযায়ী এর ২৭টি ক্যাডারে উপযুক্ত প্রার্থী নিয়োগের উদ্দেশ্যে কমিশন তিন স্তরবিশিষ্ট পরীক্ষা গ্রহণ করে। বিসিএস-এর ২৭টি ক্যাডারের নাম—বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন, কৃষি, আনসার, নিরীক্ষা ও হিসাব, সমবায়, শুল্ক ও আবগারি, ইকোনমিক, পরিবার পরিকল্পনা, মৎস্য, খাদ্য, পররাষ্ট্র, বন, সাধারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্য, পশু সম্পদ, পুলিশ, ডাক, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, গণপূর্ত, রেলওয়ে প্রকৌশল, রেলওয়ে পরিবহন ও বাণিজ্যিক, সড়ক ও জনপথ, পরিসংখ্যান, কর, কারিগরি শিক্ষা ও বাণিজ্য।

একজন সচিব সম্প্রতি তার এক নিবন্ধে লিখেছেন, ৯০ দশকের প্রথমদিকে প্রয়োজনীয় শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন বিএনপি সরকার বাংলাদেশ সচিবালয়ের উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত ৭০০-এর বেশি কর্মকর্তাকে একসঙ্গে পদোন্নতির মধ্য দিয়ে প্রশাসনে বড় ধরনের অনিয়মের যে বীজ রোপণ করেছিল, ২৫ বছরের বেশি সময়ে তা ডালপালা মেলে বড় বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। গত ২৮ মার্চ ‘জনপ্রশাসনে বড় বাধা দলীয়করণ, বৈষম্য’ শিরোনামে দেশের প্রথম শ্রেণির একটি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ এবং যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্কের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এ জরিপে যেসব বিষয় ফুটে উঠেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. সার্বিকভাবে জনপ্রশাসনের গুণগতমান আর পেশাদারিত্ব এখনো সন্তোষজনক নয়। কাজের স্পৃহা ও পেশাদারিত্ব বাড়ানো এবং দুর্নীতি দূর করার পথে দলীয়করণ একটা বড় বাধা। সেটা দূর করা বড় চ্যালেঞ্জ। ২. পদ-পদোন্নতি নির্ধারণে অনেক ক্ষেত্রে এখন মেধার চেয়ে রাজনৈতিক সমর্থন, স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠ হওয়া ‘বড় যোগ্যতা’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ৩. আমলারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী—এ কথাটা তারা প্রায় ভুলতে বসেছেন। তারা দলীয় সরকারের ভাবাদর্শের সঙ্গে অনেকটাই একাকার হয়ে গেছেন। ৪. প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে যত দ্রুত পদোন্নতি পাওয়া যাচ্ছে, অন্য ক্যাডারে তেমনটা হচ্ছে না। এ বৈষম্য নিয়ে বহু অভিযোগ রয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, কৃষি, তথ্য, শিক্ষাসহ বেশ কিছু খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। ৫. শূন্য পদের অভাবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি-পূর্বপদে (ইন সিটো) কাজ করতে হচ্ছে। এতে একদিকে তাদের কর্ম স্পৃহা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ছে। ৬. একদিকে জনপ্রশাসনে মাঠপর্যায়ে নিচের স্তরে যেমন সহকারী কমিশনার এবং বাংলাদেশ সচিবালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব কর্মকর্তার অভাব, অপরদিকে উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে কর্মকর্তার ছড়াছড়ি। শূন্য পদ ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া যায় না—প্রশাসনিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত এ নিয়মটির এখানে ব্যত্যয় ঘটানো হয়। ১৯৯২ সালে বিএনপি প্রয়োজনীয় শূন্য পদ ছাড়াই অনেকটা গণপদোন্নতির যে নজির সৃষ্টি করে, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তা অনুসরণ করে।

প্রশাসনে কাজের চাপ অনেক বেশি। তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক চাপ। তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধেও অনেক সময় অপ্রিয় কাজ করতে হয়। আবার এক সরকারের প্রিয়ভাজন অনেক কর্মকর্তাকে সরকার পরিবর্তনের পর ওএসডি হতে হয়েছে। ‘অবাধ্য’ হলেও একই শাস্তি পেতে হয় বা পদোন্নতি আটকে যায়। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যেমন কাজের স্বাধীনতা আছে, তেমন আছে বাধ্যবাধকতাও। একজন জেলা প্রশাসক একটি জেলায় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তিনি সরাসরি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতা রাখেন। সরকারের ডেপুটি সেক্রেটারি ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের ৭৫ ভাগ কেবল অ্যাডমিন ক্যাডার থেকে নিযুক্ত হন এবং বাকি ২৫ ভাগ অন্য ক্যাডারের সিনিয়র অফিসারদের জন্য উন্মুক্ত। রাজনৈতিক দিক থেকে দেশকে পরিচালিত করেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরা। জাতীয় সংসদে আইন, নীতিমালা প্রণয়ন করেন। আর এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে নিবিড় ভূমিকা দাফতরিক প্রধান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সচিব ও সিনিয়র সচিবের। কেউ যদি নিজেকে দেশের পলিসি তৈরিতে যুক্ত দেখতে চান, স্বপ্ন দেখেন রূপান্তরের, তিনি প্রশাসনের অংশ হওয়ার আগ্রহ দেখাতে পারেন।

বর্তমানে প্রশাসন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা অর্থাৎ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ নিয়ে নানা প্রশ্ন, অপরদিকে অনিয়ম-দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনজনিত ঘটনাবলী জনগণ ব্যথিতচিত্তে অবলোকন করছে। এ ব্যাপারে সরকার বাধ্য হয়েছে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, চলমান দুর্নীতি ও মাদকবিরোধী অভিযানে কঠোর নজরদারিতে রয়েছেন প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। বিভিন্ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) কাজকর্ম খতিয়ে দেখছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। এরই মধ্যে কয়েকটি সংস্থার কর্মকর্তাদের দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকেও স্ব-উদ্যোগে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজকর্মে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

৪ অক্টোবর প্রকাশিত অপর এক খবরে বলা হয়েছে, সরকারি অফিসগুলোর সব ধরনের সেবামূল্য বা ফি আদায় হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। এ ছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, অনুদান, ক্ষতিপূরণসহ সব আর্থিক লেনদেনও হবে অনলাইনে। ফলে সরকার নির্ধারিত সেবামূল্যের বেশি কোনো টাকা নেওয়া যাবে না। এসব বিধান রেখে ঘুষসহ সব ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে ‘ডিজিটাল গভর্নমেন্ট আইন, ২০১৯’-এর খসড়া তৈরি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

পিডিএসও/হেলাল