পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও করণীয়

প্রকাশ | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৩০

ড. মো. ইকবাল হোছাইন

মহররমের ১০ তারিখ আশুরা হিসেবে একটি বিশেষ মর্যাদা ও স্থান দখল করে আছে। আদম (আ.) থেকে ইসলামের প্রচার-প্রসারের ধারার অনেক স্তরে মহররমের ১০ তারিখের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন, ইহুদিরা আশুরার দিনে সাওম পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কোন দিন যে তোমরা সাওম পালন করছ?' তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিবস যেদিন আল্লাহতায়ালা মুসা (আ.) ও তার সম্প্রদায়কে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে তার দলবলসহ ডুবিয়ে মেরেছিলেন। মুসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এই দিনে সাওম পালন করেছেন। এ কারণে তারাও সাওম পালন করে থাকে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন_ 'তোমাদের চেয়ে আমরা মুসার (আ.) অধিকতর ঘনিষ্ঠ ও নিকটবর্তী।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) সাওম পালন করলেন ও অন্যদের সাওম পালনের নির্দেশ দিলেন [সহিহ বুখারি :১৮৬৫]।

আশুরার মর্যাদার সঙ্গে অনেক আনন্দ ও বেদনার ইতিহাস অনেক আগ থেকেই জড়িত ছিল এবং আছে। তবে সবকিছুর পর এ দিনের আবেগঘন বেদনাবিধুর মর্যাদার সঙ্গে ফুরাত তীরের কারবালার শাহাদাতের ঘটনা জড়িত হওয়ায় এ দিনের মর্যাদা মুসলমানদের কাছে অনেক বেশি। ইমাম হোসেনের শাহাদাত ও আবেগঘন বক্তৃতা প্রত্যেক ইমানদারের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

এ ঘটনার মাধ্যমে আহলে বাইতের প্রতি যে জুলুম করা হয়েছে, তার শোকে মুহ্যমান হয়ে ওঠে মুমিনের হৃদয়। এ আবেগ ও শোকের সমন্বয়ে মুসলিম সমাজে আশুরা পেয়েছে বিশেষ মর্যাদা। সারাবিশ্বের মুসলিম সমাজের শিকড়ে এর প্রভাব এতই বেশি যে, স্থানীয় লোকাচার, ফোকসাহিত্যসহ সব আয়োজনের সঙ্গে ইমাম হোসেনের শাহাদাতের প্রভাব লক্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। আর সেই সঙ্গে বিভ্রান্তি, অতিরিক্ত আবেগের রেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাব স্থান করে নিয়েছে। কোথাও আশুরার দিনে মাতম, কোথাও কবরসদৃশ তাজিয়া বানানো, কোথাও শোকের প্রকাশ স্বাভাবিকতাকে ছাড়িয়ে যাওয়া, আঘাত করে নিজের শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করা ইত্যাদি মুসলিম বিশ্বের অঞ্চলভেদে ভিন্নতার, মুসলিম সমাজের সামাজিক বিচিত্রতার বহিঃপ্রকাশ।

কারবালায় রাসূলের (সা.) প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন এবং তার পরিবার ও অন্যান্য সম্মানিত সফর সঙ্গীসহ ৭২ জনের শাহাদাত উম্মতে মোহাম্মদির জন্য অনেক শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে। এখনও মুসলমান সমাজ কোনো বিপদের সম্মুখীন হলে আমরা বলে উঠি, 'ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বাদ'। প্রত্যেক মুসিবতকে কারবালার সঙ্গে তুলনা করে এ থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রেরণাই এ প্রবাদে বলা হয়েছে। অনেকে অবশ্য প্রশ্ন করতে পারেন, আশুরার শিক্ষার সঙ্গে কর্মের সম্পর্ক কী? এটা তো ইবাদতের বিষয়।

হালাল কর্মে ডুবে যাওয়ার মধ্যেই আমরা আশুরার মৌলিক শিক্ষা খুঁজে পাই। মুসার (আ.) মুক্তি বা কারবালার শাহাদাতের ঘটনা কেন ঘটেছে, এর বিশ্লেষণেই আমরা হালাল কর্মের অধিকারের প্রশ্নটি খুঁজে পাব। একজন ইমানদার তাওহিদ, রেসালাত ও আসমাউসসিফাতের দাবি অনুযায়ী, নিজের সমগ্র কার্যক্রম পরিচালনা করবে এটা তার মৌলিক স্বাধীনতার অনুষঙ্গ। এ অনুষঙ্গের ব্যত্যয়ের কারণেই ফেরাউনের সঙ্গে মুসার (আ.) দ্বন্দ্ব হয়েছে।

বাতিলের বিরুদ্ধে রাসূল (সা.) ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, আর রাসূলের (সা.) দৌহিত্র কারবালায় সত্যের পতাকাবাহী ইমাম হোসেন শাহাদাত বরণ করেছেন। ব্যক্তিস্বার্থের কোনো এজেন্ডা তাদের ছিল না। ইমাম হোসেন মদিনার গভর্নরের পরামর্শ অনুযায়ী, ইয়াজিদের নামে বাইয়াত হয়ে স্বচ্ছন্দপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারতেন অথবা প্রচণ্ড বিদ্রোহ জাগিয়ে সৈন্য সংগ্রহ করে যুদ্ধের দামামা বাজাতে পারতেন। এরূপ সামর্থ্য তখন রাসূলের (সা.) দৌহিত্র হিসেবে ইমাম হোসেনের ছিল। কিন্তু তিনি কোনোটিই করেননি কেন? এর উত্তর খুঁজলেই তার প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা বেরিয়ে আসবে।

তিনি মদিনায় প্রশাসকদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করেছেন, খিলাফাত আলা মিনহাজিন নবুয়্যাহ নেই—এ কথাটি সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চেয়েছেন। মদিনা থেকে মক্কায় এসে হজ মৌসুমে তিনি একাই দাওয়াতি কাজ করেছেন। সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে যাননি। রক্তপাত এড়িয়ে স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কুফাবাসীর আমন্ত্রণে তিনি আবালবৃদ্ধবনিতাসহ কুফার উদ্দেশে যাত্রা করে কারবালা নামক স্থানে অবরুদ্ধ হন। সেখানেও তিনি দাওয়াতি কাজ করেছেন। আবেগঘন বক্তৃতা দিয়ে ভ্রষ্টতা থেকে এক শ্রেণির নামধারী মুসলমানকে ফেরাতে চেয়েছেন।

দাওয়াতের এই শান্তিপূর্ণ চেষ্টা জীবনের সর্বশেষ পর্যন্ত ইমাম হোসেন করে গেছেন। সব যুগের মুমিন মুসলমানের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা যে, কোনো অবস্থাতেই ধৈর্যচ্যুতি ঘটানো যাবে না। সব অবস্থায় সচেতনভাবে স্থিরচিত্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ধৈর্য ধারণ করতে হতে। যে কথা সূরা আসরে আল্লাহতায়ালা বলেন, 'সময়ের কসম, নিশ্চয় সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততায় নিপতিত; তবে তারা ছাড়া যারা ইমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।'

আজকে মুসলিম সমাজ যে উগ্রতা ও জঙ্গিবাদের বদনামে পতিত হয়েছে কারবালার শিক্ষা কিন্তু এ কথা বলে না। কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্যের মাধ্যমেই মানুষের মন জয় করতে হবে। হঠকারী কোনো সিদ্ধান্তে সাময়িক সফলতা আসতে পারে, তবে তাতে দীর্ঘ পর্যালোচনায় ইসলামের কোনো কল্যাণ হবে না। আর বিশ্বাসী জীবনধারণের চেষ্টা করা এবং হালাল সব কর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, যে শিক্ষা আমরা কারবালার ঘটনা থেকে পাই।

এ শিক্ষার আলোকে তাওহিদি জীবন নিশ্চিত করে পৃথিবীকে আদর্শিক মানুষের বাগান বানানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনাকে স্মরণের জন্য নিজের শরীর ক্ষত-বিক্ষত করার মধ্যে তেমন কোনো কল্যাণ নেই। এমনকি ইরানের বর্তমান ইমাম আয়াতুল্লাহ খামেনিও এসব বাড়াবাড়ির সঙ্গে কারবালার শিক্ষার সম্পর্ক নেই বলে ফতোয়া দিয়েছেন। আবেগ ও শোক প্রকাশের অনেক শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি আছে, যা অনুসরণে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়।

আবার অনেকে কারবালার বিষয়টিকে শিয়া-সুন্নি পার্থক্যের একটি বিষয় বলে আনতে চান। অস্বীকার করার উপায় নেই, উভয় ধারার মুসলমানের মধ্যে উগ্রবাদী রক্ষণশীল চিন্তাধারার গ্রুপ আছে, যারা সর্বদা বিপরীতধর্মী বিতর্ক ও বাড়াবাড়িকে উস্কে দেন। আমি মনে করি, এ ব্যাপারে মুসলমানদের দুটি ধারার ওলামা পর্যায়ে আলোচনার দ্বার উন্মোচন জরুরি। ইসলামের যারা কল্যাণ চায় না তারা উভয় পক্ষের অনৈক্যের জন্য সর্বদা কাজ করে। এ ব্যাপারে নেতৃস্থানীয় মুসলিম দেশ, বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইরানকে আরও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ব্যাপারে তাদের অনেক দায়িত্ব আছে।

অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

পিডিএসও/তাজ