গুজব বনাম ডেঙ্গু এবং আমাদের শিক্ষা

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৯, ০৯:৫৯

রহিম আবদুর রহিম

গ্রামের নাম খনিয়াপাড়া। এক রাতে, এক মা তার দুই সন্তানকে ঘরে রেখে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে প্রতিবেশীর ঘরে বসে টেলিভিশন দেখছিলেন। ঘুমন্ত শিশু জেগে ওঠে দেখতে পায়, বিছানায় তার মা নেই। শুরু হয় কান্নাকাটি। শিশুর কান্না শোনে প্রতিবেশীর ঘর থেকে চিৎকার শুরু করেন শিশুর মা, কে কোথায় আছেন, এগিয়ে আসুন, আমার সন্তানকে ছেলেধরায় নিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে হইচই, চিল্লাচিল্লি, শত মানুষের হাঁকডাক, মুহূর্তে বাড়িতে হাজির হাজার মানুষ। জেগে ওঠা ঘুমন্ত শিশু আরো আতঙ্কিত। চিৎকার দিয়ে দরজার কাছে। মানুষের ঠেলাঠেলি, মায়ের আহাজারি আর দরজায় ধাক্কাধাক্কিতে শিশুর একটি আঙুল থেঁতলে যায়। গুজব রটল ছেলেধরা। আগমন থানা পুলিশের। ইলেকট্রনিকস মিডিয়ায় প্রচার হলো অজ্ঞাত ব্যক্তি কর্তৃক শিশুর আঙুল কেটে নেওয়ার অভিযোগ। ঘটনাটি পঞ্চগড় জেলায় ঘটেছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশ পেয়েছে একটি সংবাদ। এক মসজিদের ইমাম, যিনি মাদরাসার শিক্ষকও বটে। তিনি জিনের ভয় দেখিয়ে তার পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৭ জন নারী শিশুকে ধর্ষণ করেছে। ভয়ংকর এই ধর্ষক র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তার কুকীর্তির বর্ণনা দিয়েছে। বগুড়ার এক মাজার ঘিরে প্রায়ই জিনের বাদশার আবির্ভাব বহু দিন ধরে ঘটে আসছে। প্রত্যন্ত গ্রামই নয়, এখনো শহরের শিক্ষিত মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, টিয়াপাখি ভাগ্য গণনা করতে পারে। সাপুড়িয়ার দেওয়া তাবিজ-কবজ গলায় পরলে সাপে কামড়াবে না। তেলপড়া, পানিপড়া, লবণপড়ায় রোগবালাই দূর হয়। যাত্রাপথে হোঁচট খাওয়া অমঙ্গল। পরীক্ষার দিন ডিম খেলে পরীক্ষায় খাতায় গোল্লা অর্থাৎ শূন্য পাওয়া যায়। এসব লোকাচারের অন্ধকার থেকে জাতির আজও পরিত্রাণ ঘটেনি। সম্প্রতি বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছেলেধরার গুজব এমনভাবে ছড়িয়েছে যে, আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ দ্বারা গণপিটুনির শিকার হয়ে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন ১০ জন। নিহতরা মস্তিষ্ক বিকৃত (পাগল)। কর্মক্লান্ত জেলে, কঠোর পরিশ্রমী রিকশা-ভ্যানচালক। স্কুলে সন্তান ভর্তি করতে আসা মা, সন্তানকে দেখতে যাওয়া বাকপ্রতিবন্ধী বাবা, মানসিক প্রতিবন্ধী নারী, নিছক পথচারী, মাদকাসক্ত অসুস্থ ব্যক্তিসহ অপরিচিত লোকজন।

আইন সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে সারা দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ৩৯ জন। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গণপিটুনিতে নিহত হয় ৩৬ জন। ‘গুজব’ জন্মের রহস্য কোথায়? অন্ধত্ব, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোড়ামি, আধুনিক শিক্ষার অভাব, রাজনৈতিক স্বার্থন্বেষী মহলের কুপ্রবৃত্তি। গত ৩ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার ১১ পাতায় প্রকাশিত একটি শিরোনাম ছিল, ‘কুড়িগ্রামে ছেলেধরার গুজবে কাঠুরিয়াকে মারপিট’—শিরোনামের সারসংক্ষেপ। গত বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রামের উলিপুরে পল্লী উন্নয়ন রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের আব্দুল মমিন নামক এক শিক্ষক গুজব রটিয়ে আলাউদ্দিন নামক এক কাঠুরিয়াকে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে নিরীহ কাঠুরিয়া গণপিটুনির শিকার হন, মুমূর্ষু কাঠুরিয়া আলাউদ্দিনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। থানা পুলিশ গুজবের শ্রষ্টা আব্দুল মমিনকে গ্রেফতার করেছে। অজ্ঞাত আরো পাঁচজনের নামে থানায় মামলা হয়েছে। একজন শিক্ষক আলোকিত মানুষ সৃষ্টি করার কথা অথচ তিনিই গুজব সৃষ্টি করে মানব হত্যার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেন! এই বিকৃত রুচির পচন ধরা মানবটির পথপ্রদর্শক কে? তা কি আমরা খুঁজে পেয়েছি বা পাওয়ার চেষ্টা করেছি?

কুসংস্কার, অন্ধত্ব, গুজব, লোকাচার শুধু আমাদের দেশেই নয়। উন্নত বিশ্বের জাপান এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও রয়েছে। জাপানের কিছু অঞ্চলের মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, তাদের পিতা-মাতা যে তারিখে মারা গেছেন; প্রতি বছর ওইদিন বা তারিখে মৃত পিতা-মাতার আত্মা কোনো একটি রূপ ধারণ করে তাদের বাড়িতে আগমন করবেন এবং মৃত আত্মার মনে যা চাবে, তা নিয়ে যাবেন। যে কারণে তারা পিতা-মাতার মৃত্যুদিবসে তাদের ঘরের দরজা খোলা রাখেন। উন্নত দেশ হওয়ায় তাদের বাড়ির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় না। তবে সুযোগ সন্ধানীরা এই লোকাচারকে কেন্দ্র করে চুরিচামারি ঠিকই করে। জাপানে লোকাচার, অন্ধত্ব থাকলেও সে দেশে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার কারণে সে দেশে একেবারেই গুজব নেই। ভারতে এখনো জ্যোতিষীশাস্ত্রের প্রতি বিশ্বাস করে দেশটির সিংহভাগ জনমানুষ। গত বছর ভারতের গুজবের জঘন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটে গো-মূত্র পানের হিড়িকের মধ্য দিয়ে। এই গুজবের কারণে দুধের চেয়ে গো-মূত্রের দাম বেড়েছিল চার গুণ। একইভাবে অজ্ঞ মুসলিম কান্ট্রি হিসাবে বিশ্বদরবারে পরিচিত লাভ করেছে বাংলাদেশ, দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে চাঁদে দেখার মতো গুজব ছড়ানোর মধ্য দিয়ে।

বর্তমানে হন্ডুরাস, বাংলাদেশ ও ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এই এডিস মশার জন্ম রহস্য সবাই জানেন। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, জমে থাকা নর্দমার আবর্জনা, পচনশীল ডাস্টবিন, পরিত্যক্ত টায়ার-টিউবে জমে থাকা পানি, ফুলের টবে সাধারণত এডিস মশার জন্ম। এগুলো জানার পরও আমরা এখনো সভ্যতার আলোতে পৌঁছিনি। যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা আমাদের জন্মগত অভ্যাস। বাংলাদেশের মতো উর্বর মাটিতে এডিস মশা জন্ম হওয়ার কথা নয়। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশের মাটিতে সোনা ফলে। এই দেশে শিয়াল-বাদুরের মল থেকে ‘জাম’-‘কাঁঠাল’ গাছ গজায়। মাটি খুঁড়লেই সুস্বাদু পানি বের হয়। নদী-নালা, পুকুর-ডোবায় অলৌকিকভাবে মাছ পাওয়া যায়। অথচ এই পুষ্টিকর ফল-ফসলের দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, অন্ধত্ব, কুসংস্কার, গুজব, গজব, হুজুগে-সুযোগের মতো মহামারির জন্য দায়ী কে? গত ১৫ দিন আগেই সংবাদপত্রে জেনেছি, হন্ডুরাসে ৫৫ হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত, ৪৫ জন মারা গেছেন। ভারতে আক্রান্ত ৭০০ জন। মালয়েশিয়া বৃষ্টিপ্রবণ দেশ হওয়ায় প্রতি বছর সে দেশে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয় শত শত মানুষ। লেখাটি তৈরির প্রাক্কালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ২১ হাজার, মৃত ১৪ জন। ৬৪ জেলার সব জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে।

ঈদের সময় এই ডেঙ্গু গ্রামের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন আমাদের দেশের হুজুগ বিশেষজ্ঞরা। ওইসময় ঢাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ গ্রামে ফিরবে। ফলে সঙ্গে আনা ডেঙ্গু জ্বর ছড়িয়ে পড়বে। (তাদের কথামতো) এডিস মশা নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। ঢাকার ২ সিটিতে মশা মারার জন্য ৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের খবর প্রকাশ হয়েছে। ডেঙ্গু রোগকে কেন্দ্র করে সরকারি দল ও সরকার বিরোধী দলের দায়িত্ববান ব্যক্তিরা দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা, অভিযোগ, রসিকতা করে যাচ্ছে। প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অভিযোগ বাংলাদেশ থেকে এডিস মশা ভারতে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বিষয়টি যেমন হাস্যকর, তেমনি ছেলেধরা গুজবের নামান্তরও বটে।

সভ্য পৃথিবীর এই অঞ্চলে এ ধরনের কুসংস্কার, অন্ধত্ব, গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণ কী? নেদারল্যান্ডসের পথচলা মন্ত্রীরা কেন রাস্তায় পড়ে থাকা মলমূত্র নিজ হাতে পরিষ্কার করেন? সুইজারল্যান্ডের জেলখানাগুলো কেন আজ শিশুপার্কে পরিণত হয়েছে? এগুলো নিয়ে কি আমরা কোনো গবেষণা করেছি? তার কারণ খুঁজতে চেয়েছি? গুজব ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী এ অঞ্চলের গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতি। অপরদিকে নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডসহ উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়নের মূল পথপ্রদর্শক তাদের গবেষণালব্ধ টেকসই শিক্ষা পদ্ধতি। বাংলাদেশে শিক্ষানীতি রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে শিক্ষা পদ্ধতি কী ধরনের হওয়া উচিত, তা গবেষণালব্ধ নয়। গুণগত মানের শিক্ষা অর্জনের টানা-হেঁচড়ায় পড়ে, জাতির শিক্ষা নামক ‘মেরুদণ্ড’ বিকল হয়ে পড়েছে। অন্ধত্ব, কুসংস্কার, কুশিক্ষার ফলে সৃষ্ট গুজব, হুজুগে-সুযোগে আইন হাতে তুলে নেওয়ার মতো গর্হিত জঘন্য কাজকে কেন্দ্র করে দেশের মহান ব্যক্তিরা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইলেট্রনিকস মিডিয়ার টকশোতে স্পষ্টত্বই বলেছেন (১) মানুষ বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারছে না (২) মানুষের মনে প্রচন্ড ক্ষোভ দানা বাঁধার কারণে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে (৩) সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার কারণে এমনটি হচ্ছে (৪) নানাবিধ হতাশার কারণে মানুষ হিংস্র হয়ে উঠেছে। তাদের এ ধরনের মন্তব্য, ধারণার যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে লর্ড কার্জনের আমলে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথদের সাহসিকতায় মানবকল্যাণে ‘সতীদাহ প্রথা’ বিলুপ্ত এবং বিধবা বিবাহের মতো ধর্মীয় গোড়ামি খড়গ ঠেকানো গেছে। বর্তমানে আমাদের দেশের গ্রাম্য সালিসের নামে মোড়লদের জাহেলি যুগের মতো অত্যাচার দমন সম্ভব হয়েছে। আইন হাতে তুলে নেওয়ার মতো গুজব, হুজুগ-সুযোগে যেমন অন্ধত্ব রয়েছে, তেমনি আইন না জানাও অন্ধত্বের নামান্তর।

কিছুদিন আগে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন এসেছিলেন বাংলাদেশে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপখাইয়ে চলার বিরল অভিজ্ঞতার সূত্র ধরে, তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ হতে পারে সারা বিশ্বের জন্য শিক্ষক। তেমনি ২০৪১ সালের মধ্যে পৃথিবীর কেউ একজন বলবেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানবসম্পদের দেশ, যে দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি পৃথিবীর জন্য অনুকরণীয়।’ এজন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, পরস্পর বিরোধী বক্তব্য, মনগড়া কথাবার্তা বর্জন এবং মানবিক গুণাবলির নৈতিক চরিত্রের অধিকারী, সাহসী এবং দেশপ্রেমিক মানবসম্পদ গঠন করে সমাজ থেকে কুসংস্কার, গুজব, হুজুগ-সুযোগ সৃষ্টির মতো মানসিক ভাইরাস দূর করতেই গবেষণালব্ধ সময় উপযোগী মৌলিক শিক্ষা চালু এখন সময়ের দাবি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

পিডিএসও/হেলাল