ঈদুল আযহার অর্থনীতি

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৯, ১০:০৬ | আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৯, ১০:৩৪

সেফাতুল করিম

যেকোনো বড় উৎসবেই বাংলাদেশের অর্থনীতি দারুণভাবে প্রাণচাঞ্চল্যতা লাভ করে। তবে সবচেয়ে বেশি গতিশীলতা লক্ষ করা যায় বছরের দুই ঈদের সময়টায়। এ বছর ১২ আগস্ট পবিত্র ঈদুল আযহা পালিত হবে। ঈদুল আযহা পালনে অর্থনীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে। এ উৎসবে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অর্থ লেনদেনসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, যা গোটা অর্থনীতি তথা দেশজ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ ঈদে জামাকাপড়ের ব্যবসা তেমন হয় না। মূলত কোরবানিযোগ্য পশু, আদা, পেঁয়াজ, রসুনসহ সব মসলা, দুধ, চিনি, সেমাই, পোলাও চাল, আটা ইত্যাদি ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ই মূলত হয়ে থাকে। শুধু এ সময়টাতেই মসলা বাবদ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। এ সময় রেফ্রিজারেটর ব্যবসায়ও জমজমাট হয়ে ওঠে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী এ বছর ১ কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানি হতে পারে। যার মধ্যে ৪৫ লাখ গরু ও ৭০ লাখ খাশি-ভেড়া। সে হিসাবে প্রতিটি গরুর দাম গড়ে ৩০ হাজার টাকা ধরলে গরু বিক্রিতেই লেনদেন হবে ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আর খাশি-ভেড়ার দাম গড়ে ২ হাজার টাকা ধরলে লেনদেন হবে ১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। তবে গড় মূল্য আরো বেশি হওয়ার কথা। কোরবানি পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমার ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় চাঁদা, টোল, বখশিশ, ফড়িয়া, দালাল, পশুর হাট ইজারা, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও বানানো এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও এক বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়ে থাকে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে ফরমাল-ইনফরমাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

কোরবানি পশুর চামড়া আমাদের অর্থনীতিতে রফতানি বাণিজ্যে, পাদুকা শিল্পে পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। ঈদুল আযহার আরেকটি অন্যতম অংশ হজ। এ বছর বাংলাদেশ থেকে হজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গেছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান। হজযাত্রায় গড়ে ৩ লাখ টাকা খরচ হলে লেনদেন হবে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। গোটা ব্যাংকিং সেক্টরে এ উপলক্ষে লেনদেন ও সেবা-সূত্রে ব্যয় বেড়েছে। ওপরে উল্লিখিত লেনদেনে দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে, তারল্য সংকটে পড়ে যায় আর্থিক খাত, কল মানি মার্কেট থেকে চড়া সুদে ধার-কর্জে নামে ব্যাংকগুলো। চামড়া ঋণ থেকে শুরু করে ঈদের বোনাস বাবদ বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও এগিয়ে আসতে হয়।

বরাবরের মতো এ ঈদেও আপনজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য অনেক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ছুটে যায়। পরিবহন ব্যবস্থায় বা ব্যবসায় ব্যাপক কর্মতৎপরতা বাড়ে বহুগুণ। শহরের মানুষ আপনজনের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনের জনগ্রামে ছুটে। এক মাস আগে থেকে ট্রেন, বাস, লঞ্চের টিকিট বিক্রির তোড়জোড় দেখে বোঝা যায় এর প্রসার ও প্রকৃতি। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক সময় দ্বিগুণ দামে টিকিট বিক্রির সার্বিক ব্যবস্থা বোঝা যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পরিবহন খাতে এ ঈদে ২ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা বা লেনদেন হয়ে থাকে। এটিও অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।

তবে উৎসবের অর্থনীতির কিছু সমস্যাও পরিলক্ষিত হয়। ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে গরু আনা, ব্যাপক হারে জাল টাকার দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়া, পকেটমার-অজ্ঞান বা মলম পার্টির কাছে গরু বিক্রেতা সর্বস্ব হারানো, চামড়া পাচার, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চামড়া বিক্রয় ইত্যাদি সমস্যা প্রতিবার ঘটলেও সমাধানে আন্তরিকতা কোনোবারই দেখা যায় না। এ ছাড়া গরুবোঝাই ট্রাকে নিয়মিত চাঁদা তোলার অভিযোগ বেশ পুরোনো। তাই এসব সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে উৎসবের অর্থনীতিকে জিডিপিতে যোগ্য অবদান রাখার অবকাশ নিশ্চিত হতে পারে।

পিডিএসও/হেলাল