রাজধানীর খাল বাঁচাতে হবে সবার আগে

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৯, ১৬:০৮

সম্পাদকীয়

নদীমাতৃক দেশ বলে কথা। আমরা সব সময় বলে থাকি, ‘নদী বাঁচলে বাঁচবে দেশ’। মহানগর ঢাকার প্রশ্নে শুধু নদীই নয়, ন্যূনতম ৯টি খালকে তাদের হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতে হবে; যদি আমরা রাজধানীর পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে চাই। যদিও রাজধানীতে খালের সংখ্যা ছিল ৪৬টি। খালগুলোকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে। যারা হত্যা করেছে, তারা বাইরের কেউ নয়। আমাদেরই নিকট-আত্মীয়। নদী ও খালকে এরা দখল করতে করতে একসময়ের প্রাচ্যের ভেনাসকে আজ পরিবেশ দূষণের শ্রেষ্ঠ নগরীতে পরিণত করেছে।

টলমলে পানি। তরতর করে চলছে ডিঙি নৌকা। পানিতে সাঁতার কাটছে শিশু-কিশোররা। পাড় বেয়ে বৈকালিক ভ্রমণে বেরিয়েছেন বর্ষীয়ানরা। বৃষ্টি এলেই আশপাশের সব পানি খাল দিয়ে পড়ছে নদীর বুকে। খালগুলোর অতীতটা ছিল অনেকটা এ রকম। কিন্তু এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই। বর্তমান চিত্র ঠিক তার উল্টো। খালগুলোর একটির নাম কাটাসুর। মোহাম্মদপুর ও বসিলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এ খাল ভরাট করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। আবর্জনায় ভরে আছে মৃতপ্রায় পড়ে থাকা শীর্ণকায় কাটাসুর। কুচকুচে কালো পচা পানিতে ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ।

হালকা বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে মিরপুর এলাকা। মিরপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাউনিয়া খালের অবস্থাও তথৈবচ। আমাদের স্বজনরা তো আছেন, পাশাপাশি এবার সরকারি প্রকল্পও হানা দিয়েছে এ খালের ওপর। সরকারের দুই প্রকল্প ভাসানটেক পুনর্বাসন ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জয়নগর প্রকল্পের কারণে বিলীন হচ্ছে বাউনিয়া খালের অস্তিত্ব। খাল পুনরুদ্ধারে আদালতের রায় থেকে শুরু করে কোনো কিছুতেই উদ্ধার হয়নি দখল হওয়া খাল।

মিরপুর ১৩ নম্বর, বাইশটেক ও ভাসানটেক সংযোগস্থলে সরকারি প্রতিষ্ঠান খাল দখল করেছে। মাঝামাঝি এলাকায় বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারের কর্মকাণ্ড অনুসরণ করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দখলদারিত্ব কায়েম করেছে। সরকার ইচ্ছা করলেই তার প্রয়োজনে দেশের যেকোনো স্থানে যেকোনো জায়গা অধিগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু খাল দখলের ব্যাপারে তাদের একটু আলাদাভাবে ভাবা দরকার। সরকার নদীরক্ষা এবং রাজধানীকে দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সরকারের এ অবস্থানকে দৃঢ়তর করার জন্য খালকে অবমুক্ত রেখেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।

আমরাও মনে করি, সরকার এ ব্যাপারে নতুন করে ভেবে দেখে নতুন সিদ্ধান্ত দেবে। ওয়াসার তথ্য মতে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খালটির প্রস্থ হওয়ার কথা ৬০ ফুট। বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। বিভিন্ন জায়গায় ময়লার স্তূপ এবং দখলে খালটি নালায় পরিণত হয়েছে। আট কিলোমিটার লম্বা বাউনিয়া খালকে দুই জায়গায় চেপে ধরেছে সরকারের দুই প্রকল্প।

গত ২৯ বছরে রাজধানীর ৩৬টিরও বেশি খালের অপমৃত্যু হয়েছে। বাকি ২৬টি খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেলেও তা এখন সরু নালায় পরিণত হয়েছে। অবৈধ দখল আর আবর্জনার স্তূপ অধিকাংশ খালের প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে ঢাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা ঠেকাতে খাল পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই।

আমরাও মনে করি, সরকারও সেই পথে এগিয়ে চলেছে। পথপরিক্রমণের বিষয়টি সরল নয়। বেশ কঠিন। তবে বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতর স্বার্থকে বলি দেওয়াই হবে যুক্তিযুক্ত। আমরা মনে করি, বর্তমান সরকার সব সময়ই বৃহত্তর স্বার্থের অনুকূলে থেকেছে। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হবে না।

পিডিএসও/তাজ